দ্বন্দ্ব নয়, মানবতাই হোক লক্ষ্য
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি
সাব্বিন হাসান
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১২:১৫ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ২০:৩২
ব্যবসাই মুখ্য, নাকি মানুষের স্বার্থ আগে? সহজ প্রশ্ন। কিন্তু সদুত্তরে রয়েছে জটিলতা। এর পেছনে কাজ করে আদর্শের নীতিগত সংঘাত। যার নিষ্পত্তিতে দ্বারস্থ হতে হয় আদালতের কাঠগড়ায়। দ্বন্দ্বটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, যার পেছনে রয়েছে এই সময়ের তাবৎ বিশ্বের নজরে থাকা দুজন টেক ব্যক্তিত্ব।
নিজেদের সংঘাত মেটাতে বৈশ্বিক শিরোনাম হলেন ওপেনএআইর প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান আর টেসলাপ্রধান ইলন মাস্ক। কঠিন যুক্তিতর্কে জয় আদায় করে নিলেন স্যাম অল্টম্যান। বিশ্বসেরা ধনকুব হয়েও হেরে গেলেন ইলন মাস্ক। আদালতের বিচার-নিরপেক্ষতা নিয়ে তাই প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই এতটুকুও। স্যামের বিপক্ষে ইলন মাস্কের দায়ের করা মামলা শেষমেশ খারিজ করে দিলেন আদালত। রচিত হলো ইতিহাস। ন্যায়বিচার দেখল পুরো দুনিয়া।
অনেকেই হয়তো এ বিষয়ে তেমন অবগত নন। ঘটনার গভীরতা জানতে ফিরে তাকাতে হবে ২০১৪-১৫ সালে। ওই সময়ে স্যাম অল্টম্যান আর ইলন মাস্ক মিলে তৈরি করেন ভবিষ্যৎমুখী সংস্থা ওপেনএআই। যার প্রধান লক্ষ্য ছিল, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে জনমানুষের স্বার্থে সর্বোত্তম কাজে নিয়োজিত করা।
মুনাফা নয়, মানবকল্যাণই হবে প্রধান উদ্দেশ্য। নিয়মমাফিক সবই ঠিক চলছিল। কিন্তু সমস্যা তৈরি হলো স্যাম অল্টম্যানকে ঘিরে। সংস্থাটি যখন মুনাফা দিতে শুরু করল, তখনই স্যাম সুর পাল্টে ফেললেন। যেন বড় অঙ্কের মুনাফা নিশ্চিত করা যায়। স্যামের শর্তে রাজি হলেন না ইলন।
২০১৮ সালে তীব্র বিরোধিতার কারণে ওপেনএআই ছেড়ে চলে গেলেন স্যাম। ঠিক তার পরের বছরেই মাইক্রোসফটের সঙ্গে বিশাল অঙ্কের চুক্তি করে বসে ওপেনএআই। ঠিক সে সময় থেকেই স্যামের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করতে থাকেন ইলন। সাফ দাবি করে বলেন, তাঁকে পুঁজি করে ওপেনএআই গড়ে তুলেছেন স্যাম। উৎসাহিত করেছেন বিশাল বিনিয়োগ করতে। কিন্তু নিজেদের প্রধান লক্ষ্য থেকে দূরে সরে গেছেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ নিয়েই ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে মামলা করেন ইলন। অভিযোগে দিব্যি উল্লেখ করেন, ওপেনএআই সংস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবকল্যাণ। কিন্তু ওপেনসোর্স এআই তৈরির ভাবনা থেকে স্যামের ভাবনার দূরত্ব অনেক। সব শর্ত ভুলে বাণিজ্যিক মুনাফাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে গেছে। অবশেষে জুনে মামলা প্রত্যাহার করে নেন ইলন। কিন্তু ওই বছরেই নতুন করে ফেডারেল আদালতে আবারও মামলা করে বসেন। শুরু হয় নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। এবার শুধু ওপেনএআই আর স্যাম অল্টম্যান নয়; মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও আইনি অভিযোগ করেন ইলন মাস্ক। বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ আর স্যাম অল্টম্যান ও গ্রেগ ব্রকম্যানকে ওপেনএআই থেকে সরিয়ে সংস্থার পুনর্গঠনের দাবি করেন ইলন। নড়েচড়ে বসে পুরো টেক দুনিয়া।
গত ২৮ এপ্রিল শুরু হয় শুনানি। ইলনের আইনজীবী স্টিভেন মলো বলেন, অনেকেই স্যামকে মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করেন। মামলার মূল বিষয় তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা। যদি তাঁকে বিশ্বাসই না করা যায়, তাহলে সেটাই ওপেনএআই সংস্থার পরাজয় হবে। পাল্টা ওপেনএআইর আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট ইলনকে কাঠগড়ায় হাজির করেন। দাবি করেন, ইলন নিজেই মুনাফার পেছনে ছুটে বেড়ান। অনেক ক্ষেত্রে তিনি উর্বর মাটিকে সোনায় রূপান্তর করেছেন বটে। কিন্তু এআই প্রযুক্তির দুনিয়ায় সফল হতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই বিদ্বেষের কারণে এমন মামলার আশ্রয় নিয়েছেন আর কি!
টানা ১১ দিন চলা শুনানি শেষে মাস্কের দাবি খারিজ করে দেন জুরি বোর্ড। তারা প্রশ্ন তোলেন, আপনি এত দেরি করে মামলা করলেন কেন? সুস্পষ্ট করে জানান, ওপেনএআই যে ক্রমে বাণিজ্যিক পথে হাঁটছে, তা তো অজানা ছিল না। ইলন মাস্ক নিজেও তা জানতেন ভালো করেই। মাইক্রোসফট তো গোপনে নয়, ঢাকঢোল পিটিয়েই বিপুল অঙ্ক লগ্নি করেছে। সবাই জেনেছে, কীভাবে ব্যবসায়িক কাঠামোর রূপান্তর হয়েছে। পরপর কয়েকটি পরিষেবা সামনে আনা হয়েছে। এত কিছুর পর এসেছে সাফল্য। কিন্তু সেই সময়ে এসব নিয়ে ইলন তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। অনেকটা অপেক্ষা করে ওপেনএআই সফল হওয়ার পরে করেছেন মামলা। তাই আদালত মনে করেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অপেক্ষা না করে আগেই মামলা করলে তা জোরালো হতো।
ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি
অবশেষে ইলন মামলায় হেরেছেন, জিতেছেন অল্টম্যান। কিন্তু এ ঘটনায় অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আইনি এই লড়াই আদতে এআই কলাকৌশলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানবকল্যাণের জন্য অবমুক্ত থাকবে, নাকি বড় প্রযুক্তি সংস্থা আর বিনিয়োগকারীর হাতের পুতুল বনে যাবে? ব্যবসা, না নিরাপত্তা– বেশি গুরুত্ব কোনটাকে দেওয়া উচিত? সারাবিশ্বে বহু আলোড়িত এই মামলা শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং তাবৎ দুনিয়ার এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েই কড়া চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। অপেক্ষা ছাড়া এমন চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে চান বিশেষজ্ঞরা।
- বিষয় :
- ওপেনএআই
- স্যাম অল্টম্যান
- ইলন মাস্ক
