ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

অ্যাপ সুরক্ষায় ধূম্রজাল

অ্যাপ সুরক্ষায় ধূম্রজাল
×

সাব্বিন হাসান

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ১১:৩৩

চূড়ান্ত বিতর্কের সূত্রপাত হয় টেলিগ্রাম অ্যাপ প্রতিষ্ঠাতা রুশ ধনকুবের পাভেল ডুরভের পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে। নিজের এক্স বার্তায় পাভেল উল্লেখ করেন, সবাইকে ধোঁকায় রেখেছে হোয়াটসঅ্যাপ। সবাই এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের নামে বিভ্রান্তিতে রয়েছে। এসব আদতে গ্রাহক তৈরির কারিগরি ফাঁদ।

জানা গেছে, ৯৫ শতাংশ হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজই সরল টেক্সট ফরম্যাটে অ্যাপল বা গুগলের সার্ভারে ব্যাকআপ হিসেবে সংরক্ষিত হয়। আর এনক্রিপশন বিষয়টিই ঐচ্ছিক (অপশনাল)। অ্যাপ ব্যবহার করেন এমন অনেকেই সেটিকে অন করেন না।

পাভেল দুরভের দাবি, কোনো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রাহক যদি এনক্রিপশন অন করেও, এতে দুজনের মধ্যে কথোপকথনের সময় সেই সব মেসেজ বেহাত (লিক) হয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়ে যায়। কারণ, উল্টো দিকের ব্যক্তিটি হয়তো তাঁর ডিভাইসে এনক্রিপশন অন করেননি। যে কারও যোগাযোগ তালিকায় থাকা ৯০ শতাংশ পরিচিত ব্যক্তিই ব্যাকআপ এনক্রিপশন সক্রিয় করেন না। অর্থাৎ এসব চ্যাট অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় কোনো সার্ভারে সংরক্ষিত হয়ে থাকে।

বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত হোয়াটসঅ্যাপ মার্ক জাকারবার্গের মালিকানাধীন মেটার আওতাধীন সংস্থা। সুরক্ষা আর গোপনীয়তার প্রশ্নে এই অ্যাপ সবার থেকে এগিয়ে। 

সংস্থাটি দাবি করে, হোয়াটসঅ্যাপ নিজেও দুজন ব্যক্তির মধ্যে হওয়া চ্যাট পড়তে পারে না। কারণ, এর রয়েছে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন সক্ষমতা। বিষয়টি অনেকটা তালা-চাবির মতো। মানে যে মেসেজ পাঠালেন, তাৎক্ষণিক ওই মেসেজের চারপাশে অদৃশ্য লক তৈরি হয়। শুধু যার ফোনে ওই মেসেজ পৌঁছায়, তার কাছেই সেই তালা ভাঙার ক্ষমতা থাকে।

মেটার দাবি, মেসেজ যাওয়ার পথটি সুরক্ষার চাদরে আবৃত থাকে। যদি কেউ মধ্যভাগে ওই এনক্রিপশন ভেঙে চ্যাটে প্রবেশাধিকার নিতে চায়, তাহলে সে কয়েকটি ভঙ্গুর ইংরেজি বর্ণমালা ছাড়া কিছুই দেখতে পারবে না। একে বলা হয় সাইফার-টেক্সট।

মেটার দাবি, মেসেজে এই ডিজিটাল তালা আলাদা করে লাগাতে হয় না। নিজে থেকেই এটি লক হয়ে যায়। আর ঠিক এ দাবিকে নস্যাৎ করে আসরে উদয় হয়েছে টেলিগ্রামের সিইও পাভেলের।

জোরালো দাবি করে পাভেল বলেছেন, এমন বহু মামলা যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এখনও বিচারাধীন। যেখানে মেটার কর্মচারী বা অ্যাসেনচারের মতো সংস্থা এনক্রিপশন ভেঙে গোপন চ্যাট পড়েছে।

মেটাডেটা সংরক্ষণের নামে আদতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা ভেঙে ফেলা হয়েছে। এমন দাবি আংশিক সত্যি বলে মেনে নিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। কারণ, ব্যাকআপ চ্যাট সত্যিকার অর্থে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড হয় না বলে ধারণা দিয়েছেন অনেক সফটওয়্যার প্রকৌশলী।

পাভেলের সব ধরনের দাবি যৌক্তিক নয়। তাদের দাবি, পাভেলের দাবিতে শব্দের খেলা বা জাগলারি রয়েছে। কারণ, পাভেল হোয়াটসঅ্যাপের প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা টেলিগ্রামের নির্বাহী প্রধান। এসব বক্তব্যের পেছনে তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকাই স্বাভাবিক। তাঁকে রাশিয়ার মার্ক জাকারবার্গ বলে অভিহিত করা হয়। রাশিয়া ছেড়েছেন ২০১৪ সালে। এর আগে রাশিয়ার বহুল আলোচিত সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক ভিকে তৈরি করেন।

কিন্তু পুতিনের নির্দেশে গ্রাহক তথ্য রুশ গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য দেননি বলে তাঁকে ভিকে সংস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ঠিক এরপরই পাভেল টেলিগ্রাম অ্যাপ তৈরির পরিকল্পনা করেন। যেখানে যে কারও সিক্রেট চ্যাট কোনো ক্লাউড ব্যাকআপে সংরক্ষিত হয় না। কেউ পড়তে পারেন না। থাকে না কোনো মেটাডেটা।

ঘটনাক্রমে টেলিগ্রাম নিয়েও ছড়িয়েছে অন্তহীন বিতর্ক। ফ্রান্সের আদালতে পাভেলকে সন্ত্রাসবাদের ইন্ধনদাতা হিসেবে মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। যদিও পাভেল দাবি করেন, জঙ্গিরা টেলিগ্রাম ব্যবহার করে। তার অর্থ এই নয়, তিনি সন্ত্রাসকে কোনোভাবে সহযোগিতা করেন। সংখ্যাতত্ত্বে টেলিগ্রামও একেবারে পিছিয়ে নেই। সারাবিশ্বে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন ৩০০ কোটি নিবন্ধিত গ্রাহক। অন্যদিকে টেলিগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা শতকোটি ছাড়িয়ে গেছে।

আদতে কী মেটাডেটা

পাভেলের এমন দাবি প্রযুক্তি মহলে নতুন করে পুরোনো বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। কী সেই বিতর্ক? বিতর্ক বার্তালাপের তথ্য গোপন করাকে ঘিরে। সহজ করে বললে, কেউ তাঁর বন্ধুর কাছে মেসেজ পাঠালেন। সেটি টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল বা ফেসবুক মেসেঞ্জার– যে কোনো মাধ্যমে হতে পারে। সবকটি মেসেজিং অ্যাপ নির্মাণ সংস্থার দাবি, তাদের তৈরি করা অ্যাপ্লিকেশনই সবার
থেকে বেশি নিরাপত্তা দেবে।

সুরক্ষিত কোন অর্থে? দুজন ব্যক্তির মধ্যে যেমন কথোপকথনই হোক না কেন, তা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি পড়তে পারবে না। অর্থাৎ চূড়ান্ত গোপনীয়তা নিশ্চিত হবে। এমনকি কোনো দেশের সরকার বা তদন্ত সংস্থা কেউই আলাপচারিতা পড়তে বা লেনদেন হওয়া ছবি-ডকুমেন্ট দেখতে পারবে না। লিগ্যাল ইস্যু থাকলে বড়জোর কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কতক্ষণ বলেছেন– এটুকুই জানা সম্ভব হবে। তথ্যের এই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে বলে মেটাডেটা। 

আরও পড়ুন

×