ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভার্চুয়াল বিদ্বেষ

সাইবার ডক্সিংয়ে মানসিক বিষাদ

সাইবার ডক্সিংয়ে মানসিক বিষাদ
×

সাব্বিন হাসান

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১২:২৬

স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌরাত্ম্যের ফলে শিশু-কিশোরর বড় অংশ দিনরাতের উল্লেখযোগ্য সময় অনলাইনে বিভোর থাকে। পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অনলাইন বিদ্বেষ, ট্রলিং, ডক্সিং, ফেক ছবি বা ভিডিও ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, পরিচয় চুরি ও অশালীন চিন্তার মতো অপরাধ। 

শরীরে নেই কোনো ক্ষতচিহ্ন। মুখের অবয়বে নেই আঘাতের দাগ। অথচ সারাক্ষণ ভেতরে অনেক কিশোর-কিশোরী গুমরে ভেঙে পড়ছে। হারিয়ে ফেলছে স্কুলে যাওয়ার তাগিদ, বন্ধুদের এড়িয়ে চলছে, রাতের পর রাত ঘুমাতে পারছে না। কখনও বা একমুহূর্তের অপমান থেকে জন্ম নিচ্ছে আত্মহত্যার মতো কঠিন চিন্তা। নীরব এই ঘাতক ও এমন বিদ্বেষের আরেক ভাষান্তর সাইবার ডক্সিং।

ইউনিসেফের সমীক্ষা বলছে, বিশ্বের বহু দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর-কিশোরীর জীবনে কোনো না কোনো সময় সাইবার ডক্সিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। শিশুদের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের সংখ্যা বিগত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, অসংখ্য ঘটনা কখনও থানায় পৌঁছায় না। লজ্জা, সামাজিক আতঙ্ক বা পরিবারের প্রতিক্রিয়ার শঙ্কায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী নীরবে সব সয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের কোনো দেশই এই বাস্তবতার বাইরে নয়। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, কিশোরী বা নারীর ছবি বিকৃত করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অসৎ উদ্দেশ্য কেউ ফেক প্রোফাইল খুলে ব্ল্যাকমেইল করেছে। আবার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি জনসমক্ষে আনে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৈরি হয় গোপন অনলাইন গ্রুপ, যেখানে একজনকে পরিকল্পনা করে অপদস্থ করা হয়। হরহামেশা এসব বিষয় সংবাদমাধ্যমে এলেও ভুক্তভোগীর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।

সাইবার ডক্সিংয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো– এখানে অত্যাচারীর মুখ দেখা যায় না। সে যে কোনো পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে। ভুক্তভোগী জানেই না, কে তাকে অপমান করছে। এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা মানসিকভাবে বেশ দুরূহ।

কটূক্তি মন্তব্য, মিম, বিকৃত ছবি বা ফেক গুজব– এসব অনেকের কাছেই হয়তো নিছক বিনোদন। কিন্তু যাকে নিয়ে এসব করা হয়, তার কাছে এটিই জীবনের সবচেয়ে বড় অপমানের কারণ হয়ে যায়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নির্মম সত্য হলো কোনো বিষয় একবার ভাইরাল হয়ে গেলে তা মুহূর্তে হাজারো মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। বাস্তব জীবনের ওই ঘটনায় অপমানের সাক্ষী হয়তো ১০ জন। 

কিন্তু অনলাইনে সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় কয়েক লাখে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকটা সময় ধরে সাইবার ডক্সিংয়ের শিকার হলে মানুষের মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি হয়। 

উদ্বেগ, আতঙ্ক, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্নতা, প্যানিক অ্যাটাক ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের মতো সমস্যা দৃশ্যমান হয়। অনেক শিশু নিজের মূল্যবোধ নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করে। অজান্তে তাদের মনে কাজ করে যে এই অপমানের জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। সবকিছুর শেষ এখানে নয়। 

কী বলছে গবেষণা

মানসিক চাপের প্রভাব শরীরের ভেতরে পড়ে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, পেটের সমস্যা, ক্ষুধামান্দ্য, উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশ্বে অনেক গবেষণায় জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা অনলাইন মানসিক নির্যাতন শরীরের স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। যার প্রভাব পড়ে মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো আত্মহত্যার ঝুঁকি। বৈশ্বিক গবেষণা বলছে, সাইবার ডক্সিংয়ের শিকার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা ও আত্মহত্যার চেষ্টা– এ দুয়েরই শঙ্কা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
বাংলাদেশে ও বহির্বিশ্বে এমন বহু হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের অনলাইন অপমানের পর কিশোর বা কিশোরী নিজের জীবন শেষ করে দিয়েছে। সব ঘটনাই আমাদের সামনে প্রশ্নের জন্ম দেয়– আমরা কি সময়মতো তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরেছিলাম?

আশপাশের সামাজিক মানসিকতা এ সমস্যাকে অনেক জটিল করে তুলেছে। অনেক পরিবার এখনও মনে করে, মোবাইল বন্ধ করে দিলেই এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। এ সময়ের বিশ্বে অনলাইন পরিচয়ই অনেক সময় একজন কিশোর-কিশোরীর সামাজিক পরিচয়ের অংশ। সেখানে অপদস্থ হওয়ার অর্থ বাস্তব জীবনেও ক্রমে একা হয়ে যাওয়া।

অন্যদিকে, অনেক স্কুলে এখনও সাইবার ডক্সিংকে জরুরি বিবেচনা করে দেখার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। শিক্ষাজীবনের শৃঙ্খলা, পরীক্ষার ফল বা উপস্থিতি– এমন বিষয়ে যত দফা আলোচনা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে তার সামান্য অংশও হয় না। অথচ ডিজিটাল প্রজন্মের কাছে এ জগৎ আর বাস্তবতা আলাদা নয়; বরং দুটিই যেন সমানুপাতে বাস্তব।

সাইবার ডক্সিং বিশেষ ধাঁচের কোনো অনলাইন সমস্যা নয়। এটি মানুষের আত্মসম্মান, নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের গভীর এক সামাজিক সংকট। যতদিন এই সংকটকে শুধু প্রযুক্তির সমস্যা বলে উপেক্ষা করা হবে, ততদিন নতুন করে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

আরও পড়ুন

×