ঘরের ইন্টারনেটে যত বিপত্তি
সাব্বিন হাসান
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১৩:১৭
হ্যাকিং বলতে সাধারণত কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের তথ্য চুরির কথা সবার আগে ভাবনায় আসে। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলেছে সাইবার অপরাধের ধরন। অনেকের বাড়ি এখন স্মার্টহোম। বাড়ির প্রায় সবকটি ডিভাইস নিয়ন্ত্রিত হয় ইন্টারনেট সংযোগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টহোমের জালেই জড়িয়ে আছে অনেক শঙ্কা।
হ্যাক হতে পারে স্মার্ট ডিভাইস
দিন-রাতে খাবার সংরক্ষণ করতে কমবেশি সবারই বাসায় ফ্রিজ ব্যবহার করা হয়। এখন অনেক ফ্রিজই ইন্টারনেট, মোবাইল অ্যাপ, ক্লাউড পরিষেবা বা হোম নেটওয়ার্কের সঙ্গে জুড়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে ফ্রিজ থেকে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়। হ্যাকিং সম্মেলনে গবেষকরা বলেছেন, স্মার্ট ফ্রিজের দুর্বল নিরাপত্তা কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের কিছু তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে অপচক্র। তবে সব স্মার্ট ফ্রিজই যে সহজে হ্যাক করা যায়, এমন নয়।
সুরক্ষায় স্মার্ট হোম
ডিফল্ট পাসওয়ার্ড বদলে নেওয়া, যেখানে সম্ভব টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন সক্রিয় ও নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করতে হবে।
নিরাপত্তা আপডেট পাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে ডিভাইসে নজরদারি বাড়াতে হবে। কম জরুরি ডিভাইস ইন্টারনেটের সংযোগে বাইরে নিতে হবে।
স্মার্ট ডিভাইসে সুবিধার সঙ্গে এই প্রযুক্তিতে নিরাপত্তার ঝুঁকিও অনেক বেশি– এমনটাই বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কিছুদিন আগেও ফ্রিজের কাজ ছিল শুধু খাবার ঠান্ডা রাখা, দরজার কাজ ছিল ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর ক্যামেরার দায়িত্ব ছিল বাড়ির চারপাশে নজরদারি করা। এআই প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এসব সাধারণ যন্ত্র এখন ইন্টারনেট সংযোগে হয়ে উঠেছে দুর্দান্ত স্মার্ট।
স্মার্টফোনের মাধ্যমে দূর থেকে ফ্রিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ভিডিও ডোরবেলে আগন্তুক দেখা কিংবা স্মার্ট লকের সহায়তায় দরজা খোলা– সবই এখন বাস্তব ও দৃশ্যমান। দারুণ সুবিধার এসব প্রযুক্তি নতুন ধরনের সাইবার নিরাপত্তায় তৈরি করেছে নতুন বিপত্তি।
অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে, স্মার্ট ফ্রিজও কি হ্যাক করা সম্ভব? উত্তরটি হলো, হ্যাঁ।
ইন্টারনেট বা ওয়াই-ফাই সংযোগে থাকা স্মার্ট ফ্রিজে নিরাপত্তার দুর্বলতা থাকলে সেটি হতে পারে লক্ষ্য, বিশেষ করে ডিভাইসের সফটওয়্যার পুরোনো থাকলে, সহজে অনুমেয় এমন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করলে কিংবা নির্মাতার নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথার্থ জোরালো না হলে এই শঙ্কা নিছক অমূলক নয়। স্মার্ট ফ্রিজ হ্যাক হওয়ার অর্থ কেউ খাবারের তালিকা দেখছে বা ফ্রিজে সরাসরি নজরদারি করছে– ঠিক এমন নয়। ডিভাইসের ধরন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে হ্যাকার সেটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, সংরক্ষিত তথ্য সংগ্রহ করা কিংবা সেটিকে অন্য সাইবার হামলার কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে।
সব ডিভাইসে ঝামেলা
স্মার্ট টিভি, সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ডোরবেল, অ্যালার্ম সিস্টেম, স্মার্ট লক থেকে সারাক্ষণ ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেট-সংযোগে থাকা টুথব্রাশও হতে পারে শঙ্কার কারণ। ডিভাইসে হামলার ক্ষেত্রে রাউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ এখন হ্যাকিং করার প্রধান মাধ্যম।
নজর যখন স্মার্ট ডিভাইসে
স্মার্ট ফ্রিজ একমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ ডিভাইস নয়; সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ডোরবেল, স্মার্ট লক, স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট এবং ওয়াই-ফাই রাউটার এখন সাইবার অপরাধীদের সম্ভাব্য লক্ষ্য। এসব যন্ত্র অনেক ক্ষেত্রেই সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে দূর থেকেই এসব যন্ত্রে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব।
সিসিটিভি ক্যামেরা বা ভিডিও ডোরবেল হ্যাক হলে ব্যক্তিগত পরিসরের দৃশ্য ও ভিডিও অন্যের হাতে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। স্মার্ট লকের নিয়ন্ত্রণ হারালে বাড়ির প্রবেশপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। আবার থার্মোস্ট্যাটের মতো ডিভাইসের সেটিংস পরিবর্তন করে ভোগান্তিতে ফেলা সম্ভব হতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে কী ধরনের ক্ষতি হবে, তা নির্ভর করে ডিভাইসের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরাপত্তার দুর্বলতা ও হ্যাকার কতটুকু নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে– তার ওপর।
উদ্বেগের কারণ হলো, স্মার্ট হোমের সবকটি ডিভাইস প্রায়ই একই ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে। সুতরাং একটি ডিভাইসের নিরাপত্তা ভেঙে গেলে হ্যাকার সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নেটওয়ার্কের অন্যসব ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। দুর্বল নিরাপত্তার রাউটার এ ক্ষেত্রে পুরো নেটওয়ার্কের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ পেলে হ্যাকার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, ক্যামেরার মাধ্যমে বাড়ির ভেতরের দৃশ্য ধারণ বা সেটিংস বদলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। রাউটারের মাধ্যমে একই নেটওয়ার্কে থাকা অন্যসব ডিভাইসে প্রবেশের পথ তৈরি হয়।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর ক্ষতি
স্মার্ট হোমে সাইবার হামলার ক্ষতি শুধু যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, পরিবারের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, নজরদারির ভিডিও অপব্যবহার ও অনলাইন অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। কোনো ডিভাইসের সঙ্গে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট বা অন্য সেবা যুক্ত থাকলে সেই সংযোগের নিরাপত্তা জরুরি।
দুর্বল নিরাপত্তার স্মার্ট ডিভাইসকে অপচক্র অন্য ওয়েবসাইট বা নেটওয়ার্কে সাইবার হামলা চালানোর কাজে ব্যবহার করতে পারেন। অনেকে হয়তো বুঝতেই পারেন না, তাঁর বাড়ির কোনো যন্ত্র এরই মধ্যে অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
ভবিষ্যতের সুরক্ষা
স্মার্ট হোমের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রথমে সবকটি ডিভাইসের ডিফল্ট পাসওয়ার্ড বদলে নতুন করে জোরালো ও ভিন্নধর্মী পাসওয়ার্ড তৈরি করতে হবে। নিয়মিত সফটওয়্যার ও ফার্মওয়্যার আপডেট করা প্রধান শর্ত। সম্ভব হলে দুই ধাপে পরিচয় যাচাই সক্রিয় করতে হবে। রাউটারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হালনাগাদ, অজানা ডিভাইসের সংযোগ পরীক্ষা করা ও প্রয়োজন নেই এমন দূরবর্তী প্রবেশের সুবিধা সবার আগে বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও ভিডিও নিয়ন্ত্রিত দরজার ক্ষেত্রে কারা ভিডিও দেখতে পারবেন, তা সীমিত করা শ্রেয়। স্মার্ট হোমে থাকা ডিভাইসকে একইভাবে মূল ব্যক্তিগত বা অফিসের নেটওয়ার্ক থেকে আলাদা নেটওয়ার্কে রাখার সুযোগ থাকলে তা করতে হবে। ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তির ব্যবহারে ঘরবাড়ি হয়ে উঠছে স্বয়ংক্রিয় ও সুরক্ষিত। কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ আছে এমন যে কোনো যন্ত্রের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে সুরক্ষার নতুন দায়িত্ব। স্মার্ট হোমের সুবিধার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তাকে নজরদারির অভ্যাসে রূপান্তর করা ছাড়া বিকল্প নেই।
- বিষয় :
- স্মার্টফোন