ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিজয় দিবস ২০২৫

ঘূর্ণিঝড়, বীজদানা, জঙ্গল কিংবা নদীর শক্তি

ঘূর্ণিঝড়, বীজদানা, জঙ্গল কিংবা নদীর শক্তি
×

পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৫ | আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কাঞ্চন মিয়ার সাথে যখন আলাপ হয়, তখন গলগল করে ভিজছে কল্যাণপুর বস্তি, কদাকার পলিথিনে আটকে যাচ্ছিল পানির স্রোত। আবর্জনার নালা ডিঙিয়ে কোনোমতে আমরা একটা ছাপরাতে ঢুকি। এক বিব্রত বৃষ্টির দিনে তার ধারে ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের বয়ান শুনি। ভাজা বাদাম আর হলুদ পাপড় নিয়ে কয়েক নারী এবং শিশুও আমাদের আলাপের সঙ্গী হন। ১৯৭০ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়টি সৃষ্টি হয় এবং ক্রমশ উত্তরদিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়টি ভোলা, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরগুনা, চট্টগ্রাম উপকূলে আছড়ে পড়ে। চুরমার হয়ে যায় ভোলা, রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। তখনও ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেওয়া শুরু হয়নি, ঐতিহাসিক সেই ঘূর্ণিঝড় তাই ‘ভোলা ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবেই পরিচিতি পায়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ২০১৭ সালে বিশ্বের সবচে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে ভোলা ঘূর্ণিঝড়কে তালিকাভুক্ত করে। এই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ, লাখো গবাদি প্রাণিসম্পদ, বহু বন্যপ্রাণী ও গাছপালার করুণ মৃত্যু ঘটে। 

কাঞ্চন মিয়া তখন কৈশোর পাড়ি দিচ্ছেন। ১৫/১৬ বছর হবে বয়স। ঘূর্ণিঝড়ের ১০ দিন আগে বাবা জালাল আহমেদের সাথে গিয়েছিলেন নানার বাড়ি নোয়াখালী। ঘূর্ণিঝড় শুরু হলে সব নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোনোভাবেই গ্রামে ফিরতে পারেননি। সপ্তাহজুড়ে ‘আগা-মেঘা’ বৃষ্টি চলছিল। ১১ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে সব কেমন নিকষ ও বিকল হয়ে আসে। বাতাসের ঘূর্ণি আর পানির উচাটন বাড়তে থাকে। অশান্ত হয়ে ওঠে মেঘনা। রাতের বেলায় এক প্রকাণ্ড জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় ভোলা। তিনি শুনেছেন ২০-২৫ হাত পানি উঠেছিল। মানুষের চিৎকার আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর অন্ধকার ভোরে পিতা ও পুত্র বাড়ি ফেরার জন্য ছুটতে থাকেন। কোনোমতে দুপুরের পর এক নৌকায় তাদের জায়গা হয়। যত তীরের কাছাকাছি আসতে থাকে নৌকা, গরু-ছাগল-মানুষের লাশ ভাসতে দেখেন নৌকায়। লাশ আর বীভৎস গোঙানির ভেতর দিয়ে কোনোমতে ঘরের কাছাকাছি আসতে পারেন। ঘরবাড়ি বলতে কিছুই তখন ছিল না। ঘরের তলায় চাপা পড়েছিল কাঞ্চন মিয়ার মা ছাফিয়া বানুর লাশ। দাফন-কাফনের লোক ছিল না। কোদাল-শাবলের অভাব দেখা দিয়েছিল। কিশোর হাতে পিতার সাথে মায়ের কবর খোঁড়েন। স্বজন-প্রতিবেশীর খবর নিতে নিতে কয়েকদিন পার হয়। চার দিন পরে লালমোহনের এক চরে পানিতে ডোবা কোলের বাচ্চাসহ কাঞ্চন তার মামাতো বোন আলিয়ার লাশ খুঁজে পান। বাড়িতে তিনটি গরু আর হাঁস-মুরগি যা ছিল সব ভেসে গেছিল। ২০ গন্ডা জমিনে পেকে উঠেছিল আমন মৌসুমের ধান, সবই নোনাজলে তলিয়ে গেছিল।

পাকিস্তান সরকার সাথে সাথে কোনো সাড়া দেয়নি। বিধ্বস্ত মানুষের ক্ষোভ ও ক্রোধ ফেনিয়ে ওঠে। অনেক পরে মিলিটারি আসে। তারা কিছু খাবার দেয়, লঙ্গরখানা খোলা হয়। কয়েক বছর ভোলার সর্বত্র লাশের গন্ধ আর ভগ্নস্তূপ ছিল। এই জলোচ্ছ্বাস তাদের জীবন আমূল পাল্টে দেয়। এক বিপন্ন ভয়, ক্রোধ আর আর্তনাদের ট্রমা নিয়ে বড় হতে থাকেন সহস্র কাঞ্চন মিয়া। লাশ আর ভগ্নস্তূপকে সাক্ষী রেখেই ঘূর্ণিঝড়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় গ্রামের পর গ্রাম ক্ষতবিক্ষত মানুষেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু সেই ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়ে জেগে থাকা অতন্দ্র জীবনের পাশে গভীর মমতা নিয়ে রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি কখনও। ভোলা ঘূর্ণিঝড় কাঞ্চন মিয়াদের নিদারুণ গরিব করে দেয়। অভাব-অনটন থেকে তারা আর বের হতে পারেননি। গ্রামে আর কৃষিকাজ লাভজনক না হওয়াতে জীবিকার সন্ধানে জন্মমাটি ছেড়ে ঢাকা শহরে আসতে বাধ্য হন। আশ্রয় হয় বস্তিতে। ঢাকায় হারিয়ে যায় পরিচয়। কৃষক কাঞ্চন মিয়া হয়ে যায় রিকশাঅলা ‘এই মামা’। এখানে স্বস্তি নেই কোনো। আজ বস্তি অঙ্গার হয়, কাল কোনো স্থাপনা নির্মাণের জন্য তুলে দেওয়া হয়। শহরের সব গু-মুত আর ময়লার ঢিবি অকাতরে ঢেলে দেওয়া হয় তাদের ওপর। অথচ এই দেশ, এই ভূগোলের জন্মের দ্রোহ তৈরি করেছিল যে ঘূর্ণিঝড়, কাঞ্চন মিয়ারা সেই স্মৃতির সাক্ষী।

ইতিহাসের বহুমুখী রেখাগুলো পাঠ করলে দেখা যায়, যে কোনো জনসংগ্রাম ও বিদ্রোহ গড়ে ওঠার সাথে স্থানীয় প্রকৃতি ও সংস্কৃতির শক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক সংগ্রাম, উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা মুক্তিযুদ্ধের দ্রোহ গড়ে তুলতে বাস্তুসংস্থানের বৈচিত্র্য এবং জনজীবনের লোকায়ত ধারা জান বাজি রাখা অবদান রেখেছে। অধিপতি ইতিহাস নির্মাণ ও বয়ান কাঠামোতে প্রাণ-প্রকৃতি এবং নিম্নবর্গের লোকায়ত শক্তির অবিস্মরণীয় অবদানকে বরাবরই আড়াল, অপর এবং নিখোঁজ করা হয়। ইতিহাস-বয়ানের এই ধরনের ঔপনিবেশিক বাইনারি প্রবণতা প্রকৃতি ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা থেকে নিম্নবর্গের জনআখ্যানকে বিচ্ছিন্ন ও বিমূর্ত করে ফেলে। একতরফাভাবে কাউকে মহান ও মিথ বানানোর বাহাদুরি করে। মুক্তিযুদ্ধ গড়ে ওঠার সুবিশাল ময়দানে ভোলা ঘূর্ণিঝড়, নদী-জলাভূমি, কৃষিজমি, দেশি ধান ও মাছের বৈচিত্র্য, পাহাড়-টিলা কিংবা বন-জঙ্গলের অবদান এবং ভূমিকা প্রবলভাবে আড়াল হয়ে থাকে। চারধারের প্রাণ-প্রকৃতি মানুষকে কীভাবে ক্ষুব্ধ, দ্রোহী এবং সাহসী হতে শেখায় এবং একজন লড়াকু হিসেবে প্রস্তুত করে এই দৃষ্টিভঙ্গি আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রবল ‘অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক (মানুষকেন্দ্রিক)’ ইতিহাস-কাঠামোয় বিবৃত হতে দেখতে পাই না। চলতি আলাপখানি মুক্তিযুদ্ধ গড়ে ওঠার সাথে প্রাণ-প্রকৃতির ‘নন-অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক’ শক্তির অবদান বিষয়ে এক প্রাথমিক আলাপ তুলতে আগ্রহী। মুক্তিযুদ্ধ এই জনপদের এক ঐতিহাসিক জীবনরেখা। কেবল মানুষ নয়, প্রাণ-প্রকৃতির নানামুখী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এই রেখায় শামিল হয়েছিল। সর্বপ্রাণের ও সর্বজনের অবদান ও তৎপরতাকে স্বীকৃতি ও সম্মান জানিয়ে; সকল কর্তৃত্ব ও অধিপতি বন্দিদশা থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জীবনরেখার মুক্তি জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিস্মৃত ‘ভোলা ঘূর্ণিঝড়’ 
এই ভূগোলের বিগত জনবিদ্রোহগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সম্মিলিত দ্রোহ সমষ্টিগত জাগরণের পেছনে স্থানীয় প্রতিবেশ এবং লোকায়ত জীবনবীক্ষা খুব দরকারি ভিত তৈরি করেছিল। নেত্রকোনার সুসংদুর্গাপুরে হাজংরা যখন ‘হাতিখেদাবিরোধী বিদ্রোহ’ শুরু করেন, তখন বন্যপ্রাণীর প্রতি তাদের লোকায়ত দর্শনই বনের হাতি বাঁচাতে রাজার হুকুমের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহের ক্ষেত্রে আমরা দেখি ফুলমণি ও জানো মুর্মুরা তাদের চার ভাইকে নিয়ে ‘সাঁওতালি গিরার’ মাধ্যমে হুলের ইশতেহার ঘোষণা করেন। হুলের গিরা বা এই আধ্যাত্মিক সামাজিক আহ্বান তারা পেয়েছিলেন শালবনের সাথে সাঁওতালি জীবনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের জিজ্ঞাসা থেকে। তেভাগা, টংক, নানকার, ভানুবিল, বালিশিরা, মধুপুর কিংবা চিম্বুক জনআন্দোলনের দ্রোহও তুমুল হয়েছিল স্থানীয় ভূমি, কৃষিকাজ, ফসলের জাত, পাহাড় ও জঙ্গলের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখল করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। আশেপাশের আদিবাসী গ্রাম থেকে জোর করে ধান-চাল-মুরগি-গরু তারা লুট শুরু করে। হত্যা ও ধর্ষণ শুরু করে। গ্রামে গ্রামে বাহা, সারুল, কারাম, সোহরাই পরব বন্ধ হয়ে যায়। বহু জাহের থান ও মাঞ্জহি থান চুরমার করা হয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আদিবাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। গ্রামে গ্রামে সভা ডাকেন। কারাম গাছের কাহিনি বহু ওরাওঁ-সাঁওতালদের সাহস জোগায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ তির-ধনুক-বাউংকা-শাল গাছের লাঠি নিয়ে বুদু লাকড়ার নেতৃত্বে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখলমুক্ত করতে সহস্র আদিবাসী রক্তাক্ত হন।

কেন এবং কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ গড়ে উঠেছিল। কোন বাহাস, বিবাদ, বৈষম্য ও বিশ্লেষণগুলো তরিকা ও তত্ত্ব হিসেবে এর বুনিয়াদ গড়ে তুলেছিল মুক্তিযুদ্ধের কাঠামোগত ইতিহাসে বহু তর্কসহ এর নজির আছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যায় শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য, কর্তৃত্ব ও অপরায়ণের বিরুদ্ধে এক সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষার গণজাগরণই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। জোর-জুলুম আর জবরদস্তির বিরুদ্ধে এই জনআওয়াজ দুম করে দানা বাঁধেনি। 

এমনও নয় যে, এক ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল বলেই বৈষম্যপীড়িত বিধ্বস্ত জনগণ প্রবল রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার বিরুদ্ধে জান বাজি রেখেছিল। তবে ভোলা ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে ক্ষতবিক্ষত নিরন্ন জনপদের প্রতি চরম রাষ্ট্রীয় অবহেলা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ক্ষুব্ধ ও দ্রোহী করে তুলেছিল।

ভোলার মনপুরা ও তজুমদ্দিন ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ে সবচে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাঁচড়া, শিবপুর, বাদলীপুর, গোলকপুর, লম্ভুপুর, লামদি, কোড়ালমারা, সোনাপুর, চাপড়ী, রাজকৃষ্ণসেন, সৃষ্টিধরগুহ, উন্দ্রনারায়ণপ্রর, ভুইয়াকান্দি, ভুলাইকান্দি, ঘোষের হাওলা, ডাইয়ারগাঁও, শশীগঞ্জ, দড়ি চাঁদপুর, বাদুয়া, আড়ালিয়া, কালাশিয়া, কেয়ামূল্যা, মলংচড়া গ্রামগুলো লাশের ঢিবি হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ে তজুমদ্দিনের এক লাখ ৬৭ হাজারের ভেতর ৭৭ হাজার জনই মারা যান।

ঘূর্ণিঝড়ের পরে গার্ডিয়ান পত্রিকার সাংবাদিক হাওয়ার্ড হোয়াইটেন মনপুরা ঘুরে দেখেন এবং বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের বর্ণনা দেন। মনপুরার ২২ হাজারের ভেতর ১৬ হাজারই মারা যান বলে তিনি জানান। খাবার ও পানির তীব্র অভাব শুরু হয়। ছড়িয়ে পড়ে ডায়রিয়া, কলেরার মতো অসুখ। পাকিস্তান সরকার ক্ষতিগ্রস্ত জনপদে প্রথম দিন যায়নি। 
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান উপদ্রুত এলাকায় যেতেই চাননি। পরে এ নিয়ে জনঅসন্তোষ তৈরি হলে তিনি শেষে যেতে বাধ্য হলেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নামেননি। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা তখন ভোলায় গিয়েছিলন। তিনি ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি : ইস্ট পাকিস্তান ১৯৬৯-১৯৭১’ বইতে ভোলা ঘূর্ণিঝড় নিয়ে লিখেছেন। ঘূর্ণিঝড়ের দিন ঢাকায় ছিলেন, ঢাকাতেও তখন ঝোড়ো হাওয়াতে বহু গাছ উপড়ে পড়েছিল। মওলানা ভাসানী ঢাকায় চিকিৎসারত অবস্থায় ছিলেন এবং অসুস্থ শরীর নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যান এবং ফিরে এসে পল্টন ময়দানে সমাবেশ করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তান সরকারের অবহেলা এবং বৈষম্য তুলে ধরেন। শেখ মুজিবুর রহমান তখন দুর্গত জনজীবনের সপক্ষে দাঁড়াতে আহ্বান জানান। ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয় এবং আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনজীবনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও দ্রোহের ভিত্তি ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের ভেতর দিয়ে আরও মজবুত এবং প্রামাণ্য হতে থাকে এবং মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে এর রক্তজয়ী প্রকাশ ঘটে।

হাইব্রিড ধান কিংবা তেলাপিয়া মাছ কি মুক্তিযুদ্ধে শক্তি জুগিয়েছিল?
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, তখনও বহুজাতিক কোম্পানিরা এই ভূগোলের জুম-কৃষি বন্দি করেনি। ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে জমিনে ভোলা অঞ্চলে আমন মৌসুমের রাজাশাইল, কাজলশাইল, লালগোটা, ঘিগজ ও কালিয়াজিরা ধানের আবাদ ছিল। 

এর আগে খোয়াআউশ ধান কাটা শেষ হয়। মসুর ডাল, মুগ, খেসারি কালাই, হেলন ডাল, বাদাম, আলু, কুমড়া, মুলা, শাকসবজি, রসুন, পেঁয়াজ চাষ হতো তখন। আশ্বিনে জমিতে খেসারি ছিটানো হতো, খেসারির পরপরই পৌষে মুগডাল ও হেলন ডাল বোনা হতো। স্বাধীন দেশে আজ ভোলায় কৃষকের ঘরে দেশি ধান ও ফসলের জাত নেই। বীজ, বিষ, সিনথেটিক সার কিংবা যন্ত্রনির্ভর সেচের জন্য কৃষক আজ বাজার ও কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার জনগণ দেশি ধানের ভাত ও নদী-খালের দেশি মাছ থেকেই শক্তি পেয়েছে। হাওরাঞ্চলে লোহাটাং, গচি, রাতা, ধলি বোরো, বইয়াখাওরি, গদালাকি কিংবা সুন্দরবন অঞ্চলে নোনাখচি, দাদখানি, বুড়ো মন্তেশ্বর, হলদেগোটাল, খেজুরছড়ি ধানের আবাদ ছিল তখন। পাহাড়ে খববক, গ্যাল্লং, লালবিনি, হালাবিনি কিংবা বরেন্দ্র অঞ্চলে মুগী, সোনাশাইল, রাধুনীপাগল, সোনাকাঠি ধানের আবাদ হতো। ষাটের দশকে তথাকথিত সবুজবিপ্লব রাষ্ট্র কর্তৃক তথাকথিত সবুজবিপ্লব প্রকল্প জোর করে কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। কৃষকেরা ধীরে ধীরে বিপদটা আঁচ করতে পারেন। বীজ, মাটি, পানি ও লোকায়ত জ্ঞান ক্রমশই কোনো অদৃশ্য বাহাদুরের জিম্মায় বন্দি হতে চলেছে। তেভাগা, টংক, নানকার দ্রোহের ঝাঁঝ তাদের স্মরণে ছিল। হাজার বছরের ঐতিহাসিক কৃষিধারা এবং জাতবৈচিত্র্য সুরক্ষার একটা তাগিদ তখনও গ্রামে গ্রামে জোরালো ছিল। সবুজবিপ্লব প্রকল্প এবং কৃত্রিম সেচ নিয়ে তখনও বেশকিছু দরবার ও বাহাস হয়েছে। কৃষকেরা বীজ, মাটি, পানি এবং কৃষির এক সার্বভৌম চেহারার আর্জি কলিজায় ধারণ করেছিলেন। রাষ্ট্র ছিল সেই আর্জির বিরুদ্ধে, আর কৃষক সত্তার দ্রোহের দানা বাঁধতে এইসব লোকায়ত কৃষি জীবনধারার জিজ্ঞাসাও কাজ করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাসহ গ্রামাঞ্চলের কোটি মানুষের আহার ও পুষ্টি জুগিয়েছিল নদী-খাল-বিলের দেশি মাছ। দেশের নানা প্রান্তের মানুষদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে তারা কেমন মাছ পেতেন তার একটি ধারণা পেয়েছি। অধিকাংশই পুঁটি, টেংরা, বোয়াল, টাকি, শিং, রুই, রানী, কই, কাংলা, মেনি, দারকিনা, কুচিয়া, ইচা, বইরাল, মাগুর, মলা, ঢেলা, গুতুম, লইট্টা, চান্দা মাছের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার দশাসই বাণিজ্যিক উন্নয়নের কারণে আমাদের চারধার থেকে মাছেদের বৈচিত্র্য নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের খাবারের থালা আজ আটকে আছে নাম্বারঅলা উফশী ও হাইব্রিড ধানের ভাত আর চাষের পাঙাশ-তেলাপিয়া কিংবা সিলভারকার্পের বাহাদুরিতে।

নদী-জলাভূমির মুক্তিযুদ্ধ
বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধও এক নদীমাতৃক সংগ্রাম। বহু সম্মুখসমর সংঘটিত হয়েছে নদী-জলাভূমিতে। ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’ এভাবে নদী-পরিচয়েই গড়ে উঠেছিল এই ভূগোলের আত্মপরিচয়। পাহাড় কি সমতল এই দেশের মানুষের যাপিত জীবন নদনদীর গ্রন্থিতে আস্থাশীল। আর তাই মুক্তিযুদ্ধে নদীপথ যেমন হয়ে উঠেছিল রণকৌশলের ক্ষেত্র আবার একইসাথে নদীই বাঁচিয়ে ছিল বহু রক্তক্ষত মানুষের জীবন। পাকিস্তানি সেনাদের কাছে ঘোরবর্ষা, নদী-জলাভূমি, কীটপতঙ্গ এবং মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া ছিল আতঙ্কের বিষয়। গ্রামাঞ্চলের সাঁতার কাটা দামাল ছেলেমেয়েরা যুদ্ধের জন্য নদীকেই সঙ্গী করেছিল। খাসি মুক্তিবেটি কাকেত হেনইঞতা কিংবা বীরপ্রতীক তারামন বিবি বহু বারুদ, বোমা, খাবার ও পথ্য নিয়ে নদীপথ সাঁতরে গেছেন। নদীই অনন্য ভরসাস্থল হয়ে সাহস, আশ্রয় ও শক্তি জুগিয়েছিল তার সন্তানদের। খুলনা, মোংলা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর মুক্তিযুদ্ধের সময় হামলার অন্যতম লক্ষ্যবিন্দু হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীরেখায় দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা দেশের ১৪১৫টি দীর্ণ-রুগ্‌ণ-রক্তাক্ত নদনদীর মৃত্যুমিছিল আমাদের আহত ও অপরাধী করে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের পরিবেশগত অবদান
মুক্তিযুদ্ধে নদী, হাওর, বিল জলাভূমি, কৃষিজমি, পাহাড়, চর, বনাঞ্চল, গবাদি প্রাণিসম্পদ ও বন্যপ্রাণীসহ সামগ্রিক প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের অবদান ও ভূমিকাকে আমরা এখনও দলিলায়ন এবং স্বীকৃতি দিতে পারিনি। একইসাথে মুক্তিযুদ্ধে আহত, নিহত, ক্ষতিগ্রস্ত বৃক্ষ, বন্যপ্রাণী এবং গবাদি প্রাণিসম্পদ এবং প্রাকৃতিক ব্যবস্থার বিশ্বস্ত তালিকা তৈরি করতে আমরা এখনও প্রস্তুত হইনি। সংবিধানে পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষার অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তবে রাষ্ট্র মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিবেশমুখর নয়।

সুন্দরবন, রেমা-কালেঙ্গা, লাউয়াছড়া, রাতারগুল, রাজকান্দি, লাঠিটিলা, সাঙ্গু, পাবলাখালি, ভাওয়াল, মধুপুর, সিংড়াসহ দেশের প্রায় সকল বনাঞ্চলই মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী। এইসব অরণ্য মানুষদের আশ্রয় দিয়েছে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা এবং কৌশলগত এলাকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

একইভাবে দেশের পাহাড়, চরাঞ্চল, বরেন্দ্র এবং টিলাভূমিগুলোও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবদান রেখেছে। আবার একইসাথে এসব ভিন্ন ভিন্ন বাস্তুতন্ত্র স্থানীয় জনগণের চিন্তা ও সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে এবং একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল সম্পর্ক বিনির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষ্য নিয়ে বেঁচে ও জেগে থাকা বৃক্ষ, বাস্তুতন্ত্র, নদী এবং প্রাকৃতিক সম্পদগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে জাতীয় ইতিহাসগ্রন্থন প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশব্যবস্থার অবদানের স্বীকৃতি জরুরি। মেহেরপুরের আমবাগান থেকে শুরু করে যশোর রোডের বৃষ্টিবৃক্ষসহ দেশের সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধসহ সকল জনসংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত বৃক্ষদের সম্মানপূর্বক সুরক্ষা জরুরি।

প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অভিন্ন ব্যাকরণ
কেবল মানুষ নয়, প্রতিটি প্রাণসত্তাই গড়ে ওঠে প্রকৃতির ব্যাকরণে। নিম্নবর্গের সমাজ, আদিবাসী কি গ্রামীণ জনগণ এই ব্যাকরণের সাথেই গড়ে তুলে তার সংস্কৃতির ব্যাকরণ। প্রকৃতির সাথে গ্রামীণ নিম্নবর্গের সাংস্কৃতিক পাঠের দরবার, দ্বন্দ্ব, বাহাস, যন্ত্রণা ও কারিগরি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র এবং লোকায়ত দর্শনের ধারাবাহিকতা নিয়ে চলে। এই ব্যাকরণের ওপর যখনই কোনো জোর, জুলুম, জবরদস্তি চড়াও হয় তখনই প্রকৃতি এবং সংস্কৃতি তার প্রতিবাদ জানায়। বার্তা দেয়। জান বাজি রেখে দাঁড়ায়। গ্রামীণ নিম্নবর্গের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সীমানার ওপর প্রবল ঔপনিবেশিক জুলুম জারির বিরুদ্ধে বারবার গড়ে উঠেছে জনসংগ্রাম। মুক্তির সামষ্টিক আওয়াজ। মুক্তিযুদ্ধ সেই ধারাবাহিক আওয়াজের উত্তরাধিকার।

আমাদের বিস্মৃত হলে চলবে না, আমাদের চিন্তার ভুবন ও দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ কেবল অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক নয়। আমাদের চারধারের কোনো পাখি, পতঙ্গ, ধান, মেঘের দানা, রোদের গুটি, সরীসৃপ, গানের কলি বা নাচের মুদ্রা বা রঙের আঁচড় বা হারিয়ে যাওয়া কোনো খণ্ডবিখণ্ড বিভ্রম; আমাদের দেখা-অদেখা সকলকিছুই নানাভাবে আমাদের চিন্তাপদ্ধতি, ক্ষোভ ও জাগরণের স্পৃহা ও প্রাবল্য তৈরি করে। মুক্তিযুদ্ধে আমরা শামিল হই এমনই নানারূপের স্মৃতি-বিস্মৃতির স্ফুরণ ও স্ফুলিঙ্গ নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ গড়ে ওঠার পেছনে মানুষের সমাজ, কাঠামোগত রাজনৈতিকতা কিংবা সমাজরূপান্তরের ঐতিহাসিক বঞ্চনা এবং বিদ্রোহের রেখাসমূহ যেমন আমাদের পাঠ করা জরুরি; একইসাথে প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের অবদান এবং সম্পর্ককেও আমাদের আলাপ থেকে বিচ্ছিন্ন ও অপর করে রাখার রাজনীতিটাও বোঝা জরুরি।

চলতি আলাপখানি আমরা শুরু করেছিলাম ভোলা ঘূর্ণিঝড় দিয়ে। একটি ঘূর্ণিঝড় একটি জনযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আমাদের মুক্তিবার্তা দিয়েছিল। নদী, পাহাড়, বন কিংবা বীজদানা আমাদের মুক্তিযাত্রাকে সমুন্নত রেখেছিল। প্রকৃতির এমন বহু বৈচিত্র্য, আপদ-বিপদ, উচাটন, যন্ত্রণা কিংবা বুদ্‌বুদ আমাদের যাপিত জীবনের সঙ্গী হয়ে আছে। আমরা হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতি হিসেবে প্রকৃতি ও সংস্কৃতির যুগলগ্রন্থিতেই বড় হই। কেবল মানুষ নয়; মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাখি, ধান, নদী, মাছ, জঙ্গল ও পাহাড়ের শক্তিকে নিয়েই বিস্তৃত ও বিকশিত হোক।

আরও পড়ুন

×