লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সংকট: কৃষি প্রশ্ন এবং আগামীর বাংলাদেশ
বিজয় দিবস ২০২৫
ফরহাদ মজহার
ফরহাদ মজহার
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৬ | আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে যারা কেবল ভাষা, সংস্কৃতি বা সেক্যুলার জাতিবাদের একমাত্রিক চশমা দিয়ে পাঠ করেন, তারা গোড়াতেই এক মস্ত বড় ভুল করে বসেন। এই ভূখণ্ডের লড়াইয়ের ইতিহাসকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে এর মাটির দিকে, এর কাদাজলে বেড়ে ওঠা কৃষকের দিকে। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং কোনো রাখঢাক না রেখেই বলা প্রয়োজন– পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠনই ছিল আমাদের প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি। এই প্রস্তাবনা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর, এমনকি পীড়াদায়কও ঠেকতে পারে; কিন্তু ইতিহাস আমাদের সেই রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পাকিস্তান আন্দোলন কোনো নিছক সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ছিল না; বরং এটি ছিল এই বদ্বীপের শোষিত কৃষককুলের এক ঐতিহাসিক শ্রেণিসংগ্রাম, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং আজকের বাংলাদেশ।
সামন্তবাদবিরোধী লড়াই থেকে পাকিস্তান
লড়াইটা গোড়ায় ‘পাকিস্তান কায়েম’-এর ছিল না, লড়াইটা ছিল এই অঞ্চলের কৃষকের অস্তিত্ব রক্ষার। পলাশীতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে যে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা, তার বিষবৃক্ষটি মহিরুহ হয়ে ওঠে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের ‘পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট’ বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে। এই বন্দোবস্ত কেবল একটি ভূমি আইন ছিল না; এটি ছিল বাংলার সমাজকাঠামোকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার এক গভীর চক্রান্ত। এই বন্দোবস্তের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বাংলার হাজার বছরের স্বাধীন কৃষক তার জমির মালিকানা হারাল। জমির মালিক হয়ে বসল ইংরেজদের সৃষ্টি করা এক নতুন পরগাছা শ্রেণি– মধ্যস্বত্বভোগী বা জমিদার। এই নব্য জমিদার শ্রেণি ইংরেজদের বার্ষিক খাজনা জোগাত, আর নিজেরা কৃষকের রক্ত চুষে নিজেদের বিত্তের পাহাড় গড়ত। আজকের যে তিলোত্তমা কলকাতা শহর, তার দিকে তাকান। এর প্রতিটি অট্টালিকা, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের শ্বেতপাথর কিংবা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আভিজাত্য– প্রতিটি ইটে মিশে আছে পূর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকের রক্ত আর ঘাম। কলকাতা শহর গড়ে উঠেছে এই কৃষিপ্রধান বাংলাকে শোষণ করার মধ্য দিয়ে, ঠিক যেভাবে একটি পরগাছা মূল বৃক্ষকে শোষণ করে বেঁচে থাকে। কলকাতার যে তথাকথিত শিক্ষিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি– যারা পরবর্তীকালে উকিল, মোক্তার, ডাক্তার বা বুদ্ধিজীবী হিশাবে আবির্ভূত হলেন এবং ‘রেনেসাঁ’র ধ্বজাধারী সাজলেন– তারা প্রত্যেকেই এই শোষক জমিদারি ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ফসল। এটি ছিল এক ধরনের সামন্তবাদ, যা এই মাটির নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মায়নি; বরং ঔপনিবেশিক প্রভুদের দ্বারা আরোপিত। সুতরাং আমাদের এই অঞ্চলের প্রথম যে রাজনৈতিক জাগরণ, তা ছিল এই ঔপনিবেশিক জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে। এটি ছিল প্রধানত মুসলমান কৃষকের লড়াই। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, এ লড়াইয়ে কেবল মুসলমানরাই ছিল না; তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নিম্নবর্গের হিন্দু বা দলিত সমাজ। কারণ তারাও ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী জমিদারতন্ত্রের দ্বারা সমানভাবে নিগৃহীত। যোগেন মণ্ডলের মতো দলিত নেতারা যে পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছিলেন, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল উচ্চবর্ণের শোষণ আর ইংরেজদের সৃষ্ট জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক প্রলয়ঙ্করী জোট। বর্ণহিন্দু জমিদার ও মহাজনের শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট নমশূদ্র এবং মুসলমান কৃষক সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৪৭-এর ভারত বিভাজনকে যারা কেবল ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন হিশাবে দেখেন, তারা ইতিহাসের উপরিভাগটাই দেখেছেন মাত্র। মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে, ১৯৪৭ সালের আন্দোলন ছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল আন্দোলন। মওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক– এখানকার রাজনীতিকদের মূল এজেন্ডা ছিল জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করা এবং কৃষকের হাতে জমির মালিকানা তুলে দেওয়া। পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্য দিয়েই তারা এই সামন্তপ্রথার বিলোপ চেয়েছিলেন।
অথচ আমাদের তথাকথিত বামপন্থিরা, যারা কলকাতার বাবু কালচারে দীক্ষিত ছিলেন, তারা একে সাম্প্রদায়িকতা হিশাবে দাগিয়ে দিয়েছেন। তেভাগা আন্দোলনের সময় বামরা স্লোগান তুলেছিল ফসলের তিন ভাগের এক ভাগ জমিদারের, বাকিটা কৃষকের। অর্থাৎ তারা জমিদারের অস্তিত্ব মেনে নিয়েছিলেন, কেবল ফসলের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দরকষাকষি করেছেন। কিন্তু ১৯৪৭-এর চেতনা ছিল জমিদারি প্রথার আমূল উৎপাটন। কৃষকের দাবি ছিল স্পষ্ট– সে জমির মালিকানা চায়, ভাগচাষী হতে চায় না।
১৯৫০ সালে পূর্ব বাংলা জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলো– এটি ছিল এই অঞ্চলের কৃষকের এক বিরাট ঐতিহাসিক বিজয়। যেহেতু তৎকালীন পূর্ব বাংলার শোষক জমিদার ও মহাজনরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং শোষিত প্রজা ছিল মুসলমান ও নিম্নবর্গের হিন্দু, তাই এই শ্রেণিসংগ্রামটি একটি বাহ্যিক ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। কিন্তু এর অন্তঃসার ছিল পুরোদস্তুর অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত মুক্তির লড়াই। তাই ’৪৭-কে অস্বীকার করা মানে এই অঞ্চলের কৃষকের আত্মজাগরণকে অস্বীকার করা।
বায়ান্ন থেকে একাত্তর
১৯৪৭-এর পর আমাদের লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো। কৃষক যখন জমির মালিকানা পেল, তখন তাঁর স্বপ্ন ডানা মেলল শিক্ষার দিকে। একশ বছর ধরে যে মুসলমান কৃষক ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করেছিল কিংবা বলা ভালো ঔপনিবেশিক শিক্ষাকাঠামোতে প্রবেশের সুযোগ পায়নি, এবার সে তার সন্তানকে পাঠশালার গণ্ডি পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইল। সে চাইল তার সন্তানও উকিল হোক, হাকিম হোক, রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিক। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধছিল, যা পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ণতা পাওয়ার কথা ছিল।
১৯৫২ সালে যখন ছাত্রের বুকে গুলি চলল, তখন সেটা কেবল ‘অ আ ক খ’ রক্ষার লড়াই ছিল না। ওই গুলিটা লেগেছিল সদ্য জেগে ওঠা বাঙালি মুসলমানের বিকাশের আকাঙ্ক্ষার বুকে। যে কৃষক পাট বেচে, হালের বলদ বেচে ছেলেকে ঢাকায় পড়তে পাঠিয়েছে, সে দেখল তার নিজের রাষ্ট্র– যে রাষ্ট্র সে ভোট দিয়ে বানিয়েছে– সেই রাষ্ট্রই তার সন্তানের বুকে গুলি চালিয়েছে। এই ক্ষোভ ছিল দাবানলের মতো।
যারা ভাষা আন্দোলনকে কেবল ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ হিশাবে দেখেন–বদরুদ্দীন উমর থেকে শুরু করে অনেকেই– তারা এই ঘটনার ‘শ্রেণি চরিত্র’ পাঠ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। উমর সাহেব শ্রেণিসচেতন হয়েও শেষাবধি বাঙালি জাতীয়তাবাদের খোলস থেকে বের হতে পারেননি। তিনি বুঝতে পারেননি যে ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত একটি নবগঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশীদারিত্বের দাবি।
ভাষার লড়াইয়ে যারা প্রাণ দিল, যারা মিছিল করল, তাদের সিংহভাগই ছিল মুসলমান ঘরের সন্তান। ঢাকার শহীদ মিনার নির্মাণে পুরান ঢাকার সরদাররা যে ইট-সুরকি আর শ্রম দিয়েছিল কিংবা উর্দুভাষী মুসলিম ধনাঢ্য পরিবারের নারীরা যেভাবে গায়ের গহনা খুলে দিয়েছিল– তা কি কেবল বাংলা ভাষার প্রেমে? না। তারা একে দেখেছিল নিপীড়িত মুসলমানের ওপর রাষ্ট্রের অন্যায্য আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিশাবে। তারা দেখেছিল, যে পাকিস্তান তারা কায়েম করেছিল, সেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আবার নতুন এক ঔপনিবেশিক প্রভুতে পরিণত হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম, এক ধরনের সেক্যুলার বাঙালি জাতিবাদী বয়ান তৈরি হলো, যা সুকৌশলে এই লড়াইয়ের ইসলামী ও শ্রেণিগত উপাদানকে মুছে ফেলল। কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মানদণ্ড ধরে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এমন এক ‘বাঙালি’ পরিচয় নির্মাণ করলেন, যেখানে মুসলমানের জীবনাচরণ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনাহূত। বাঙালি জাতিবাদ যখন ইসলামকে বাদ দিয়ে কেবল ভাষাভিত্তিক পরিচয় দাঁড় করাতে চাইল, তখন তা প্রকারান্তরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে চলে গেল। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এই দাবিরই রাজনৈতিক পরিণতি হলো বাংলাদেশ। আমরা চেয়েছিলাম এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে আমাদের মুসলমান পরিচয় এবং বাঙালি পরিচয়– উভয়ই সগৌরবে বিরাজ করবে।
পাকিস্তান কেন টিকল না
পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভেঙে গেল; কারণ পাকিস্তান তার জন্মের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা সামাজিক চুক্তি রক্ষা করতে পারেনি। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল একাধিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বা অন্ততপক্ষে পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ ফেডারেল কাঠামো। কিন্তু তা না করে রাষ্ট্রকে কেন্দ্রীভূত করা হলো। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলারা মনে করলেন, কেন্দ্র শক্তিশালী না হলে রাষ্ট্র টিকবে না।
সংবিধান রচনায় ব্যর্থতা পাকিস্তানকে পঙ্গু করে দিল। সিন্ধু, বালুচিস্তান কিংবা পূর্ব পাকিস্তান– সকল জাতিসত্তার স্বকীয়তা মেনে নিয়ে যদি ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব পাকিস্তান’ বা সত্যিকারের ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন করা হতো, তবে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বিশেষ গোষ্ঠীর (পাঞ্জাবি ও মোহাজির) স্বার্থ চাপিয়ে দিল এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করল, তখন এক পাকিস্তান টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ল। শেখ মুজিবুর রহমান চাইলেও আর ফেরার পথ ছিল না। তিনি আজীবন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করেছেন; কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা যখন যুদ্ধের পথ বেছে নিল, তখন জনতাও প্রতিরোধ গড়ে তুলল। জনগণের ওপর যখন অস্তিত্বের সংকট নেমে আসে, তখন জনগণই প্রতিরোধ গড়ে তোলে– সেনাবাহিনী দিয়ে তখন আর রাষ্ট্র টেকে না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আগামীর বাংলাদেশ: ইনসাফ ও গণসার্বভৌমত্বের রাজনীতি
এখন প্রশ্ন হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কী করলাম? আমরা কি সেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠন করতে পেরেছি? বিগত পাঁচ দশকের ইতিহাস, বিশেষ করে শেখ হাসিনার পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী জমানা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের রাষ্ট্র গঠনের দার্শনিক ও মতাদর্শিক ভিত্তিতেই গলদ রয়ে গেছে। আমরা এক ধরনের উগ্র বাঙালি জাতিবাদ অথবা উগ্র ধর্মবাদ– এই দুই মেরুর দোটানায় দুলছি। একদল মনে করে, ইসলামকে বাদ দিলেই প্রগতিশীল হওয়া যায়। আরেকদল মনে করে, আরব সংস্কৃতি অনুকরণ করলেই খাঁটি মুসলমান হওয়া যায়। এই দুই রাস্তাই আত্মঘাতী।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে নতুন করে রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আমাদের ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের ধারণাকে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। ইসলামকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে নয়; বরং ইসলামের ইনসাফ বা ন্যায়ের ধারণাকে আত্মস্থ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। একটি রাষ্ট্র যখন ইনসাফের ওপর দাঁড়ায়, তখন সে রাষ্ট্র আল্লাহর নিকটবর্তী হয়।
এই ইনসাফ কেবল মুসলমানের জন্য নয়; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, দলিত, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে– সকলের জন্য। একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী বা ‘উম্মাহ’ গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্ম মানে আরব বা ইরানের সংস্কৃতি হুবহু অনুকরণ করা নয়। আল্লাহ বৈচিত্র্য পছন্দ করেন। বাংলা ভাষাও আল্লাহর দান। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করেছেন, যাতে তারা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। তাই নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নয়; বরং নিজের ভাষার মধ্যে থেকেই ইসলাম ও জগৎকে বুঝতে হবে।
আগামীর বাংলাদেশ হবে ‘গণসার্বভৌমত্ব’ বা জনগণের অভিপ্রায়ের ওপর ভিত্তি করে। এখানে রাষ্ট্র কোনো প্রভু হবে না, হবে সেবক। ইনসাফের ভিত্তিতে এক নতুন সামাজিক চুক্তি আমাদের তৈরি করতে হবে। যেখানে বিচার বিভাগ হবে স্বতন্ত্র, প্রশাসন হবে জনমুখী এবং রাষ্ট্র হবে মানবিক।
পরিশেষে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল বক্তব্যই ইনসাফ কায়েম করা। কথাগুলো ইতোমধ্যে এসে গেছে আমাদের সমাজে। আগামী দিনে আমাদের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। আমরা উপলব্ধির জগতে প্রবেশ করেছি। সেই উপলব্ধিকে বাস্তবায়িত করাটাই এখন আমাদের কাজ।
১৬ ডিসেম্বরের বিজয় তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা রাষ্ট্রকে নিছক একটি ক্ষমতার যন্ত্র না ভেবে, একে ন্যায়ের প্রতিরূপ হিশাবে গড়ে তুলতে পারব। মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো এবং জালিমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই ইসলামের শিক্ষা, আর এটাই হোক আগামীর বাংলাদেশ গড়ার মূলমন্ত্র। আমাদের ভাষা, আমাদের ধর্ম, আমাদের সংস্কৃতি– সব মিলিয়েই আমরা। এর কোনোটি বাদ দিয়ে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
[সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে শ্রুতিলিখন: শাহেরীন আরাফাত]
- বিষয় :
- ফরহাদ মজহার
