দখল দাপটে মৃতপ্রায় শালমারা
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ মার্চ ২০২২ | ১৪:৩২
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী শালমারা নদী। মিঠাপুকুরের ঘাঘট নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে একই উপজেলার ভাংনী ইউনিয়নের কাশিনাথপুর গ্রামে কাফ্রিখাল নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে এই নদী। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। স্থান বিশেষে এ নদীর প্রস্থ ১০০ মিটার। তবে দখলদারদের দাপটে নদীর চিরাচরিত প্রবাহ আর চোখে পড়ে না। জেলের জাল থাকলেও এখানে মাছ নেই। নদীর বুকজুড়ে দখলদাররা ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন করছে। বিক্রি করা হচ্ছে নদীর মাটিও। এভাবেই হারিয়ে গেছে এর জীববৈচিত্র্য। নদীটি এখন প্রায় মৃত।
দখলের কারণে ব্রিজ এলাকা ছাড়া অনেক স্থানে নদী সমতল হয়ে গেছে। বর্ষায় এটি পানি ধরতে রাখতে না পারায় বন্যায় বাড়ে দুই পাড়ের মানুষের দুর্ভোগ। শুস্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ না থাকায় সেচ সংকটে পড়েন কৃষক। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ায় অতিথি পাখিসহ অন্যান্য পাখির কলরব নেই নদীর পাড়ে।
মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ ইউনিয়নের বুক চিরে প্রবাহিত এ নদীকে স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছে। দখলদারদের কারণে খনন সম্পন্ন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। নদীপ্রেমীরা তাই সোচ্চার হয়ে উঠছেন। স্থানীয়দের দাবি, নদীর পুরোনো প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
যেভাবে নদী হলো ব্যক্তির: কালের বিবর্তনে স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি শালমারা নদীর পাড়ে ইংরেজদের তৈরি করা উঁচু গড় কেটে নদী ভরাট করেছে। আশির দশকে এ নদীর কিছু অংশ ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। সেই থেকে দখলদাররা শুরু করেন মাছ চাষ ও ফসল আবাদ। মিঠাপুকুর উপজেলা ভূমি কার্যালয় থেকে জানা যায়, শালমারা লতিবপুর মৌজার এক নম্বর খতিয়ানভুক্ত দাগ নম্বর ২৮৮/২৯৫-এর জমি ৮ দশমিক ৫৮ একর (শ্রেণি বিল) এবং দাগ নম্বর ১২২/৩১৮-এর জমি ৫ দশমিক ৩৮ একর (শ্রেণি নদী)। ওই দাগের মধ্যে শালমারা লতিবপুরের মৃত বছির উদ্দিনের ছেলে ছোহরাবের কাছে দশমিক ৫০ একর, আব্দুস সামাদের ছেলেদের মধ্যে নুরুন নবী মিয়া, নূর রহমান ও নূরুল ইসলামের কাছে এক একর করে এবং খামার কুর্শা এলাকার ছমির উদ্দিনের ছেলে ছোলায়মান মিয়া ও আমিন উদ্দিনের কাছে দেড় একর করে মোট ৩ একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তবে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে সোচ্চার হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন: শালমারা বাজারের ব্রিজের নিচে বোরো ধান আবাদ করেছেন নূর রহমান। পাশেই নদীর আরেকটি অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গা থেকে কচুরিপানা পরিস্কার করছেন তার শ্রমিকরা। দ্রুত সেখানকার স্বল্প পানি সরিয়ে বোরো আবাদ করবেন দখলদার নূর রহমান।
বাধার মুখে খনন, পাড়ের মাটি বিক্রি: নদীর বুকে থাকা ব্রিজটির নিচ থেকে উজানের দিকে কিছু দূর এগিয়ে গেলেই দেখা মেলে শ্মশানের। এর কিছু দূর এগিয়ে গেলেই শেষ হয় নূর রহমানের দখলীয় নদী এলাকা। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালে ইআইআরপি প্রকল্পের মাধ্যমে শালমারা খননের উদ্যোগ নিলেও নূর রহমান ও ছোলায়মানদের বাধার মুখে ৬ কিলোমিটারের পর আর খনন করতে পারেনি তারা। খনন করা নদীপাড়ের কিছু মাটি বিক্রিসহ পাড় কেটে আলু, বোরো চাষাবাদ করছে দখলদাররা।
ইকবালপুরের মৎস্যজীবী রামেশ্বর বলেন, নদীতে পানি নেই, মাছ নেই। আগের মতো পাখিও বসে না। নদী একেবারে মরে গেছে। স্থানীয় আতিয়ার রহমান বলেন, আমরা যারা নদী বাঁচানোর আন্দোলনের সঙ্গে আছি, তাদের সব সময় হুমকি দিচ্ছে দখলদাররা। এ নদীটি খনন না হওয়ার কারণে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের পানি নিস্কাশনে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বর্ষায় আমাদের ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি ডুবে যায়। শালমারা নদী বাঁচাও কমিটির সভাপতি শাহজালাল মিয়া বলেন, আমরা এ নদীর স্বাভাবিক রূপ দেখতে চাই।
দখলদার ছোলায়মান মিয়ার ছেলে শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কথা না বলেই দখলে থাকা জমি কেটে নদী করে দিয়েছে। নদী তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাক, সেটি তারাও চান।
নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ: সম্প্রতি মিঠাপুকুর উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখতে পান, এটি একটি প্রবাহমান নদী। ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত হওয়ায় বিভিন্নভাবে নদীর প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চলতি মাসে ৬ ব্যক্তির কাছে থাকা সাড়ে ৬ একর জমির বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি চিঠি দিয়েছে উপজেলা ভূমি অফিস।
যা বলছে প্রশাসন: মিঠাপুকুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিতে আমরা কাজ করছি।
বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইআইআরপি প্রকল্পের পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান বলেন, ২০ কিলোমিটারের নদীটির ৬ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। বাকি অংশ দখলদারদের কারণে খনন করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি আমরা জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি।
রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, নদী খনন জটিলতা নিরসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
