প্রশাসন নিষ্ক্রিয়, ফের চাঁদায় চলছে বালুবাহী বাল্কহেড
প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ডহরী-তালতলা খালে নির্বিঘ্নে চলছে বালুবাহী বাল্কহেড। সম্প্রতি তোলা সমকাল
লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
লৌহজং উপজেলার ডহরী-তালতলা খালে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ফের চলাচল করছে বালুবাহী বাল্কহেড। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে একটি চক্র চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে শত শত বাল্কহেড চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছে। এর ফলে খালের দুই তীরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে হাড়িদিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প।
স্থানীয়রা জানান, গত এক সপ্তাহে বাল্কহেডের ঢেউয়ে হাড়িদিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, কৃষিজমি ও খালের দুই পাড়ের অর্ধশত বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ শতাধিক পরিবার ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মসজিদ, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হুমকির মুখে রয়েছে। গত ১২ মে লৌহজং উপজেলা প্রশাসন বাল্কহেড চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তা মানা হচ্ছে না। চালকদের কাছ থেকে একটি চক্র চাঁদা নিয়ে বাল্কহেড চলাচলে সহায়তা করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে এ খালে বাল্কহেডের ধাক্কায় পিকনিকের ট্রলার ডুবে নারী ও শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। এর আগেও বাল্কহেডের ধাক্কায় খেয়া নৌকা ডুবে চার বছরে এ খালে প্রায় ৩০ জনের মতো নিহত হয়েছেন। এসব কারণে জেলা প্রশাসন এ খালে বাল্কহেড চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরে আরও দুই দফা উপজেলা প্রশাসন বাল্কহেড চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
বিগত সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রশাসন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করায় বাল্কহেড চলাচল বন্ধ ছিল। এ বছর প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ না থাকায় নিষেধাজ্ঞার দুই মাসের মাথায় চাঁদাবাজ চক্রটি ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আন্তঃজেলা নৌ-ডাকাত দলের সদস্য গাঁওদিয়া গ্রামের রুবেল মাদবর ও আল-আমিন মাদবর বাল্কহেড থেকে চাঁদাবাজি ও নদীর পাড়ে মাদকদ্রব্য বিক্রি করেন। এ ছাড়া শামুরবাড়ি গ্রামের রিপন ওস্তাকার, আনোয়ার ঢালী, ডহরী গ্রামের ফরিদা বেগম, লেকু ওস্তাকার, শাকিল ওস্তাকার, মারইল গ্রামের খোকন, বালিগাঁও বাজার এলাকার রাজন মুন্সীর সহায়তায় চাঁদার বিনিময়ে চলাচল করছে বাল্কহেড। তাদের নামে লৌহজং, টঙ্গীবাড়ি, মুন্সীগঞ্জ সদর, জাজিরা ও শরীয়তপুর থানায় ১৮-২০টি নৌ ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও হত্যা মামলা রয়েছে।
জানা যায়, গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাল্কহেড থেকে চাঁদাবাজির দায়ে রুবেল মাদবরকে দুই লাখ টাকা জরিমানা ও তিন মাসের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর রাহাত চাকলাদার ও দীপু ওস্তাকারকে ডহরী-তালতলা খালে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারের পর নদীতে ও এলাকার জনমনে স্বস্তি ফিরেছিল।
হাড়িদিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা খায়রুন নেছা বলেন, খালের পাড়ে বাল্কহেডের ঢেউয়ের আঘাতে আমার গোয়ালঘরের একটা অংশ ভেঙে গেছে। আরেকটু ভাঙলে আমাদের ঘরও নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। নুরপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বেপারী বলেন, এক সপ্তাহ আগে আমার একটি ঘর খালে বিলীন হয়ে গেছে, আরেকটা ঘর ভাঙনের মুখে রয়েছে। বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ করতে না পারলে বাপদাদার ভিটেমাটির বাকি অংশটুকুও হারাতে হবে। হাড়িদিয়া গ্রামের পাপ্পু শিকদার বলেন, কিছুদিন ধরে বাল্কহেড চলাচল রাতদিন পুরোদমে শুরু হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে আছি।
চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে রুবেল মাদবর বলেন, আমি একা নই, আরও অনেকে বাল্কহেড আনে। আমরা জোর করে টাকা নিই না, সুকানিরা খুশি হয়ে কিছু দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কিছুদিন ‘কাপঝাপ’ ছিল, এখন এলাকার এক ভাইয়ের মাধ্যমে প্রশাসনের সঙ্গে মিলমিশ হইছে। রুবেল মাদবর বলেন, আগে নদীতে কাজ করতাম, তখন মামলা হয়েছে। এখন কাজ ছেড়ে দিয়েছি। আরেক অভিযুক্ত রাজন মুন্সী বলেন, এটি সরকারি খাল, এখান দিয়ে বাল্কহেড চলবে, লঞ্চ চলবে– এটাই স্বাভাবিক। তিনি জানান, বালিগাঁও এলাকায় চারটি ড্রেজার চলছে, সুবচনী এলাকায় আছে তিনটি। এই ৭টি ড্রেজার থেকে বালু বাল্কহেডে নিয়মিত আনা-নেওয়া হচ্ছে।
অভিযুক্ত ফরিদা বেগম বলেন, আমার স্বামী প্রিন্স চাকলাদার এই ব্যবসা করতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর আমি ও আমার ছেলে দেখি। চাঁদাবাজি লোকজনে বলে, আমি কি চাঁদাবাজি করি? আমার আন্ডারে বাল্কহেড আসে, সুকানি ভাই খুশি হইয়া কিছু টাকা দেয়। রিপন ওস্তাকার বলেন, টাকা দিলেই সব মিটমাট হয়ে যায়।
এ বিষয়ে লৌহজংয়ের ইউএনও ফারজানা ববি মিতু বলেন, খালে বাল্কহেড চলাচল বন্ধে নৌ পুলিশকে অভিযানের জন্য বলা হয়েছে। মাওয়া নৌ পুলিশ স্টেশনের এসআই জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, খালে টহল ডিউটি চলমান রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করলে চাঁদাবাজি ও বাল্কহেড চলাচল থামবে না।
প্রশাসনের জরুরি সভা
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাল্কহেড চলাচল করায় গত সোমবার ইউএনও ফারজানা ববি মিতু তাঁর কার্যালয়ে জরুরি সভা ডাকেন। সভায় ডহরী-তালতলা খালের দুই তীরের ভাঙন ঠেকাতে বাল্কহেড চালক-মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া বাল্কহেড চলাচলের সুযোগ করে দেওয়ায় চাঁদাবাজদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল-জরিমানা করা হবে বলে জানানো হয়।
- বিষয় :
- প্রশাসন