লেখাপড়ার মান দেখতে বেরিয়ে এমপির চক্ষু চড়কগাছ
গত সোমবার আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে শেরপুরের নকলা পৌর এলাকার কায়দা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রেজিস্টার খাতা যাচাই-বাছাই করেন সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী সমকাল
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আকস্মিক লেখাপড়ার মান দেখতে বেরিয়েছিলেন সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরী। কিন্তু তিনি যা দেখলেন তাতে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে একজন, চতুর্থ শ্রেণিতে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী পেয়েছেন তিনি। অন্যান্য শ্রেণিতে ছিল মাত্র ১৬ জন। এ সময় উপস্থিত ২১ শিক্ষার্থীর বিপরীতে স্কুল ফিডিংয়ের ৪৪ জনের খাবার দেখে সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য (এমপি)। গত সোমবার পাঠদান চলাকালে শেরপুরের নকলা পৌর এলাকার কায়দা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন চিত্র ধরা পড়ে। এই ঘটনার একটি ভিডিও গতকাল মঙ্গলবার ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক খোরশেদুর রহমানের ভাষ্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে স্কুল ফিডিং বা মিড ডে মিল চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমানো, পুষ্টিহীনতা দূর করা, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং শিশুদের মনোযোগ বৃদ্ধি ও মেধা বিকাশে কাজ করছে সরকার। গত সোমবার বিকেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য হঠাৎ করেই দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে ওই বিদ্যালয়ে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে হতবাক হয়ে যান তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে একজন, চতুর্থতে চারজনসহ মাত্র ২১ জন শিক্ষার্থীকে উপস্থিত দেখতে পান। অথচ বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ৮১ জন। এ ছাড়া স্কুল ফিডিংয়ের খাবার নিয়েও অনিয়ম দেখা গেছে। ২১ ছাত্রের বিপরীতে ৪৪টি কলা ও রুটি পাওয়া গেলেও ডিমের খোঁজ মেলেনি। শিক্ষার্থী ২১ জন, খাবার ৪৪ জনের কেন? এমন প্রশ্নের জবাব আসে– ‘কালকে (মঙ্গলবার) খাওয়াবো’। আজকের (সোমবার) জিনিস কালকে খাওয়াবেন কেন? এর উত্তর দিতে পারেননি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
খোরশেদুর রহমান বলেন, বড় অনিয়ম ধরা পড়ে সংসদ সদস্যের সামনেই। তিনি শিক্ষার্থীর উপস্থিতির রেজিস্টার খাতায় দেখেন গত রোববার পঞ্চম শ্রেণির উপস্থিতি শূন্য। অথচ একজন উপস্থিত ছিল এমন কথা বলে তাঁর সামনেই এক শিক্ষার্থীকে উপস্থিত দেখান শিক্ষক। এ সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে সংসদ সদস্য বলতে বাধ্য হন, ‘চালাকি করেন কেন? আমার সামনেই আপনি সই করছেন। এই ঘটনায় সংসদ সদস্য মন খারাপ করে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানান। পরে শিক্ষা কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে বলেছেন।’
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাছমিনা বেগমের ভাষ্য, প্রধান শিক্ষক মোবারক হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত জুন মাসের ৭ তারিখ থেকে তাঁকে মৌখিকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখনও দায়িত্বের চিঠিও হাতে পাননি। হঠাৎ করে সংসদ সদস্য আসায় হতভম্ব হয়ে যান তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে ৬ জন শিক্ষার্থী। বিশ্বকাপ খেলা দেখার পরদিন একজন বিদ্যালয়ে এসেছে। কিন্তু উপস্থিত দেখানো ছিল না। ভুল করে সংসদ সদস্যের সামনে উপস্থিত দেখিয়ে অন্যায় করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। খাবার নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছরের ১৫ নভেম্বর শুরু হয় স্কুল ফিডিং কার্যক্রম। বিদ্যালয়ের ৮১ শিক্ষার্থীর নাম খাদ্য তালিকায় দেওয়া হয়। সেই হিসেবে খাবার আসে। সকালের শিফটে ৪০-৪৫ জন খাবার পায়। দুপুরের শিফটে সাধারণত ২৮-৩০ জন থাকে। গড়ে ৬০-৬৫ জন উপস্থিত থাকে। অতিরিক্ত দুধ-বিস্কুট সংরক্ষণ করে স্কুলে রেখে দেওয়া হয়। যেদিন বেশি ছাত্র হাজির হয় তাদের দেওয়া হয়। এ ছাড়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশে পাশের চরমধুয়া বিদ্যালয়ে খাবার সংকট আছে সেখানেও পাঠানো হয়।
নকলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, সংসদ সদস্য স্কুলে গিয়েছিলেন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে একজন শিক্ষার্থী পেয়েছেন এটা সত্য। মঙ্গলবার ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলার জন্য সোমবার উপস্থিতি কম ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ৫৬ জন উপস্থিত ছিল। উপজেলায় ১১৯টি বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই কার্যক্রমে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে বাড়ছে।
সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী বলেন, মঙ্গলবার ওই স্কুলে ৫৬ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। একদিন যাওয়াতেই ২১ জন থেকে বেড়ে ৫৬ জন হয়েছে। এভাবে নজরদারি রাখতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষায় নিশ্চিতভাবেই দৃশ্যমান উন্নতি হবে। নজরদারি বজায় রাখার চেষ্টা করবেন তিনি।
- বিষয় :
- পড়াশোনার মান