গোলেটেবিল আলোচনায় বক্তারা
স্মার্ট চট্টগ্রাম গড়তে চাই সমন্বিত পদক্ষেপ
আলোচনা সভায় বক্তারা- সমকাল
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১১:০৩
সরকার সব সময় জনকল্যাণে প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো প্রকল্পের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা গড়ে তুলতে পারে না। ফলে সঠিক সময়ে প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া থেকে নাগরিকরা বঞ্চিত হন। বিশেষ করে প্রকল্পের আগে সমীক্ষা না করা, প্রকল্পে জনমতের প্রতিফলন না থাকা, দুর্বল প্রকল্প গ্রহণ, বিভিন্ন সংস্থার ইচ্ছামতো প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে ঠিকাদারের অদক্ষতার কারণে মানুষ উন্নয়নের সুফল পান না। প্রকল্প বাস্তবায়নে এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে মিলবে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল। চট্টগ্রামকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই সমন্বিত পদক্ষেপ। চট্টগ্রামের উন্নয়ন হলে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে গোটা দেশ।
শনিবার নগরের আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বঙ্গবন্ধু কনফারেন্স হলে তৃতীয় চিটাগং আইটি ফেয়ার উপলক্ষে আয়োজিত 'স্মার্ট সিটি চট্টগ্রাম' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা বক্তব্য দেন আলোচকরা। তারা তাদের ক্ষোভের কথাও জানিয়েছেন। সমস্যা সমাধানে দিয়েছেন পরামর্শসহ নানা সুপারিশ। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলমের সভাপতিত্বে গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন এলজিইডিমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।
এলজিইডিমন্ত্রী বলেন, সিটিতে অনেক উপাদান রয়েছে। সব উপাদান স্মার্ট হলেই তবে সিটি স্মার্ট হবে। দেশে চট্টগ্রামের গুরুত্ব আজীবন থাকবে। নানা কারণে হয়তো গুরুত্ব কমতে পারে। তবে উপযুক্ততা ধরে রাখতে হবে। চট্টগ্রামের গুরুত্ব ধরে রাখতে এখন সবচেয়ে বেশি স্টাডি করতে হবে। সময়ের ব্যবধানে সুযোগ-সুবিধা বিভিন্ন জায়গায় সম্প্রসারিত হচ্ছে। নগরের দুটি সড়ক পোর্ট কানেকটিং ও অ্যাপেস রোড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চার বছরেও রাস্তা মেরামত ও নির্মাণকাজ আশানুরূপ হয়নি। এমন অগ্রগতি মেনে নেওয়ার মতো নয়।
তিনি আরও বলেন, জনমতের প্রতিফলনের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তবেই স্মার্ট সিটি গড়া অনেকটা সহজ হবে। চট্টগ্রাম নগরীর কয়েকটি সড়কের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতার দায় জনপ্রতিনিধিরা এড়াতে পারেন না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তদারকি তাদের জনস্বার্থেই করতে হবে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে তাদের সবসময় পাশে দাঁড়াতে হবে। একই সময়ে বিভিন্ন সংস্থার সড়ক কাটা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দাতা ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিভিন্ন প্রকল্পের টাইম ফ্রেমের কারণে একেক প্রতিষ্ঠান একেক সময় সড়ক কাটে। পুরো দেশ একটি মানবদেহের মতো। ওষুধ দিয়ে শুধু একটি হাত শক্তিশালী করা যায়? তাই নগরের সামগ্রিক উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনার বিকল্প নেই। মিলেমিশে কাজ করতে হবে, করাতে হবে। একে অপরকে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, এতবড় আয়োজন কিন্তু এখানে উপস্থিত মেয়র কিংবা সিডিএ চেয়ারম্যান নেই। নেই কোনো ওয়াসা, পিডিবি, গ্যাস অফিসের প্রতিনিধিও। মেয়র নেই কার সঙ্গে কথা বলব? কি পরামর্শ দেব?'
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, সমন্বয়ের যে সুযোগ আছে তাতে সংসদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অংশীজনের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমন্বয়কে আইনি কাঠামোয় আনলে সুফল পাওয়া যাবে। সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়নে লিখিত প্রস্তাব দেওয়া উচিত। এসময় তিনি গোলটেবিল আলোচনায় তুলে ধরা সকল প্রস্তাব, পরামর্শ ও সুপারিশ লিখিত আকারে দেওয়ার আহ্বান জানান। সংসদ সদস্য এমএ লতিফ বলেন, স্মার্ট সিটি ভাবার আগে নূ্যনতম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের অদূরশীতার কারণে চট্টগ্রাম এখন ছাগলনাইয়ায় পরিণত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সবার আগে জনগনের মতামত নিতে হবে। নগরের পোর্ট কানেকটিং এলাকার নাজুক অবস্থার কারণে এখানকার প্রতিটি মানুষের ফুসফুসে কমপক্ষে আধাকেজি ধুলাবালি আছে। দুঃখের বিষয় চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দুই সড়ক পোর্ট কানেকটিং ও এপেস রোড এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, চট্টগ্রাম শহরের মতো আহাম্মক শহর দেশের আর কোথাও নেই। স্মার্ট সিটি হচ্ছে সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট। এর তিনটি পিলার হচ্ছে- সবার জন্য, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা। কিন্তু এর কিছুই দেখছি না। একের পর এক ফ্লাইওবার নির্মাণ করে এই শহরকে হত্যা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গণপরিবহণ ধ্বংস করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেসব প্রকল্পে জনগনকে রাখা হয় না। জনসম্পৃক্ততা ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করে কি লাভ? জনগন জনদুর্ভোগের প্রকল্প চাই না। কেবল প্রকল্প নিলে হবে না; একসঙ্গে নগরের জনগনকেও স্মার্ট করতে উদ্যোগ নিতে হবে।
সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, স্মার্ট সিটি বলতে যে সিটি বসবাসযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য তাকেই বুঝি। সুস্থভাবে বসবাস করতে এবং সাবলীলভাবে ব্যবহার করতে পারি কিনা সেটিই মূল বিষয়। এই দুটি বিষয় যে সিটি নিশ্চিত করতে পারে সেটাই স্মার্ট সিটি। এখানে আমাদের শূণ্যতা রয়েছে। রাজধানী শহরটা আমরা প্রায় মেরে ফেলেছি। চট্টগ্রামও তার কাছাকাছি রয়েছে। চিন্তার মধ্যে জনআকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। যদি না পারি তাহলে কোন চিন্তাই জনবান্ধব হবে না। জানতে পেরেছি, এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে পাঁচটি 'পঞ্চবার্ষিক' মহাপ্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে কিন্তু কোনটা বাস্তবায়ন পর্যায়ে আসেনি। এই আলোচনায় সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এবং ওয়াসার প্রতিনিধি থাকার দরকার ছিল। সিদ্ধান্তগুলো সমন্বিত না হলে সুফল আসবে না।
