দারিদ্র্য জয় করে সুইট এখন বিচারক
বাবা-মায়ের সঙ্গে সহকারী জজ গোলাম রসুল সুইট-সমকাল
এম কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১২:১৯ | আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১২:৩৩
অভাবের সংসার তাদের। সংসার চালাতে বাবা রাজধানীতে গিয়ে একটি বাড়িতে নিরাপত্তারক্ষীর (সিকিউরিটি গার্ড) কাজ নেন। গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়েছে মাকেও। পরিবারের এই নিদারুণ অভাব-অনটন সত্ত্বেও লেখাপড়া চালিয়ে যায় ছেলেটা। তবে তাদের কষ্ট এখন দূর হতে চলেছে। দরিদ্র পরিবারের ছেলে গোলাম রসুল সুইট সম্প্রতি সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের কোমরপুর গ্রামের মোশারফ হোসেন ও মাহফুজা খাতুনের বড় ছেলে সুইট ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী। ১২তম জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ৬৭তম হয়েছেন তিনি। ১৯ জানুয়ারি এর গেজেট প্রকাশ করা হয়। মঙ্গলবার সহকারী জজ হিসেবে পিরোজপুরে যোগদান করবেন তিনি।
সমকালকে সুইট বলেন, 'আমার বড়লোক হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। সব সময় ন্যায়ের পথে থেকে মানুষের জন্য কাজ করে যাবো। কখনই অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়াব না। চাকরিজীবন শেষে অবৈধ উপার্জনের একটি টাকাও যেন আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে না থাকে। আমার কাছে সকল মানুষ ন্যায়বিচার পাবেন। অসহায় মানুষ কখনই ন্যায়বিচার বঞ্চিত হবেন না।'
সুইটের এই সাফল্যে স্বভাবতই খুশি তার পরিবার, বন্ধুমহল ও স্থানীয়রা। তবে এখানে পৌঁছাতে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ বন্ধুর পথ। সুইট নিজেই জানালেন সেই কাহিনি।
তিনি বলেন, দেবহাটার শাখরা কোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভোমরা ইউনিয়ন দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেছেন তিনি। এরপর স্থানীয় সখিপুর খানবাহাদুর আহসানউল্লাহ্ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরিবারে তখন খুব অভাব। বাবাও ছিলেন উদাসীন। কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন চলত তাদের। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এইচএসসিতে ভালো ফল করলেও ঢাকায় গিয়ে কোচিং করার মতো আর্থিক সঙ্গতি তাদের ছিল না। মায়ের একটি গরু ছিল। সেই গরুটি ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে ২০১০ সালের মে মাসে ঢাকায় যান। একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন। কিছুদিন পরে সেই টাকাও ফুরিয়ে যায়। বাড়ি থেকে টাকা দেওয়ার সঙ্গতিও ছিল না। একদিন কোচিং পরিচালকের কাছে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। এরপর তিনি তাকে সেখানে বিনামূল্যে কোচিং ও থাকার ব্যবস্থা করেন। সুইট জানান, সহপাঠীরা তার পারিবারিক অবস্থা জানার পর বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকে। তাদের অবদান ভুলে যাওয়ার নয়। মা-বাবা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মাঝে মধ্যে সামান্য টাকা দিতেন।
সুইট বলেন, '২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিই। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ হয়। বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হই। ভর্তির পর টিউশনির জন্য নিজে হাতে পোস্টার ছাপিয়ে অভিভাবকদের কাছে বিতরণ করি। এভাবে পাঁচটি টিউশনি জোগাড় হয়ে যায়। এভাবেই চলেছে আমার শিক্ষাজীবন।'
তিনি বলেন, 'আত্মীয়স্বজন কখনও খোঁজ নেয়নি। তবে বন্ধুরা আমার পাশে থেকেছে সব সময়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ফলাফলে বি ইউনিটে মেধা তালিকায় হয়েছি ১১তম। ১২তম জুডিশিয়াল সার্ভিসে হয়েছি ৬৭তম। এ পরীক্ষায় ১০০ জন উত্তীর্ণ হয়।' দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, টাকা-পয়সা লেখাপড়ার পথে কোন বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি থাকলে পথ বেরিয়ে আসবেই।
চাকরি হওয়ার পর এক মাস আগে বাবা-মাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছেন সুইট। তার বাবা মোশারফ হোসেন জানান, রাজধানীর উত্তরায় ৮ বছর সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করেছেন তিনি। স্বামী-স্ত্রী দুইজনই ঢাকায় থাকতেন। স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজও করেছেন। ছেলে চাকরি পেয়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। এখন এলাকায় দোকান দিয়ে ব্যবসা করার চিন্তা করছেন তিনি।
অনুভূতি জানাতে গিয়ে কেঁদে ওঠেন সুইটের মা মাহফুজা খাতুন। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, 'ছেলের লেখাপড়ার জন্য আমরা যেটুকু পেরেছি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি আর দোয়া করেছি। আল্লাহ্ আমাদের ডাক শুনেছেন। দোয়া কবুল করেছেন। আমি অনেক খুশি। সবার কাছে সুইটের জন্য দোয়া চাই।'
সুইটের বাল্যবন্ধু জাবিরুল ইসলাম বলেন, 'ছোটবেলা থেকেই শান্ত ও মেধাবী ছিল
রসুল। আমরা একসঙ্গেই লেখাপড়া করতাম। ও কখনও কারও সঙ্গে জোর গলায় কথা বলেছে
বলে আমাদের জানা নেই।' পারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুল আলিম বলেন,
খুব অভাবী পরিবার। জমিজমা কিছুই নেই। মা-বাবা খুব কষ্ট করে ছেলেটাকে
লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ছেলেটাও খুব ভালো। সে জজের চাকরি পাওয়ায় এলাকার সবাই
খুশি।
- বিষয় :
- দারিদ্র্য জয়
- সুইট
- বিচারক
