কারাফটকে আটকে 'ক্রসফায়ারে'র হুমকি
ছবি: ফাইল
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৩ | আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:১১
একটি মামলায় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হয়েছিলেন নুর আলম নুরু নামে এক ব্যক্তি। এ সময় সাদা পোশাকে থাকা অস্ত্রধারী কয়েক ব্যক্তি তার দিকে এগোতে শুরু করলে ভয় পেয়ে তিনি দৌড় দেন। পিছু নেয় অস্ত্রধারীরাও। কারা পুলিশ ব্যারাকের রান্নাঘর থেকে নুরুকে আটক করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায় তারা। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের প্রধান ফটক ও আশপাশের এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এরপর ৫ জানুয়ারি পুলিশ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা তার শাশুড়ির কাছে ফোন করে এক লাখ টাকা ঘুষ চায়। নইলে নুরুকে 'ক্রসফায়ারে' মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। দাবিকৃত পুরো টাকা না দিতে পারায় সেদিনই তাকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। এমন অভিযোগে সোমবার লক্ষ্মীপুরের আদালতে শহর পুলিশ ফাঁড়ির চার সদস্যসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে সিআর মামলা (নম্বর-১০৯/২০২০) হয়েছে।
ভুক্তভোগীর স্বজনের দাবি, কারাফটকের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও সংশ্নিষ্ট মোবাইল ফোন নম্বরগুলোর কল রেকর্ড পর্যালোচনা করলেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে। লক্ষ্মীপুর সদরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে কারাফটক থেকে আটক করে ইয়াবা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল লক্ষ্মীপুর সদর থানার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে।
লক্ষ্মীপুর সদর থানার ওসি এ কে এম আজিজুর রহমান সমকালকে বলেন, 'একটি অভিযোগ দায়েরের কথা শুনেছি। বিস্তারিত জানা নেই। তবে নুর আলম নুরুকে শহর পুলিশ ফাঁড়ি গ্রেপ্তার করেছিল। ওই ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মিনহাজ প্রশিক্ষণে থাকায় তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে।'
লক্ষ্মীপুর শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই মুহাম্মদ কাওসারুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'নুরুকে শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতির মামলা রয়েছে। মিথ্যা অভিযোগ করে সে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। একটি পক্ষ আমার সুনাম ক্ষণ্ণ করতে ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করেছে।'
এসআই মুহাম্মদ কাওসারুজ্জামান ছাড়া অভিযুক্ত অপর পুলিশ সদস্যরা হলেন একই ফাঁড়ির এএসআই মঞ্জুরুল ইসলাম, মহিউদ্দিন খন্দকার ও কনস্টেবল কবির হোসেন। এ ছাড়া চা দোকানি আবুল হোসেনসহ অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
চার পুলিশের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী নুরুর মা নুরজাহান বেগম তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, একটি ফৌজদারি মামলায় জামিন পাওয়ার পর ৩০ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে লক্ষ্মীপুর কারাগার থেকে বের হন দিনমজুর নুর আলম নুরু। তখনই ধাওয়া করে তাকে ধরে হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। অজ্ঞাত স্থানে তাকে আটকে রেখে পুলিশ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা ০১৭৪৯৬১৬৯৭৪ ও ০১৮৭৪৫৩৫৫৫১ নম্বর থেকে নুরুর শাশুড়ির কাছে টাকা চায়। নইলে তাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে অথবা হত্যা, অস্ত্র বা মাদকের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। দাবিকৃত টাকা লক্ষ্মীপুরের দক্ষিণ তেমুহনীর আবুলের চায়ের দোকানে দিতে হবে বলেও জানায় তারা। ওই দোকানে যোগাযোগের জন্য ০১৮২১৭৬৩১৪৪ নম্বর দেয় এবং বিষয়টি কাউকে না জানানোর কথা বলে। অনেক কষ্টে নুরুর স্বজনরা ১৯ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করে রিকশাচালক আমির হোসেনের মাধ্যমে আবুল হোসেনকে দেয়। এরপর পুলিশ পরিচয়দানকারীরা বাকি টাকার জন্য তাগাদা দেয়। পুরো টাকা দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত নুরুকে ২৫ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে ২১ জানুয়ারি নুরুর পক্ষে আদালতে একটি দরখাস্ত দিয়ে ঘটনার উল্লেখ করে তা তদন্তের আবেদন করা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এসআই কাওসারুজ্জামান আদালতের হাজতখানায় থাকার সময় নুরুকে হুমকি দেন। এ বিষয়ে আদালতের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও সাক্ষী রয়েছে বলে দাবি করেন বাদী।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল আহাদ শাকিল পাটোয়ারী বলেন, গত কয়েক মাসে জামিনে মুক্ত হওয়া ব্যক্তিকে কারাফটক থেকে ধরে মাদকের মামলায় ফাঁসানোর একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্তত দুটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। অপরাধ সম্পৃক্ততার প্রমাণ থাকলে কাউকে গ্রেপ্তার করা যেতেই পারে। তবে কারাগার থেকে বের হওয়ার পরপরই ধরে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো দুঃখজনক। এ কারণে কারাফটকের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
এর আগে কারাফটক থেকে গ্রেপ্তার আলমগীরের স্ত্রী সাজু বেগমের ভাষ্য, গত ১৪ জুলাই লক্ষ্মীপুর থানার এসআই মোর্শেদ তার স্বামীকে থানায় ডেকে নেন। সেখান থেকে রায়পুর থানার এসআই আরেফিন তাকে নিয়ে যান। এরপর ১৬ জুলাই ডাকাতি মামলার সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। ওই মামলায় জামিন পেয়ে ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার থেকে বের হন আলমগীর। এ সময় কারাফটক থেকেই তাকে আটক করে সাদা পোশাকের পুলিশ। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেরবেকিস্থ কেজিএন অটোমেটিক রাইস মিলের সামনে তাকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। তখন তার কাছে ১০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এ মামলায় ২৪ নভেম্বর তার জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। ২ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় তিনি কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় আবারও তাকে আটক করে পুলিশ। তবে কাগজপত্রে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় ৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে। তিন মাসের মধ্যে দু'বার জামিন পাওয়ার পরপরই কারাফটক থেকে গ্রেপ্তারের পর এ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন সংশ্নিষ্টরা। গ্রেপ্তার ব্যক্তির স্বজন ও আইনজীবী বলছেন, প্রতিবারই কি তিনি কারাগার থেকে ইয়াবার চালান নিয়ে বের হচ্ছেন?
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সদর থানার ওসি এ কে এম আজিজুর রহমান বলেন, আলমগীর চিহ্নিত ডাকাত ও মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা আছে। তবে কারাফটক থেকে আটকের তথ্য সঠিক নয়।
পুলিশের সংশ্নিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, শীত মৌসুমে ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যায়। নুরু ও আলমগীর দু'জনই ডাকাতি মামলার আসামি। এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে চিহ্নিত ডাকাতদের বিরুদ্ধে কৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- মামলা
- জামিন
- কারাগার
- ক্রসফায়ার
- লক্ষ্মীপুর
