ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চিংড়ির রেণু আহরণে ধ্বংস হচ্ছে অন্য প্রজাতির মাছ

চিংড়ির রেণু আহরণে ধ্বংস হচ্ছে অন্য প্রজাতির মাছ
×

ছবি: ফাইল

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ জুন ২০২২ | ১৪:৪৪

রাত নামলেই নদীর তীরে অসংখ্য টর্চলাইটের আলো দেখা যায়। কোমরপানিতে নেমে মাছ ধরার ভঙিমায় খুচ জাল ডুবিয়ে তীরের দিকে টানা হচ্ছে। এই দলে আছে শিশুসহ অসংখ্য নারী-পুরুষ। এভাবে তারা প্রতিদিন লাখ লাখ চিংড়ির রেণু ধরছে। শুধু রাতে নয়, দিনেও অবৈধ এই কাজ চলে। তবে চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা অন্য শতাধিক প্রজাতির মাছের রেণু ধ্বংস করছে। বরিশাল ও ভোলার মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর, পটুয়াখালী ও বরগুনার বিষখালী, আগুনমুখাসহ দক্ষিণের সবগুলো বড় নদনদীতে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় দুই বছর জেল-জরিমানার বিধান রেখে চিংড়ির রেণু আহরণ এবং কেনাবেচা নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। তবে সেটি কাগুজে আইনে পরিণত হয়েছে। খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা এলাকার ঘের মালিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় দক্ষিণের উপকূলে চিংড়ির রেণু কেনাবেচায় গড়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের ছত্রছায়ায় নদীতীরের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ চিংড়ির রেণু আহরণকে মৌসুমি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ড. বিমল চন্দ্র দাস সমকালকে বলেন, একটি চিংড়ির রেণু আহরণের বিপরীতে অন্য প্রজাতির মাছের অন্তত ২ হাজার রেণু ধ্বংস করা হচ্ছে। রেণু আহরণকারীরা কেউ পেশাদার জেলে নন। চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত উপকূলের অতিদরিদ্রদের একটি অংশ এটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের মিঠাপানিতে ২৪৭ প্রজাতির মাছ রয়েছে। চিংড়ির রেণু আহরণে শতাধিক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে পাচারের সময় এক কোটিরও বেশি রেণু জব্দ করে নদীতে অবমুক্ত করা হয়।

মাত্র ৫০ টাকার মশারি জাল দিয়ে চিংড়ির রেণু ধরার নামে মৎস্যসম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ইকবাল মাতব্বর। তিনি বলেন, রেণু আহরণে একটি মাফিয়া চক্র গড়ে উঠেছে। দক্ষিণের নদনদী থেকে আহরিত রেণু পাচার হয় খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট এলাকায়। সেখানকার ঘের মালিকরা দালাল চক্রের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় অর্থ বিনিয়োগ করেন। দালালরা আহরণকারীদের কাছ থেকে প্রতিটি রেণু দেড় টাকায় কেনেন। এরপর তারা স্থানীয় আড়তদারদের কাছে তা আড়াই টাকায় বিক্রি করেন। আড়তদাররা সড়কপথে খুলনা অঞ্চলের ঘের মালিকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে প্রতিটি রেণুর জন্য পান ৫ টাকা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের অধ্যাপক ও মৎস্য বিজ্ঞানী ড. ইয়ামিন বলেন, জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে চিংড়ি মাছ ডিম ছাড়ে। মার্চের দিকে ডিম থেকে লার্ভার জন্ম হয়। তাই প্রতি বছর লার্ভা আহরণ করে উপকূলের অতিদরিদ্র শ্রেণির কিছু মানুষ। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি। তিনি আরও বলেন, চিংড়ির একটি লার্ভা আহরণ করতে গিয়ে অন্য প্রজাতির শত শত লার্ভা ধ্বংস করা হচ্ছে। আইন করে দরিদ্রদের লার্ভা সংগ্রহে বিরত রাখা যাবে না। বরং তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত- কীভাবে শুধু চিংড়ির লার্ভা সংগ্রহ করা যায়।

উপকূলের জেলে ও জেলে প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মশারি জাল ও বাঁশ দিয়ে দিয়ে তৈরি খুচ চর ও নদীর তীর ঘেঁষে টানা হয়। এতে তীরে থাকা সব ধরনের রেণু খুচ জালের মধ্যে আটকা পড়ে। আহরণকারীরা তীরে উঠে শুধু চিংড়ির রেণু রেখে অন্য রেণু তীরেই ফেলে দেয়। এভাবেই ধ্বংস করা হচ্ছে অন্যান্য মাছের রেণু।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা জাতীয় ক্ষুদ্র জেলে সমিতির সভাপতি ধলা মাঝি জানান, চিংড়ির রেণু পাচারে গলাচিপা-রাঙ্গাবালী উপজেলার ১২ ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের বিপরীতে বেড়িবাঁধের বাইরে ঘাঁটি স্থাপন করেছে এ চক্রটি। রাঙ্গাবালী উপজেলার বড়বাইশদা, ছোটবাইশদা, রাঙ্গাবালী সদর, চরমোন্তাজ, চাইলতাবুনিয়া এবং গলাচিপার চরকাজল, চরবিশ্বাসসহ এলাকার নদীর চর থেকে আহরণ করা চিংড়ির রেণু সিন্ডিকেটের ঘাঁটিতে এনে জড়ো করা হয়। সেখান থেকে ট্রাকে নিয়ে যাওয়া হয় খুলনা অঞ্চলে।

ধলা মাঝি জানান, চিংড়ির ঘের মালিকদের প্রতিনিধি খুলনার টুলু সার্বক্ষণিক গলাচিপায় অবস্থান করে পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। ট্রাকে পাচার নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পেছনে বড় অঙ্কের ব্যয় করা হয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশালের বিভাগীয় উপপরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

আরও পড়ুন

×