কুষ্টিয়ার শামীমও কম যান না
সাজ্জাদ রানা, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:০৩ | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:৪২
কুষ্টিয়ার ঠিকাদারি ব্যবসার জগতে রয়েছে একক আধিপত্য এসএম শামীমের। বিশেষ করে গণপূর্তের প্রায় সব কাজই তার নিয়ন্ত্রণে। সরাসরি কোনো দলের রাজনীতি না করলেও বিএনপি ঘরানার মানুষ হিসেবে পরিচিত। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, নিজের আধিপত্য ধরে রেখে সমানে কাজ করে চলেছেন। বড় কোনো টেন্ডার হলেই তা যে কোনো মূল্য পেতে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। নানাভাবে 'ম্যানেজ' করে জেলার প্রায় সব বড় কাজই তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এককভাবে পেয়ে থাকে। ঢাকায় গণপূর্তের ঠিকাদার জি কে শামীমের সঙ্গে নামে-কাজে মিল থাকায় তাকে নিয়ে রয়েছে বিস্তর আলোচনা। অনুসন্ধানে মিলেছে, শুধু কুষ্টিয়াতেই নয়, আশপাশের জেলারও গণপূর্তের অধিকাংশ কাজ করেন এসএম শামীম।
গণপূর্তের কুষ্টিয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কুষ্টিয়া গণপূর্ত থেকে যেসব কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তার অধিকাংশই এসএম শামীমের কব্জায় রয়েছে। তিনি তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শামীম এন্টারপ্রাইজের নামে কাজগুলো করেন। যদি কোনো কাজ না পান, সে কাজও চাপ দিয়ে অন্য ঠিকাদারদের কাছ থেকে কিনে নেন। কাজের মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুরে ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণের পর হস্তান্তরের আগেই তাতে ফাটল দেখা দিয়েছে। যথাযথভাবে কাজ না করেই সংস্কার কাজের বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগও আছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া পাসপোর্ট অফিসসহ অনেকগুলো ভবনের কাজের মান দিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গণপূর্তের একটি সূত্র জানায়, ১৯৮৬ সালের পর এরশাদ সরকারের সময় গণপূর্তে ঠিকাদারি লাইসেন্স করেন এসএম শামীম। তবে ওই সময় অর্থের অভাবে তিনি তেমন কোনো কাজ করতে পারেননি। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের পরও শামীম হাতেগোনা কয়েকটি সংস্কার কাজ করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কুষ্টিয়া গণপূর্তে তার আধিপত্য বাড়তে থাকে। দিন দিন তার কাজের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করে। ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত ঠিকাদার হিসেবে শামীমের তেমন কোনো পরিচিতি ছিল না। ২০১২ সালের দিকে কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন শাহিন মিয়া। তার সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠার পরই মূলত শামীমের উত্থান শুরু হয়। ওই সময় কুষ্টিয়ায় পাসপোর্ট অফিস নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। দেড় কোটি টাকার কাজ হলেও কয়েকবার অর্থ বাড়িয়ে তিন কোটি টাকারও বেশি করা হয়। শাহিন মিয়ার সঙ্গে আঁতাত করে মোটা অঙ্কের কমিশনের মাধ্যমে কাজটি হাতিয়ে নেন শামীম। পরে শাহিন মিয়া কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের শতকোটি টাকার প্রকল্পেও শামীমকে বেশ কয়েকটি কাজ দেন। এ ছাড়া ছোট-বড় মিলিয়ে অনেক কাজ পান শামীম। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অর্থ, সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি, খ্যাতি সব হয়েছে তার।
কুষ্টিয়া গণপূর্তের একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এসএম শামীম কুষ্টিয়া গণপূর্তের অন্যতম প্রধান ঠিকাদার। এখানে তার ইশারায় সবকিছু হয়। বিএনপিপন্থি এ ঠিকাদারের প্রভাব বর্তমানে বিন্দুমাত্র কমেনি। সবাইকে ম্যানেজ করেই তিনি কাজ বাগিয়ে নেন। লটারির মাধ্যমে কাজ দেওয়া হলেও অনেক সময় অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী ও অফিস সহকারীদের সুবিধা দিয়ে শামীম জেনে নেন কাজের রেট কোড। আর এখানেই তিনি বাজিমাত করেন। পিয়নদের পর্যন্ত তিনি নিয়মিত মাসোহারা দেন। বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় কুষ্টিয়া গণপূর্তের অনেকেই চান শামীমই কাজ পাক।
গণপূর্তের কয়েক কর্মকর্তা জানান, এসএম শামীম ১০ বছর ধরে একক আধিপত্য ধরে রেখেছেন। বড় বড় কাজ তার প্রতিষ্ঠান পেয়ে আসছে। অন্য ঠিকাদার কোনো কাজ পেলে তিনি তা কিনে নেন। দেশের বাইরে থাকা এক শীর্ষ চরমপন্থি নেতার সঙ্গেও তার সখ্য রয়েছে।
গর্ণপূর্তের আওয়ামী লীগপন্থি এক সিবিএ নেতা জানান, শামীম ও তার পরিবারের সদস্যরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শামীম সরাসরি রাজনীতি না করলেও ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকে ম্যানেজ করে চলেন, যাতে কাজ পেতে কোনো ঝামেলা না হয়। তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশের জন্য অর্থ খরচ করেন। তবে নিজে থাকেন আড়ালে।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর শামীম কুষ্টিয়া নির্বাচন অফিস ও জেলা পাসপোর্ট অফিস নির্মাণের কাজ পান। প্রথমে দেড় কোটি টাকার মতো কাজ ছিল। পরে নানা কারণ দেখিয়ে ব্যয় বাড়িয়ে তিন কোটি টাকারও বেশি করা হয়। এ থেকে বড় অঙ্কের কমিশন পান তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শাহিন মিয়া। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের হোস্টেল, নার্স ডরমেটরি, টিচার ডরমেটরি নির্মাণ, বাউন্ডারি ছাড়াও অভ্যন্তরীণ সব সড়ক নির্মাণের কাজ করেন শামীম। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের অফিস, সরকারি পাবলিক লাইব্রেরি, মডেল মসজিদ, শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ীতে ভারতীয় অর্থে নির্মিত গেস্ট হাউস, একাধিক ভূমি অফিস, সাব-স্টেশন নির্মাণসহ তিনি অনেক বড় বড় কাজ করেন। সম্প্রতি দরপত্র হওয়ায় কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসের বহুতল ভবন নির্মাণের কাজটিও শামীম পেয়েছেন। শুধু গণপূর্তেই নয়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বেশ কয়েকটি কাজও তিনি করেছেন। বর্তমানে কুষ্টিয়াসহ মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় তার শত শত কোটি টাকার কাজ চলমান আছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসএম শামীম ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুরে ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ করেন। এ কাজের জন্য ৬১ লাখ টাকারও বেশি বরাদ্দ ছিল। শামীম তার বন্ধু আকমল হোসেনকে দিয়ে কাজটি করেন। এখনও ভবনটি হস্তান্তর হয়নি। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ওই ভবনে ফাটল দেখা দেয়। দরজা-জানালার বেশিরভাগ ইতোমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। সোলার সিস্টেমও অকেজো। দুর্গম চর হওয়ায় শামীম নামমাত্র কাজ করে বিল তুলে নিয়েছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
গণপূর্তের এক সহকারী প্রকৌশলী জানান, সব ধরনের সুবিধা দিয়ে শামীম কাজ বাগিয়ে নেন। তবে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম যোগ দেওয়ার পর তিনি কিছুটা বিপাকে রয়েছেন। কারণ তিনি কাউকে অতিরিক্ত সুবিধা দেন না।
জানা যায়, এসএম শামীমের বাড়ি শহরতলির টাকিমারায়। তার বাবার নাম শামসুজ্জোহা। তিনি রেলওয়ের কর্মচারী ছিলেন। রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে তিনি কিছু সম্পদ করে যান। এলাকার মানুষের মধ্যে তিনি ভালো লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, বেসিক ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখাসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকে বর্তমানে শামীমের নামে-বেনামে অর্থ রয়েছে। এক সময় মোটরসাইকেলে তিনি চলাচল করতেন। এখন কোটি টাকার গাড়িতে চড়েন। হাউজিংয়ে আলিশান বাড়ি ছাড়াও আছে তার বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট। টাকিমারায় রয়েছে আরেকটি বাড়ি।
এসএম শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, নিয়মনীতি মেনেই সব কাজ করি। বৈধভাবে লটারির মাধ্যমে কাজগুলো পাই। দৌলতপুরে ভূমি অফিস নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে বলেন, তিন বছর আগে কাজ শেষ হয়েছে। ভবনটি বুঝিয়েও দিয়েছি। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথমে বলেন, কোনো কাজ করছি না। পরে বলেন, সব কাজ শেষ, বুঝিয়ে দিয়েছি। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, যখন-তখন রিং দেবেন না। এরপর এসএম শামীম আর কথা বলতে রাজি হননি।
কুষ্টিয়া গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, আমি সদ্য এসেছি। অতীতে কী হয়েছে তা বলতে পারব না। এসএম শামীম বড় ঠিকাদার। তবে আমি ১০ টাকার কাজ যে করে তাকেও যে চোখে দেখি, ১০ কোটি টাকার কাজ যে করে তাকেও সেই চোখে দেখি। বর্তমানে অবৈধ সুযোগ কেউ পেয়েছে- এমনটি কেউ বলতে পারবে না। মানুষ এখন অনেক সচেতন। তাই ইচ্ছা করলেই কেউ খারাপ কিছু করতে পারবে না।
- বিষয় :
- কুষ্টিয়া
- ঠিকাদার
- ব্যবসা
- এসএম শামীম
- ঠিকাদারি ব্যবসা
