ধলাই নদীতে বালুমহাল
পুলিশের রমরমা চাঁদাবাজি
ছবি: ফাইল
মুকিত রহমানী, সিলেট
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২২ | ১৪:৪৬
প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম ভান্ডার সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ। দেশের প্রধান পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জসহ উৎমা ও শাহ আরেফিন কোয়ারির অবস্থান এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে ভোলাগঞ্জ, উৎমা ও আরেফিন টিলা পাথর কোয়ারি বন্ধ আছে। বেকার অনেক শ্রমিকের এখন ভরসা একমাত্র ইজারাকৃত ধলাই নদীর দক্ষিণ বালুমহাল। বালুর জন্য প্রতিদিন এখানে নোঙর ফেলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ১৫০ থেকে ২০০টি বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌকা, বলগেট ও স্টিলবডি নৌকা। তবে এই মহালে ব্যবসার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে পুলিশের চাঁদাবাজি। সুযোগ নেন অসাধু ব্যবসায়ীরাও উত্তোলনে অবলম্বন করেন অবৈধ পন্থা।
জানা গেছে, ইজারাদারের নির্দিষ্ট রয়্যালিটির পাশাপাশি ঘনফুটপ্রতি ১ টাকা হারে পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদার আওতামুক্ত নয় বালুবাহী নৌকাও। প্রকাশ্যে কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশের নাম করে এ চাঁদা আদায় করছে একদল লোক। সাদা পোশাকে তাদের নেতৃত্ব দেন থানার এএসআই মোফাজ্জল। টাকা পেলে নীরব দর্শক হয়ে যায় পুলিশ, না পেলে দেয় হানা। তাদের হয়রানি ও অভিযানের কবল থেকে বাঁচতে নিয়মিত কমিশন দিয়ে দেদার অবৈধ কারবার চালাচ্ছেন বালু ব্যবসায়ীরাও। ইজারাবহির্ভূত জায়গা থেকে বালু তোলায় বাড়ছে বসতভিটা ও ফসলি জমিতে ধসসহ নানা দুর্ঘটনার শঙ্কা।
অভিযোগ আছে, ধলাই নদী থেকে চিপ পাথর উত্তোলন করা কিছু নৌকা থেকেও ১ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন পুলিশের নামে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হয় এই মহালে। থানা পুলিশকে সন্তুষ্ট করে সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরাও। তাঁরা নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে গিয়েও বালু ও পাথর তুলছেন। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় সম্প্রতি মহাল সংলগ্ন ঢালারপাড়ের বাসিন্দা সফর আলী বিভাগীয় কমিশনারসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন থেকে ইজরাবহির্ভূত জায়াগা ও নিষিদ্ধ স্থান থেকে বালু-পাথর উত্তোলন না করতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
১৪২৯ বাংলা সালের জন্য ২০ ভাগ জামানত বাদে ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় ধলাই নদী দক্ষিণ বালুমহালটি ইজারা নেন জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মজির উদ্দিন। কালাসাদেক ও তৈমুরনগর মৌজায় অবস্থিত ইজারার এসব ভূমি ছাড়াও শতাধিক একর জায়গা থেকে বালু উত্তোলন চলছে। ইজারা না হলেও স্থানীয় কিছু লোক জমির মালিকানা দাবি করে নিজেরা বালু-পাথর উত্তোলন করছেন, আবার কেউ বিক্রিও করছেন। এ বিষয়ে ইজারাদার মজির উদ্দিন সমকালকে বলেন, নির্দিষ্ট জায়গায় লোক বসিয়ে ঘনফুটপ্রতি বালু ২ টাকা ৫০ পয়সা হারে রয়্যালিটি আদায় করা হচ্ছে। ইজারার জায়গার বাইরে কেউ বালু বিক্রি বা উত্তোলন করলে সেটা দেখবে প্রশাসন। পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কিছু জানা নেই।
মহালের পার্শ্ববর্তী মহল্লায় পল্লি চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর বাড়ি। তিনি বলেন, প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ইজারার জায়গার বাইরে থেকেও দেদার বালু তোলা হচ্ছে। এতে ইজারাদারের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কারণ, তিনি তো সব নৌকা বা বালুবাহী যান থেকে রয়্যালিটি পেয়ে যান। তাঁর টাকা উঠে যাচ্ছে। তবে ক্ষতি হচ্ছে স্থানীয়দের; ফসলি জমি ও বসতভিটায় ধস দেখা দেওয়ার আশঙ্কা আছে।
বালু সংগ্রহকারী নৌকার মাঝি হোসেন আলী অভিযোগ করেন, ইজারাদারের রয়্যালিটির পর পুলিশকেও টাকা দিতে হয়। বালু উত্তোলনে শ্রমিক খরচও দিতে হয়। ১৫ হাজার বর্গফুটের নৌকার জন্য চাঁদা দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা। পুলিশকে টাকা না দিলে হয়রানি করা হয়, মামলার ভয় দেখানো হয়।
এতে খরচ পড়ে যায় প্রচুর, লাভ বেশি টেকে না। একইভাবে চিপ পাথর উত্তোলন করা ধলাই নদীর শ্রমিক বাবুল বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নৌকা নদীতে চিপ পাথর তোলে। সেখানে নৌকার আকার অনুপাতে ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পুলিশের নামে আদায় করা হচ্ছে। শ্রমিক ও স্থানীয়রা জানান, পুলিশের লাইনম্যান হিসেবে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাহাব উদ্দিন ও তাঁর ভাগনে রাসেল আহমদ, সহযোগী মিসবাহ, নাজিমসহ বেশ কয়েকজন পুলিশের চাঁদার টাকা আদায় করেন। অভিযোগের বিষয়ে রাসেল বলেন, তিনি কোনো চাঁদা আদায় করেন না। নদী থেকে বালু উত্তোলন করে তিনি ছাতকে বিক্রি করেন।
ইউএনও লুসিকান্ত হাজং বলেন, মাঝেমধ্যে কিছু লোক অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করেন। খবর পেলে অভিযান চালানো হয়। কিছু লোকের ধারণা, নদীতে তাঁদের জায়গা বিলীন হয়ে গেলে সেই জায়গায় তাঁদের অধিকার বিদ্যমান থাকে। বাস্তবে নদীতে যাওয়া এসব জায়গা সরকারের হয়ে যায়। তবে পুলিশের নামে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে কিছু জানা নেই, কেউ অভিযোগও করেনি।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি সুকান্ত চক্রবর্তী বলেন, বালুমহালে পুলিশের পক্ষ থেকে কেউ টাকা তোলে না। এ বিষয়ে কেউ অভিযোগও করেনি। পুলিশের নামে কেউ চাঁদা আদায় করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এএসআই মোফাজ্জলের নেতৃত্বে চাঁদা তোলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, মহাল এলাকায় এই থানার পক্ষ থেকে টহল দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে পুলিশের অন্য সদস্য ও কর্মকর্তার মতো মোফাজ্জলও সেখানে যান।
- বিষয় :
- ধলাই নদী
- বালুমহাল
- রমরমা চাঁদাবাজি
