ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক বনভূমি দিবস

দেড় যুগে উজাড় ৮ ভাগ বনভূমি

দেড় যুগে উজাড় ৮ ভাগ বনভূমি
×

সুন্দরবনের আগা মরা সুন্দরীগাছের সারি ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে - সমকাল

জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২০ | ১৩:৫৪

দেশে গত ১৮ বছরে উজাড় হয়ে গেছে প্রায় তিন লাখ ৭৮ হাজার একর বনভূমি, যা মোট বনভূমির প্রায় ৮ ভাগ। ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বনভূমি উজাড়ের এই তথ্য এসেছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ বনভূমি উজাড় হয়েছে শেষ পাঁচ বছরে। ফলে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
তবে এসডিজি অর্জনে সরকারের নানা প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার কথা বলছেন বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, সরকারের বিভিন্ন বনায়ন কর্মসূচির পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে এসডিজি অর্জন সম্ভব হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকির বিরুদ্ধে বনায়ন কর্মসূচি ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
এ পরিস্থিতিতে আজ শনিবার দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- 'বন বনানী জানি, জানাই; ভালোবেসে বনকে বাঁচাই'। এ উপলক্ষে সকালে আগারগাঁও বনভবনের সামনে র‌্যালি বের হবে। পরে বনভবনের হৈমন্তী সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
দেশে বনভূমি উজাড়ের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের প্রতিবেদনে। গত বছর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিংশ শতাব্দীতে এসে দেশে বনভূমি ক্রমশই কমেছে। এর মধ্যে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয়েছে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালে। এই পাঁচ বছরে দেশে উজাড় হয় দুই লাখ ৩১ হাজার ৪৩ একর বনভূমি। এর মধ্যে ২০১৭ সালে এক বছরেই উজাড় হয় ৭০ হাজার একর।
বন অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে সামগ্রিকভাবে বনভূমির পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে বন আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ ১৪ শতাংশ। আর, সুন্দরবন ও রাতারগুলের মতো জলাবনের হিসাব টানলে এটি কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশে। জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, প্রতিটি রাষ্ট্রে মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকতে হবে।
উপ-প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী সমকালকে বলেন, বন উজাড়ের লাগাম টেনে ধরতেই হবে। অন্যথায় এসডিজি অর্জন সম্ভব হবে না। লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যে অনেক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সরকারের নেওয়া সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হলো 'টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)' প্রকল্প। এর অধীনে দেশে বনায়ন শুরু হয়েছে, যা ২০২৩ সাল পর্যন্ত চলবে।
এসডিজি অর্জনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণে ভূমিকার বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস কমাতে সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। বনায়ন বৃদ্ধি পেলে সে পদক্ষেপ আরও জোরালো হবে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশে বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ভূমি ব্যবস্থাপনাও পক্ষে থাকতে হবে। পাশাপাশি বন উজাড়, জবরদখলসহ বিদ্যমান প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। সে লক্ষ্যে বন অধিদপ্তর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, আটটি বিভাগের ২৮টি জেলায় পাঁচটি বনাঞ্চলে সুফল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। এ প্রকল্পের আওতায় ৫২ হাজার ৭২০ হেক্টর বৃক্ষশূন্য পাহাড়ি ও সমতল বনভূমিতে বনাচ্ছাদন, নতুন জেগে ওঠা চরে ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজন, ২০টি রক্ষিত এলাকায় দুই হাজার ৫০০ হেক্টর বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং এক হাজার ৩৩০ হেক্টর এলাকায় বন্যপ্রাণীর চলাচল পথের উন্নয়ন, ছয়টি বনে রক্ষিত বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। এতে দেশের জাতীয় বনাঞ্চল এক দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। তবে শুরুতেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, বিলম্বসহ নানা প্রশ্ন ওঠে।
অন্যদিকে, বন অধিদপ্তরের তিন বছর ধরে চালানো এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে আশাজাগানিয়া চিত্র। 'বাংলাদেশের বনভূমি ও বৃক্ষ সম্পদ সমীক্ষা প্রতিবেদন-২০১৯' অনুযায়ী, দেশে বনের বাইরে ও ভেতরে গাছের সংখ্যা বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বনের বাইরের গাছ। বনভূমিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে সুন্দরবন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।
নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী, বনের বাইরে গাছের পরিমাণ মোট ভূমির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। সে হিসাবে বনের ভেতর ও বাইরে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা মোট ভূমির ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। বন অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মোট ২৫ শতাংশ ভূমি থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো আয়তনে ছোট ও বেশি জনসংখ্যার দেশে তা পূরণ করা খুবই কঠিন। এ জন্য বনের ভেতর ও বাইরের বৃক্ষ আচ্ছাদিত বনের পরিমাণ মাথায় রেখেই অগ্রসর হচ্ছে সরকার। সে হিসাবে বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা থেকে মাত্র আড়াই শতাংশ দূরে।


আরও পড়ুন

×