ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘কিংস পার্টি’ বিএনএম

এক কক্ষের কার্যালয় তারও খোলে না তালা

এক কক্ষের কার্যালয় তারও খোলে না তালা
×

বরগুনার বেতাগী উপজেলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তালাবদ্ধ বিএনএমের কার্যালয়। ছবি: সমকাল

সুমন চৌধুরী, বরিশাল, আবদুস সালাম সিদ্দিকী, বামনা ও ইমাম হোসেন নাহিদ, পাথরঘাটা

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৩ | ০৭:৫৫

বরগুনার বেতাগী উপজেলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়কের পাশে দোতলা ভবনের নিচতলায় এক  কক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) রাজনৈতিক কার্যালয়। প্রায় এক বছর আগে স্থাপিত হলেও কালেভদ্রে কিছু সময়ের জন্য কার্যালয়টি খুলতে দেখা যায়। অধিকাংশ সময়ই থাকে তালা মারা। থাকে না কর্মীর সমাগম। এ দলের নেতাকর্মী কারা, তাও জানেন না আশপাশের বাসিন্দারা। কার্যালয়ের সামনে রাখা বালুর স্তূপই প্রমাণ দেয়, সেখানে কারও পদচারণা হয় না। ওপরে লাগানো পলিসাইনের একটি ব্যানার, সেটিই দলীয় কার্যালয়ের একমাত্র পরিচয়।

কিংস পার্টিখ্যাত বিএনএমের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুর রহমান খোকনের জন্মভূমি বেতাগীর করুনা গ্রাম। তিনি এখানকার বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। তাঁর নিজের উপজেলায় নবগঠিত বিএনএমের সাংগঠনিক অবস্থার এখন এই হাল। একই অবস্থা বরগুনার অপর পাঁচ উপজেলায়ও। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে তিনি বরগুনা-২ (বেতাগী-পাথরঘাটা-বামনা) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সমকালকে নিশ্চিত করেছেন।

গত আগস্টে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের চূড়ান্ত সনদ পাওয়া ভুঁইফোড় দুটি দলের একটি বিএনএম। তখন নিবন্ধনবঞ্চিত ১০টি দল একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছিল, সরকারের নির্দেশনা এবং বিভিন্ন এজেন্সির বিএনএম ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টিকে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন সনদ পেয়েছে।
বিএনএমের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ড. খোকনের জেলা বরগুনার স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয় মাস আগে জেলায় ৩১ সদস্যের এবং প্রতিটি উপজেলায় ১৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। প্রায় একই সময়ে প্রতিটি উপজেলায় দলীয় কার্যালয় করা হয়। আহ্বায়ক, সদস্য সচিবসহ পদধারীরা স্থানীয় রাজনীতিতে অপরিচিত ও অখ্যাত মুখ। কেউ কেউ আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা ছিলেন। নিজ দল থেকে বঞ্চনার ক্ষোভে যুক্ত হয়েছেন এ দলে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির সঙ্গে ফোনে কথা হলেও মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়নি বেশির ভাগ স্থানীয় নেতার। এমনকি তাঁর বাড়ি বেতাগী উপজেলায়, তাও জানা নেই বেশির ভাগ নেতার। স্থানীয় নেতাদের দাবি, কর্মী সংগ্রহের মাধ্যমে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে।

ড. খোকন ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে তৎকালীন বরগুনা-১ (সদর-বেতাগী) আসনে ১২ দিনের জন্য এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই বছর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে ১৮ হাজার ৭০৩ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হন। বিজয়ী নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান ছিল ৩৬ হাজার ২৫০টি। তিনি বেতাগী ডিগ্রি কলেজে ১৬ বছর শিক্ষকতা করেন ও অধ্যক্ষ ছিলেন। আশির দশকে ছাত্রদলের বরগুনা জেলা প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম আহ্বায়ক ও বরিশাল জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। পরে তিনি ঢাকায় যান এবং বর্তমানে রাজধানীর প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান ও ডিন।

বিএনএমের বেতাগী উপজেলা আহ্বায়ক মো. সেলিম একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এ দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি সমকালকে বলেন, ‘আমি কোনোদিন সক্রিয় রাজনীতি করিনি। তবে আজীবন আওয়ামী লীগ সমর্থক। আমাকে এক দিন ফোনে জানানো হয়, আমি নাকি বিএনএমের উপজেলা সভাপতি। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’ তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সভাপতির সঙ্গে কয়েকবার তাঁর ফোনে কথা হয়েছে। তবে সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রমে নেই।

উপজেলা কার্যালয় ভবনের মালিক মো. সেলিম মিয়া বলেন, বরগুনা থেকে কয়েকজন লোক এসে ৬ মাস আগে দুই বছরের চুক্তিতে কক্ষ ভাড়া নিয়েছেন। মাঝে মাঝে কিছু সেখানে লোকজন আসে। স্থানীয় বাসিন্দা কৃষি বিভাগের সাবেক ব্লক সুপারভাইজার আসাদুজ্জামান চিনু বলেন, পাশের উপজেলা বাকেরগঞ্জের বাসিন্দা একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মাঝে মাঝে কার্যালয়টিতে আসতে দেখা গেছে।

পাথরঘাটা উপজেলা আহ্বায়ক মো. ইউনুস মুন্সী পৌর শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি সমকালকে জানান, তাঁর সদস্য সচিব সোহরাব হোসেন বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুটি দলই করেছেন। তবে পদে ছিলেন না। প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কের বাড়ি বরগুনায়, সেটা জানা নেই।
বামনা উপজেলার আহ্বায়ক রুসেল তালুকদার জানান, তিনি ১৯৯০ সালে ছাত্রলীগ করতেন। ৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলে যোগ দিয়ে ১৯৯৩ সালে উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। পরে ১৮ বছর চাকরি করায় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। সর্বশেষ উপজেলা বিএনপির কমিটিতে তাঁকে না রাখায় বিএনএম পার্টি করছেন। কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবদুর রহমানের সঙ্গে তাঁর কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় আহ্বায়কের বাড়ি বরগুনাতে সমকালের কাছে এ তথ্য জেনে বিস্মিত হন আমতলী উপজেলা আহ্বায়ক গাজী ফারুক আহমেদ। পেশায় ঠিকাদার ফারুক জানান, তিনি আগে প্রত্যক্ষভাবে কোনো দল করেননি। সদস্য সচিব সুজাউদ্দিন মাহমুদ পরিচয়ও একই ধরনের।

দলটির জেলা আহ্বায়ক মুশফিকুর রহমান হিরণ জানান, আগে তিনি একটি ওষুধ কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার ছিলেন। সদস্য সচিব ইকবাল হোসেন স্বপন ব্যবসায়ী। তারা আগে কখনও রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন না। তিনি দাবি করেন, উপজেলা নেতাদের নিয়ে কেন্দ্রীয় আহ্বায়কের একাধিকবার সভা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ড. আবদুর রহমান সমকালকে বলেন, নিজের জেলা বরগুনায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। উপজেলার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাঁর এ পর্যন্ত সাক্ষাৎ না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কৌশলের কারণে তারা অনেক কিছুই বলেন।

আরও পড়ুন

×