ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

ভোলায় হামলাকারী কারা

ভোলায় হামলাকারী কারা
×

রাজীব নূর, ভোলা থেকে

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:১৫

'শাহীন প্রতিবাদ জানাতে গিয়েছিলেন, সহিংসতা করতে নয়।' ভোলার বোরহানউদ্দিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত চারজনের একজন তিনি। তার বন্ধুস্থানীয় এক আত্মীয় নাহিদের বক্তব্য এটি। গুলিবিদ্ধ শাহীনকে তিনিই ভোলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। গতকাল বুধবার ছিল শাহীনের কুলখানি। বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে শাহীনদের বাড়ি কাচিয়ায় গিয়ে পাওয়া গেল নাহিদকে।

শাহীন এবং নাহিদ দু'জনই বোরহানউদ্দিন আবদুল জব্বার কলেজের ছাত্র এবং কলেজ-সংলগ্ন মার্কেটে দু'জনেরই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নাহিদ বলেন, 'আমাদের নবী করিমকে (সা.) নিয়ে ঘৃণিত কথাবার্তা লেখা হয়েছে জেনে আমরা প্রতিবাদ জানাতে গিয়েছিলাম। একপর্যায়ে যখন গুলিগোলা শুরু হয়, তখন আমরা দুজনই আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছিলাম।' নাহিদ জানান, তিনি একজন আহতকে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে রেখে এসে দেখেন শাহীনও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে শাহীনকে ভোলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।

শাহীনের বড় ভাই আখতার হোসেন এ সময় হাহাকার করে কান্না শুরু করেন। কাঁদছিলেন শাহীনের মা জোহরা বিবিও। আখতার বলেন, 'আমার ভাই রাসুলের (সা.) অবমাননার প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারা গেছে, সে শহীদের মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু তার ওপর কেন গুলি চালানো হলো? সে তো মসজিদে ভাঙচুর করতে যায়নি। পুলিশের ওপর হামলাও করেনি।' একই প্রশ্ন করছিলেন নিহত মাহফুজ পাটোয়ারীর ভগ্নিপতি মোহাম্মদ এনামুল। তার সঙ্গে কথা হয় গতকাল সকালে মাহফুজদের বাড়ির উঠোনে। মাদ্রাসাছাত্র মাহফুজের বড় ভাই মো. মেরাজ পাটোয়ারী বোরহানউদ্দিন পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক। পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিশ্বাসী এই পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান মাহফুজ। মাহফুজের দুলাভাই এনামুল বলেন, 'আমাদের জানা দরকার কারা প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল এবং কারা সহিংসতা সৃষ্টি করেছে?' তার মতে, সমাবেশ শুরুর পূর্বঘোষিত সময়ের আগে সমাবেশ শেষ করে সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'আমরা কারও কাছে বিচার চাই না। তবে জানতে চাই- টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ছোড়ার আগেই গুলি করা হলো কেন?'

ঘটনার শুরু শনিবারে :বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে কাচিয়া গ্রামের এক যুবকের ফেসবুক মেসেঞ্জারে হজরত মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে কটূক্তি করা হয়। কিন্তু বিপ্লব নিজেই আগে বোরহানউদ্দিন থানায় এসে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অবশ্য এরই মধ্যে বিপ্লবের কাছে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন আসে এবং ফোনের অপরপ্রান্তের ব্যক্তিটি দুই হাজার টাকা দিলে তার হ্যাক করা আইডি মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানায়। বিপ্লবের দেওয়া ওই নম্বরটি ধরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া থেকে শরীফ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে আনা হয় এবং তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হয় ইমনকে। পুলিশ আটকে রাখে বিপ্লবকেও।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বিপ্লবকে যখন থানায় আটক করে রাখা হয়, তখনই শনিবার বিকেলে বোরহানউদ্দিন সদরে প্রথম বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলের কিছুক্ষণ পরেই পরের দিন রোববার সকাল ১১টায় বিক্ষোভ সমাবেশের আহ্বান জানিয়ে শুরু হয় মাইকিং। সন্ধ্যার মধ্যে বোরহানউদ্দিনের সর্বত্র সমাবেশের আহ্বান প্রচার হয়ে যায় এবং সমাবেশের আহ্বানকারী হিসেবে এই এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় বাটামারা পীর মাওলানা মহিবুল্লাহ্‌র নাম বলা হতে থাকে।

এলাকায় ছিলেন না জনপ্রতিনিধিরা :তখন এলাকায় ছিলেন না ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) আসনের এমপি আলী আজম মুকুল এবং বোরহানউদ্দিন পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম। আলী আজম মুকুল বলেন, 'ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে পরের দিন এলাকায় আসার সিদ্ধান্ত নিই। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সঙ্গে কথা বলি। ওসি জানান, যে হিন্দু ছেলেটির ফেসবুক হ্যাক হয়েছে, সে নিজেই থানায় এসে বিষয়টি জানিয়েছে এবং তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ হ্যাকার সন্দেহে দু'জনকে আটক করেছে। আমি বিষয়টি বোঝাবার জন্য দফায় দফায় মাওলানা সাহেবদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে শুরু করি।' পরের দিন ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এলাকায় পৌঁছান এমপি মুকুল এবং পৌঁছানোর পরপরই সমকালের সঙ্গে তার আলাপ হয়।

রাতের বৈঠক :বোরহানউদ্দিন থানার ওসি ম. এনামুল হক বলেন, 'আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি এবং মাওলানা সাহেবদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে রাতে তাদের নিয়ে বৈঠকে বসি। ততক্ষণে হ্যাকার সন্দেহে আটক ইমন এবং শরীফকেও থানায় নিয়ে আসা হয়।'

রাতের ওই বৈঠকে ভোলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক ও পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার উপস্থিত ছিলেন। আলেমদের পক্ষে এসেছিলেন বাটামারা পীর মাওলানা মহিবুল্লাহসহ আহমদউল্লাহ আবসারী, ফায়জুল আলম, আবদুল গণি, জালালউদ্দিন ও মিজানুর রহমান। বাটামারা পীর মাওলানা মহিবুল্লাহ সমকালের সঙ্গে আলাপে বলেন, 'আমরা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের স্পষ্ট করে বলি- আমাদের নবী করিম (সা.)-এর অবমাননা আমাদের ব্যথিত করেছে। আমরা ক্ষুব্ধ। তারা আমাদের নিশ্চিত করেন, অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচার করা হবে। তাই আমরা সমাবেশ না করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হই। ততক্ষণে অবশ্য রাত প্রায় ১২টা বেজে গেছে। তাই আমরা এটাও জানিয়ে রাখি যেহেতু রাত-বিরেতে সমাবেশ বাতিলের খবর পৌঁছানো যাবে না। তাই সকালে সমাবেশের উদ্দেশে যারা চলে আসবেন, তাদের সংক্ষেপে বিষয়টি বুঝিয়ে বিদায় করা হবে।'

কী ঘটেছিল সেই সকালে :স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সমাবেশের পূর্বনির্ধারিত সময় ছিল সকাল ১১টা। ১১টার অনেক আগেই সমাবেশস্থলে লোকজন জড়ো হতে শুরু করে। ১০টার দিকে সমাবেশে অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এহসানুল হক ও পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বক্তব্য দেন। এরপর সাড়ে ১০টা নাগাদ জয়া মহিলা মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আবদুল গণি মোনাজাতের মাধ্যমে সমাবেশ শেষ করেন।

নির্ধারিত সময়ের আগে সমাবেশ শেষ করে দেওয়াটাই কাল হয়েছে বলে মনে করেন বোরহানউদ্দিন বাজার মসজিদের মাওলানা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, 'আমরা সবাই নীতিগতভাবে একমত ছিলাম যে সমাবেশ যেন কোনোভাবেই সহিংস হতে না পারে সেই বিষয়টি দেখব। যখন সমাবেশ শেষ করে দেওয়া হলো তখনও মানুষ আসছিল দূরদূরান্ত থেকে। তাদের কাছে সমাবেশ করতে দেওয়া হয়নি, এমন খবর পৌঁছালে তুলকালাম শুরু হয়।' মাওলানা মিজান নিজেও পুলিশের সঙ্গে আটকা পড়েছিলেন ঈদগাহ মাঠ-সংলগ্ন মসজিদে। তিনি বলেন, 'আমরা হামলাকারীদের প্রতিরোধের অনেক চেষ্টা করেছি।' মসজিদে হামলাকারীদের কাউকে তিনি চিনতে পারেননি বলেও জানান।

হামলার কুশীলবরা :কারা মসজিদে হামলা করেছিলেন? এরই মধ্যে মসজিদে হামলার যে সব ভিডিওচিত্র পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসছে হামলায় অভিযুক্তদের নাম ও ছবি। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছেন ছাত্রদলের উপজেলা সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সবুজ। ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে তিনি কাউকে বলছেন এখনও গুলি করা হচ্ছে না কেন? অন্য একটি ছবিতে দেখা যায়, যুবদলের সভাপতি শিহাবউদ্দিন হাওলাদার এক বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভাওয়ালবাড়ির মন্দিরে ও হিন্দুদের ঘরবাড়িতে হামলার নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে শিবির নেতা মামুন ওরফে কলিকে। এরই মধ্যে আরিফ ও সজীব নামে ছাত্রদলের দু'জনকে পুলিশ আটক করেছে। অন্য একটি ভিডিওতে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সরোয়ার আলম খানের ছোটভাই যুবদল নেতা আশরাফুল আলম খান এবং ছাত্রদল নেতা হেলাল মুন্সিকে মারমুখী অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।

উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সারোয়ার আলম খানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'এই ঘটনা নিয়ে বিএনপির কোনো সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল না। বিএনপি নেতাকর্মীদের যারা ওই সমাবেশে গিয়েছিলেন, তারা গিয়েছেন একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে। মুসলমান হিসেবে তাদের ধর্মানুভূতি আহত হওয়ায়।' তিনি আরও বলেন, আগের রাতে থানার বৈঠকে বিএনপিকে ডাকা হয়নি। বিএনপির কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতা নেওয়া হয়নি।

গুলিবর্ষণের যৌক্তিকতা :গুলিবর্ষণের যৌক্তিকতা এবং ঘটনার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মোবাশ্বিরউল্যাহ চৌধুরী। তবে ঘটনার পরপরই পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেছিলেন, 'ঘটনা শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। আমি কথা বলেছিলাম। আমরা কথা শেষ করে নামার সময় একদল আমাদের ওপর ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করে।' তিনি জানান, একসময় পুলিশের একজন সদস্য মারা গেছে এমন প্রচার হলে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে পুলিশের ওই সদস্য গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তিনি এখনও ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পুলিশ সুপারের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি করেছে।

ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত মাওলানাদের কয়েকজনের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ হয়। তারা বলছেন, গুলি না করে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট মেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যেত।

ভোলা এখনও উত্তপ্ত :আপাতদৃষ্টিতে পরের দিন থেকেই বোরহানউদ্দিন অনেক শান্ত রয়েছে। কিন্তু ভোলা জেলা সদরে উত্তাপ ছড়াচ্ছে চরমোনাই পীরের অনুসারী ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। দৃশ্যত এ দলটি ছাড়া বিএনপিকে কিছুটা মাঠে দেখা গেলেও জামায়াতসহ আর কেউই মাঠে নেই। মোবাশ্বিরউল্যাহ চৌধুরী বলেন, কয়েক মাস আগে চরমোনাইয়ের অনুসারীরা আহলে হাদিসপন্থিদের একটি মসজিদ ভেঙে দেয়। তারা তাদের ওই সব কাণ্ডকীর্তি ইউটিউবের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করলেও পুলিশ এবং সিভিল প্রশাসনের কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। সেই থেকে তারা আস্কারা পেয়ে গেছে। তবে বোরহানউদ্দিনের ঘটনায় কারা উস্কানি দিয়েছে, এটা তার জানা নেই বলে জানালেন সুজন সভাপতি।

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের ভোলা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আতাউর রহমান মোমতাজী বলেন, 'কোনো রকম সহিংসতায় উস্কানি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না আমাদের। বোরহানউদ্দিনে শাসনতন্ত্রের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন। এখন যে প্রতিবাদ আমরা অব্যাহত রেখেছি, সেটি মুসলমানদের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ।'


আরও পড়ুন

×