কর্মস্থলে ফেরাদের দুর্ভোগ
যমুনা সেতুতে যানবাহনের চাপ, সাত ঘণ্টার পথ ১৯ ঘণ্টায়
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ১৪:১৪ | আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ | ১৪:৪৮
ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার তাড়া ছিল সবার। ছিল পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় সময়ের স্মৃতি। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষের কাছে সেই আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে যমুনা সেতু ও এর দুই প্রান্তে দীর্ঘ যানজট, অস্বস্তিকর অপেক্ষা আর সীমাহীন ভোগান্তির কাছে। গত ২৪ মে থেকে শুরু হওয়া অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ঈদের আগে ঘরমুখো যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছিল। ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরা মানুষের ঢলে সেই সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বাসিন্দা সুলতানা মাহারাবি গত শুক্রবার দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে সাত ঘণ্টার যাত্রা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গন্তব্যে পৌঁছাতে তার সময় লাগে প্রায় ১৯ ঘণ্টা।
তিন ঘণ্টা শিডিউল বিপর্যয় বিলম্বের পর দুপুর ২টায় বাস ছাড়ার পর প্রথমে গোবিন্দগঞ্জে ধীরগতির মুখে পড়ে। পরে সিরাজগঞ্জে এসে কার্যত থেমে যায় যাত্রা। বিকেল ৫টা থেকে রাত পৌনে ১২টা পর্যন্ত ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের নলকা থেকে সায়দাবাদ অংশে আটকে থাকে বাস। গভীর রাতে যমুনা সেতুতে উঠলেও ঢাকায় পৌঁছাতে ভোর ৫টা বেজে যায়।
দীর্ঘ যাত্রার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সুলতানা মাহারাবি বলেন, ‘দুপুর থেকে ভোর পর্যন্ত দুই শিশুকে নিয়ে বাসে বসে থাকতে হয়েছে। গরমে ওরা বারবার কান্না করছিল। কখনো পানি চাইছে, কখনো বাস থেকে নামতে চাইছে। কখন গন্তব্যে পৌঁছাব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না।’
সুলতানার গল্পটি ব্যতিক্রম নয়। গত কয়েক দিনে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী ও ঢাকামুখী হাজারো যাত্রীর অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় একই। শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অনেককে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সড়কে কাটাতে হয়েছে।
আজ শনিবার সকাল থেকে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের সায়দাবাদ, মুলিবাড়ি ও কড্ডা এলাকায় ধীরগতির যান চলাচল ও যানজট দেখা যায়। যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় থেকে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি। প্রচণ্ড গরমে বাসের ভেতরে হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়। কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাতাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ শিশুদের নিয়ে রাস্তার পাশে নেমে কিছুটা স্বস্তি খুঁজছেন।
সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের পাশাপাশি ধারাবাহিক ছোটখাটো দুর্ঘটনাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
যমুনা সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন শাখার স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী লেনের যান চলাচল এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। তবে উত্তরাঞ্চলগামী লেনে এখনো ব্যাপক চাপ রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, সেতুর দুই প্রান্তে চার থেকে ছয় লেনে যানবাহন এসে টোলপ্লাজায় ভিড় করছে। যানবাহন যেভাবে আসছে, সেভাবে পারাপার করানো সম্ভব হচ্ছে না। টোল প্লাজার ১৮টি বুথ চালু থাকলেও সেতুর সক্ষমতার একটি সীমা রয়েছে।
তার ভাষ্য, গত কয়েক দিনে সেতুর ওপর দুই থেকে তিন শতাধিক ছোটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে। একটি দুর্ঘটনার পর যানবাহন সরাতে সামান্য সময় লাগলেও তার প্রভাব দুই পাড়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেতু দিয়ে ৪০ হাজারের বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এ সময় টোল আদায় হয়েছে ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকারও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় কারণ। সেতুর উভয় পাশে দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় চার লেন মহাসড়ক সম্প্রসারণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু সেতুর ওপর এখনো সেই সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি।
সাসেক-২ প্রকল্পের পরিচালক ড. ওয়ালিউর রহমান বলেন, সেতুর ওপরের পুরোনো রেললাইন অপসারণের পর প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মিটার জায়গা খালি হয়েছে। ওই জায়গাটি দুই লেনের সঙ্গে সংযুক্ত করে সক্ষমতা বাড়ানো না হলে যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে না। দুই প্রান্তের চার লেন সড়কের সুফল সেতুর ওপর এসে আটকে যাচ্ছে। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সেতুই এখন ‘বটলনেক’।
তার মতে, যমুনা সেতুর ওপর সম্প্রসারণকাজ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে ঈদ বা বড় ছুটির সময় একই ধরনের সংকট আরও প্রকট হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, ২৪ মে থেকে শুরু হওয়া যানবাহনের চাপ, ঈদের আগে ও পরে টানা দুর্ভোগ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—উত্তরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশদ্বার এখন তার সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গেছে। সড়কে সারিবদ্ধ যানবাহনের অন্তহীন লাইন আর বাসের ভেতরে ক্লান্ত মানুষের অপেক্ষা। তাই, একটিই প্রশ্ন—এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান কবে?
- বিষয় :
- ঈদের ছুটি
- সিরাজগঞ্জ
- যমুনা সেতু
- যানজট
- ঈদযাত্রা
