সাজেকে এখনো কমেনি হামের প্রকোপ, নতুন আক্রান্ত শতাধিক
ফাইল ছবি
রাঙামাটি অফিস ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২০ | ০৩:৩২
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম সাজেকে কমেনি হামের প্রকোপ। নতুন করে সাজেকের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় আরো একশ জনের বেশি হামে আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয় কার্বারী (পাড়া প্রধান), বেসরকারি চিকিৎসক এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতিনিয়তই এমন খবর মিলছে।
জানা যায়, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা হচ্ছে সাজেক ইউনিয়ন। গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে সাজেক ইউনিয়ন এলাকায় হামের প্রার্দূভাব দেখা দেয়। ৯ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আক্রান্ত হয়েছিল বয়স্ক ও শিশুসহ দুই শতাধিক। এতে সরকারিভাবে মেডিকেল টিম গঠন করে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবির পক্ষ থেকেও আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। দুর্গত এলাকায় হামের টিকাও দেওয়া হয়। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু নতুন করে গত এক সপ্তাহে সাজেকের মাচলং এলাকায় ৬৪ জন, সুরুনং নালায় ২৮ জন, গঙ্গারাম ও ভা বোন ছড়ায় ৭ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে সাজেক ইউনয়নের শিজকছড়া, হাউজপাড়া, সুরুংনালা, মাচলং, উজোবাজার এবং ভূইয়োছড়ি ঘুরে কমপক্ষে ৩৫টি দরিদ্র পরিবারের শিশুকে হামে আক্রান্ত দেখা গেছে। তবে বর্তমানে সেখানে সরকারি কোন চিকিৎসাকর্মীর দেখা মিলছে না। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সুরুংনালা এলাকার সমাজকর্মী বিজয় কেতন চাকমা জানান, সরকারি-বেসরকারি কর্তপক্ষের কাছে সাজেক মানে ‘রুইলুই পর্যটন’। ওখানে উঠলে পাহাড়-প্রকৃতি দেখা যায়, মানুষের কষ্ট দেখা যায় না। তাই এখানকার মানুষের অভাব-অসুস্থতা জানতে হলে রুইলুই পাহাড় থেকে নেমে চারপাশে হাঁটতে হবে।
সুরুংনালার এলাকার কার্বারী(গ্রাম প্রধান) অমর কান্তি চাকমা জানান, সুরুংনালার এলাকায় মানুষ আগেও হামে আক্রান্ত হয়েছিল। এখন নতুন করে আরো ২৮ জন আক্রান্ত হয়েছে।
উজোবাজারের ফার্মেসি মালিক পুতুল চাকমা বলেন, চলতি মাসের শুরু থেকে রাঙামাটি থেকে ‘আশিকা ডেভলপমেন্ট এসোসিয়েটস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়োগকৃত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে ইউনিয়নের সবচেয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র-পরামর্শের পাশাপাশি পরিবার পিছু নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করছে।
ইউপি সদস্য সুশীলা চাকমা ও হীরানন্দ ত্রিপুরা বলেন, সাজেক ইউনিয়নটি ফেনী জেলার সমান আয়তনের। বেশিরভাগ এলাকা দুর্গম এবং দারিদ্র্যপ্রবণ। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল মানেই এখানে খাদ্য সংকটের মৌসুম। এই সময়টাতে ‘আশিকা’র মতো এনজিওরা বেশি বেশি এগিয়ে আসলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নেলসন চাকমা নয়ন বলেন, সাজেক এলাকায় নতুন করে মাচলংয়ে ৬৪ জন, সুরুনং নালায় ২৮ জন, গঙ্গারাম ও ভাইবোন ছড়ায় ৭ জন আক্রান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় আইন-শৃখলা বাহিনীকে আক্রান্তদের তালিকা দেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, দুর্গম এলাকায় ৯ শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়ে সবার আগে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। পাশাপাশি অনেক এলাকায় বিজিবিও সহযোগিতা প্রদান করেছে। এই দুই প্রতিষ্ঠান এগিয়ে না আসলে পরিস্থিতি আরো খারপা হতে পারতো।
‘আশিকা ডেভলপমেন্ট এসোসিয়েটস’-এর নির্বাহী পরিচালক বিপ্লব চাকমা জানান, ২০১৭ সালে সাজেক এলাকায় ভয়াবহ খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়েছিলো। তার আগেও ‘ইঁদুর বন্যা’র কবলে পড়ে ব্যাপক ফসলহানির মুখে মানুষ সাজেক ছেড়ে পালানোর ঘটনা ঘটেছিল। এলাকাটির অধিকাংশ মানুষ সুপেয় পানির সুযোগবঞ্চিত। অভাব-অশিক্ষায় মানবেতর জীবনযাপন করেন।
রাঙামাটির সিভিল সার্জন ডা. বিপাশ চাকমা জানান, এই এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই। সেনাবাহিনী ও বিজিবি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নতুন করে আক্রান্তের তথ্য নিশ্চিত হওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতে এই এলাকার মানুষ বেশি উপকৃত হবেন।