দিনাজপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধাকে দাফন
মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন-ফাইল ছবি
দিনাজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ০৮:০৭
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ না নেওয়ার একটি চিঠি লেখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছেন মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন।
তার লেখা চিঠি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অফ অনার) ছাড়াই দেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে দিনাজপুরে তার বাড়ির সামনে দাফন করা হয়। জানাজার আগে দিনাজপুরের ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের চৌকস দল গার্ড অব অনার জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের মরদেহ জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করা হয়নি।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে লেখা চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন লেখেছিলেন, ‘জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে চাই না। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করিও।’
দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬ নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামের মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম কাছে লেখা চিঠিতে এসব উল্লেখ করেন।
মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের সুপারিশে ছেলে নুর ইসলামের নো ওয়ার্ক নো পে ভিত্তিতে এসিল্যান্ডের গাড়ি চালক হিসেবে চাকুরি হয় ২০১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। নুর ইসলাম দিনাজপুরের সদর উপজেলার এ্যাসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন। কর্মস্থলে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে স্বাক্ষাত করেন। এ সময় তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে সেখানে উপস্থিত এডিসি রাজস্বকে বিষয়টি দেখতে বলেন। হুইপকে বিষয়টি অবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নুর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিস দেয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এ্যাসিল্যান্ডের স্ত্রী নুর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকুরিচ্যুত করা হয়। পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও ক্ষিপ্ত হয়ে যান। এছাড়াও নুর ইসলাম তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য এসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেননি। চাকরি চলে যাওয়ায় উপায় না পেয়ে তারা হুইপ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু প্রশাসন সেটি খারাপভাবে নেয়। বর্তমানে তার ছেলে চাকরিচ্যুত ও বাস্তচ্যুত হয়ে স্ত্রী পুত্র নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
চিঠিতে তিনি আরো লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি রোজগারটুকুও অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হল। এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন তুমি ন্যায়বিচার কর। আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ করে চাকরিচ্যুত হওয়ায় একেই তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছি। জীবণ মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম/ স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না।’
জানাজার আগে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের পরিবার পরিজন দায়িত্ব দিলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড. মোফাজ্জল হোসেন দুলাল জানাজা নামাজে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, অন্যায়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের ছেলেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এই চিঠি লিখে গেছেন। আমরা তার লিখে যাওয়া চিঠির ওছিয়দ অনুয়ায়ী দাফন করতে চাই। চিকিৎসার জন্য তিনি অনেকের কাছে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নুর ইসলামের চাকরি স্থায়ী ছিল না। তাছাড়া তার গাড়ি চালানো ভাল ছিল না এবং কয়েকবার দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। চাকরিচ্যুতের বিষয়টি তিনি জানেন না, এটি আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।’
জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়ার পর বিষয়টি জানতে পারি।পরিবারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দিতে বাধা দেওয়া হয়।
- বিষয় :
- মুক্তিযোদ্ধা
- দিনাজপুর