‘চোখের পলকে আমার সব মুরগি মইরা শ্যাষ’
মুরগিশূন্য খামারের পাশে বসে আছেন পোল্ট্রি খামারি আবু বক্কর সিদ্দিক -সমকাল
কবীর উদ্দিন সরকার হারুন, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২০ | ১২:৪৮ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
‘২০১৩ সাল থেকে মুরগি পালন শুরু করি আমি, প্রথমে আমার তিন-চার বছর মুরগি পালন করে বেশ লাভ হয়ছিলো। তারপর থ্যাইকা বিভিন্ন রোগ-বালাই আসা শুরু করলো খামারে। মুরগি মইরা পইচা যে কয়টা থাকতো মোটামুটি চলতো। কিন্তু মুরগি অসুখ দিনে দিনে বাড়তেই থাকল। এই বছর ৩ হাজার ৫৩৯টি ডিমওয়ালা মুরগি খামারে তুলছিলাম। এনজিও, ব্যাংক ঋণ আর সুদে টেকা লইয়া নামছিলাম। হায়রে কপাল, এই বছর শুরু হইলো করোনা, আর এলাকায় বেবাগ খামারে শুরু হইয়া গেলো মরি লাগা। ১৫ দিনের মধ্যে চোখের পলকে আমার সব মুরগি মইরা শ্যাষ হইয়া গেল।’
কথাগুলো বলে অঝরে কেঁদে ফেললেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া় উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের কাহালগাঁও গ্রামের পোল্ট্রি খামারি আবু বক্কর সিদ্দিক (৬০)। তিনি বলেন, ‘সরকারি ডাক্তার কোনোকালেই এলাকায় দেহি নাই। তাই বাইরে থেকে ডাক্তার এনে চিকিৎসা করাইলাম। কিন্তু কোন কাম হইলো না, খালি কয় ফাউল কলেরা। খাওনের টাকা বাকি, সুদের ঋণ করা আছে, এনজিওর লোন আছে, আমি পথের ফকির হইয়া গেছি। মানুষের টাকা শোধ দিতে না পারলে মরা ছাড়া গতি নাই আমার।’
শুধু আবু বক্কর সিদ্দিক নয়, তার মত পোলট্রি খামার করে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছেন এই গ্রামের অধিকাংশ খামারি। ফুলবাড়িয়ায় অজ্ঞাত রোগে ক্ষুদ্র-মাঝারি অন্তত ৩০০ পোল্ট্রি মুরগির খামারি রয়েছে। সব খামারেই গত কয়েকমাসে মুরগি মরে সয়লাব। যার ফলে এখন সর্বশান্ত হয়ে গেছেন ফুলবাড়িয়ায় পোলট্রি খামারিরা।
খামারিদের দাবি, মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে দোকানপাট হোটেল-রেস্তোরাঁসহ ব্যবসা-বাণিজ্য। একারণে একদিকে যেমন খামারিরা তাদের মুরগি ও ডিম বিক্রি করতে পারছেন না, অন্যদিকে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মুরগি মারা যাচ্ছে। উপজেলার অধিকাংশ মুরগীর খামার এনায়েতপুর ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের কাহালগাঁও, সুয়াইদপুর, দোলমা, ফুলতলা গ্রামের খামারিদের এবার অন্তত ১০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এনায়েতপুর ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে খামার করে আসা মোকসেদ আলী, আয়নাল হক, মালেক মিয়া, সালাম মিয়া জানান,- এবছর যারা পোল্ট্রি খামার করেছে তাদের প্রায় সবাই বর্তমানে সর্বশান্ত। ছোট-বড়-মাঝারি মিলে এমন কোন খামার খুঁজে পাবেন না যে সেখানে ১৫-২০ লাখ টাকা কিংবা তারও বেশি ক্ষতি হয়নি।
তারা বলেন, এই ক্ষতির কারণে আমরা এখন সর্বশান্ত, নতুন মুরগি পালন করবো তারও কোন উপায় নাই। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, আমাদের জন্য সহজভাবে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও প্রণোদনার পাশাপাশি সুদমুক্ত ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া এই শিল্প থেকে খমারিরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরেজমিনে উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ খামার মুরগি শূন্য। এছাড়া খুচরা বাজারে মুরগির দাম কম। তাই যে কয়েকটি খামারে মুরগি আছে, তারা বিক্রি করতে পারছেন না। করোনাভাইরাসের কারণে পাইকারি বাজারে ডিমের দামও খুব কম। এই দামে মুরগি ও ডিম বিক্রি করলে ব্যপক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হবে।
উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মুরগি খামারি কবির হোসেন তালুকদার বলেন, খামার করার প্রথম দিকে বেশ লাভবান হলেও দিনদিন নানান রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় খামারিরা প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা লস করছে। এ নিয়ে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে কোন চিকৎসক খামারিদের পরামর্শ দিতে আসেন না। পরামর্শ চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও নানান টালবাহানা শুনতে হয়। করোনাভাইরাস ও অজ্ঞাত রোগের এনায়েতপু ইউনিয়নে অন্তত ১০ কোটি ক্ষতি হয়েছে পোল্ট্রি খাতে। তবে করোনা সংকট মোকাবেলায় মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তাদের বিনাসুদে ঋণ দেওয়া হবে, পানিসম্পদ মন্ত্রীর এমন ঘোষণায় আশার আলো দেখছেন প্রান্তিক পর্যায়ের সকল ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা যাতে ঋণসুবিধা পায় তার দিকে সরকারকে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে় ফুলবাড়িয়া কৃষি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আনিছুর রহমান সমকালকে বলেন, আমি এই উপজেলায় নতুন জয়েন করেছি। মুরগিগুলো কেন মারা যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখব অবশ্যই। সরকারের তরফ থেকে এখনো আমাদের কাছে প্রণোদনার ব্যাপারে কোন চিঠি আসেনি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিরা যদি ব্যাংক লোনের জন্য কোন সহযোগিতা চায়, তাহলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।