ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাগরে নিখোঁজ হন জেলে কান্না থামে না পরিবারে

সাগরে নিখোঁজ হন জেলে কান্না থামে না পরিবারে
×

ফাইল ছবি

 আবু জাফর সালেহ্, বরগুনা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৪ | ২৩:৩১

সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন বরগুনা সদর উপজেলার মোল্লারহোড়া গ্রামের ইউনুস সরদার। মাছ ধরে চলত স্ত্রী-সন্তান-মাসহ ছয়জনের পরিবার। গত বছরের ১৩ নভেম্বর ট্রলার নিয়ে গিয়েছিলেন ইলিশ শিকারে। চার দিন পর ঘূর্ণিঝড় মিধিলির তাণ্ডবে গভীর সাগরে ডুবে যায় ট্রলার। ইউনুসসহ ১৭ জেলে ছিলেন সে ট্রলারে। এখন পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি তাদের।
আট মাস পেরিয়ে গেলেও কান্না থামছে না এই জেলেদের পরিবারে। একদিন হয়তো ফিরে আসবেন– এ আশায় বুক বেঁধে আছেন স্বজন। গত শনিবার মোল্লারহোড়া গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ইউনুসের মা তারাভানু দিন-রাত কাঁদেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দুর্বিষহ জীবন তাদের। বাড়ি গিয়ে ইউনুসের বিষয়ে জানতে চাইলেই তারাভানু ডুকরে কেঁদে উঠে বলতে থাকেন, ‘আমার সোনার চান, কোম্মে গ্যালে। রাইতে ঘুমাই না। ও আল্লাহ, আমার পোলাডারে আইন্না দাও; আমার বুকটা একটু ঠান্ডা বানাও।’
শুধু ইউনুস নন, গত ছয় বছরে মাছ ধরতে গিয়ে ফিরে আসেননি বরগুনা অঞ্চলের চার শতাধিক জেলে। ঘূর্ণিঝড়, জলদস্যুর হামলা, ইঞ্জিন বিকল হওয়া এবং দিক হারিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া এমন নানা ঘটনার শিকার হন তারা। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকা, ট্রলারে লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং ভারী উদ্ধারযানের অভাবে বেড়ে যায় প্রাণহানি। এদিকে নিখোঁজদের স্বজন অপেক্ষা করেন বছরের পর বছর। এক পর্যায়ে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন অনেকেই।

পাথরঘাটা উপজেলার বড় টেংরা গ্রামের আবুল কালাম মাঝি সাগর ও নদীতে মাছ শিকার করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে বাড়িতে শুরু করেন পাকা ঘর তৈরির কাজ। গত ১৪ নভেম্বর ১২ জেলেসহ গভীর সাগরে মাছ শিকারে গিয়েছিলেন তিনি। যাওয়ার আগে ঢাকায় অবস্থানরত মেয়েকে ফোন করে বলে যান, সাগর থেকে ফেরার আগে যেন বাড়িতে বেড়াতে আসে। মেয়ে ঠিকই এসেছে বাড়িতে, তবে ফেরেননি কালামসহ গ্রামের আট জেলে। ১৭ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় মিধিলির তাণ্ডবে 
গভীর সাগরে ডুবে যায় তাদের ট্রলার। এটিতে থাকা ১২ জেলের চারজনকে উদ্ধার করেন অন্য ট্রলারের জেলেরা।
কালাম মাঝির বড় মেয়ে ফাহিমা আক্তার বলেন, ‘১৪ নভেম্বর বাবা মোবাইল ফোনে বলেছিলেন, সাগরে যাই মাছ ধরতে। তোরে টাকা পাঠাইয়া দিলাম বিকাশে। আমি সাগর থেকে এসে যেন দেখি, তুই বাড়িতে বেড়াতে আসছ। এখনও কোনো খোঁজ পাইনি বাবার।’ একই ট্রলার ডুবে নিখোঁজ হন কালামের প্রতিবেশী নাদিম (১৮)। তাঁর মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘নাদিম জানিয়েছিলেন, সাগরে যেতে ভয় করে। তখন আমি বলেছি, বাবা, এইবার যাও। এর পর আর তোমারে সাগরে পাঠাব না; বাড়িতে বসে মানুষের কাজকর্ম করে যা পারো আয় করবা। জানি না ছেলে জীবিত আছে, নাকি মারা গেছে।’ ‘আল্লাহ, তুমি আমার ছেলের অন্তত লাশটা দেখার সুযোগ দাও’– এই বলে নির্বাক হয়ে যান ফাতেমা।

ডুবে যাওয়া ‘মায়ের দোয়া’ ট্রলারের উদ্ধার হওয়া জেলে মো. নুরুজ্জামান মুন্সি বলেন, ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় হঠাৎ করে সাগর উত্তাল হয়। তখন আমরা বুঝতে পারি, ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়েছে। এর পর আমরা কিনারে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিলে পরদিন সকালে হঠাৎ করে ট্রলার ডুবে যায়। তখন আমরা সাঁতরে সবাই এদিক-সেদিক চলে যাই। ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম এলাকার একটি ট্রলারের জেলেরা আমাদের চারজনকে সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে পটুয়াখালী জেলার মহিপুরে দিয়ে যান। আমাদের সঙ্গে থাকা বাকি আট জেলে কোথায়, তা জানি না। নুরুজ্জামান মুন্সি আরও বলেন, আমরা যেখানে মাছ ধরতে যাই, সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় আবহাওয়ার কোনো খবর পাই না। সাগরের ঢেউয়ের মাধ্যমে বুঝতে পারি, আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকায় তিনি ট্রলার মালিকদের দায়ী করেন। তা ছাড়া গভীর সাগরে গিয়ে মাছ শিকার না করে ঘাটে ফিরে এলে ট্রলার মালিকদের নানা ধরনের জবাবদিহি করতে হয়। এ কারণে ছোটখাটো সিগন্যালেও সাগর থেকে জেলেরা ফিরে আসেন না।

বরগুনা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জেলার ছয়টি উপজেলায় সরকারি নিবন্ধিত জেলে পরিবার ৪০ হাজার ৫২১। জেলা ট্রলার মালিক সমিতির হিসাবে জেলে আছেন অন্তত ৪৫ হাজার। তারা বছরের অন্তত ৯ মাস গভীর সাগরসহ নদীতে মাছ শিকার করেন।
২০১৮ সালের জুলাইয়ে বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে বরগুনার ২০১ জেলে নিখোঁজ হন। তাদের ১৬৬ জনকে জীবিত ও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্যদের সন্ধান এখনও মেলেনি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভাই ভাই নামে একটি ট্রলারে ডাকাতি হয়। ওই ট্রলারের ১৩ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বাকি পাঁচজনের নিথর দেহ পাওয়া যায়। গত বছরের ১২ আগস্ট পাথরঘাটার সগীর কোম্পানির একটি ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভারতের জলসীমায় প্রবেশ করায় ১১ জেলেকে আটক করা হয়। ওই জেলেরা ভারতের বারুইপুর কারাগারে। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলার ৮২ জেলে ভারতের কারাগারে আছেন।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সিগন্যাল দ্রুত পরিবর্তন, শক্তিশালী মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকা এবং ভারী উদ্ধারযানের অভাবে সাগরে প্রাণহানি ঘটে। পাথরঘাটায় কোস্টগার্ডের যে উদ্ধারযান রয়েছে, তা দিয়ে দুর্যোগের সময় গভীর সাগরে যাওয়া সম্ভব হয় না। এসব কারণে ট্রলারডুবির তথ্য পেলেও দ্রুত উদ্ধার করা যায় না। বরগুনার জেলেদের জন্য একটি ভারী উদ্ধারযান দেওয়ার দাবি জানান তিনি। এ ছাড়া সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টসহ উপকূলীয় বিভিন্ন স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার স্থাপন করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বরগুনার জেলা প্রশাসক মোহা. রফিকুল ইসলাম বলেন, নিখোঁজ জেলেদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়। ভারী উদ্ধারযানের জন্য চেষ্টা চলছে। নিখোঁজ জেলেদের সন্ধানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। মাছ ধরা ট্রলারে যাতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখা হয়, সে ব্যাপারে কাজ করবে জেলা প্রশাসন।

আরও পড়ুন

×