ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস মাঠ সংস্কার
সীমানাপ্রাচীর নিয়ে সমালোচনার ঝড়
ময়মনসিংহ সার্কিট হাউস মাঠ ঘিরে সীমানাপ্রাচীর করার প্রতিবাদে মানববন্ধন- সমকাল
ময়মনসিংহ ব্যুরো
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২০ | ১৪:৪৪
ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী সার্কিট হাউস মাঠকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার জন্য বিভাগীয় প্রশাসন একটি প্রকল্প নিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনার ঝড় বইছে। বিশেষত মাঠের সীমানাপ্রাচীর তোলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন প্রায় সবাই।
এদিকে বিভাগীয় প্রশাসন বলছে, খেলাধুলার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি, মাঠে অবাধে গরু-ছাগলের বিচরণ বন্ধ এবং ভ্রমণপিপাসুদের জন্য মাঠের চারধারে ওয়াকওয়ে নির্মাণ ইত্যাদি কারণে সীমানাপ্রাচীরও অনিবার্য। এ ছাড়া মাঠের এক কোণে জাতির পিতা ও তার পরিবারের শহীদ সদস্যদের দৃশ্যমান একটি ম্যুরাল নির্মাণের কথাও বলা হচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
ময়মনসিহের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ তীরবর্তী প্রায় ১৬ একর জমির ওপর ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস মাঠ। ৩ হাজার ৪১১ বর্গমিটার আয়তনের এই মাঠটি ক্রিকেট-ফুটবল অনুশীলনের অন্যতম স্থান। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধান সমাবেশস্থলও এটি। এই মাঠের পাশ ঘেঁষে মোহামেডান, আবাহনী, পণ্ডিতপাড়া, রাইফেলস ক্লাবসহ প্রায় অর্ধশত বিভিন্ন ক্লাবের কার্যালয়। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী মানুষ খেলাধুলা ও ব্যায়াম অনুশীলন করে এ মাঠ মুখরিত করে রাখেন। এ মাঠকে 'দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়' করে তোলার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়ে বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১ জুন উন্নয়ন প্রকল্পের নামফলক উদ্বোধন করা হয়। গণপূর্ত বিভাগ এ প্রকল্পের সামগ্রিক ডিজাইন প্রস্তুত করেছে।
ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বদরুল আলম খান প্রকল্প বিষয়ে জানান, সার্কিট হাউস মাঠের চারধারে আড়াই-তিন উঁচু দেয়াল এবং দেয়ালে ওপর আড়াই ফুট উচ্চতার কারুকার্য সংবলিত এসএস পাইপের গ্রিল দেওয়া হবে। নির্মাণ করা হবে ৬ ফুট প্রশস্ত ওয়াকওয়ে, মাঠের এক কোণে নির্মাণ করা হবে ২ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতির পিতা ও তার পরিবারের শহীদ সদস্যদের ম্যুরাল। দেয়াল ঘেরা মাঠে থাকবে ৬ থেকে ৮টি সুদৃশ্য প্রবেশপথ। চারদিকে গ্লোব লাইটের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ভ্রমণপিপাসু, দর্শনার্থী ও খেলোয়াড়দের জন্য নির্মাণ হবে দুটি ওয়াশ ব্লক। বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য থাকবে দুটি গভীর নলকূপ।
সার্কিট হাউস মাঠের উন্নয়নে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সেক্রেটারি, রাইফেলস ক্লাব সম্পাদক ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলম। তিনি বলেন, প্রশাসনের এই উদ্যোগ সার্কিট হাউস মাঠকে আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন করবে। ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুলও চান খেলাধুলার ঐতিহ্য ঠিক রেখে মাঠটিকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহারের উপযোগী করে আধুনিকায়ন করা হোক।
তবে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের বিরোধিতা করে ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আমিন কালাম বলেন, সার্কিট হাউসের উন্নয়ন চাই। এ প্রকল্পের অন্য সব কিছুর সঙ্গেই একমত আমরা। তবে দেয়াল চাই না।
ময়মনসিংহ ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক আমীর আহমেদ চৌধুরী রতনও জানান, সার্কিট হাউস মাঠ ময়মনসিংহের শত বছরের প্রাচীন উন্মুক্ত স্থান। উন্মুক্ত মাঠ একটি নগরকে ভিন্নতর সৌন্দর্য দিয়ে থাকে। এটাকে কোনোভাবেই দেয়ালে আবদ্ধ করা ঠিক হবে না। এ মাঠের অবয়ব ঠিক রেখে উন্নয়ন করার আহ্বান জানান তিনি।
বিদায়ী বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান ১ জুন নামফলক প্রকল্পের উদ্বোধন করে জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মাঠে গরু-ছাগল প্রবেশ করতে পারবে না। রাতের আঁধারে নেশাখোরসহ বখাটেদের অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ হবে। মাঠের একটি কোণ এমনিতেই দখলপ্রায়। সীমানাপ্রাচীর হলে মাঠটি বেদখল হবে না। এ ব্যাপারে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও মাঠে সীমানাপ্রাচীরের বিরোধিতায় প্রতিবাদের ঝড় বইছে। গত বুধবার সার্কিট হাউস মাঠে মানববন্ধন করে 'বিক্ষুব্ধ ময়মনসিংহবাসী' ব্যানারে দেয়াল নির্মাণের প্রতিবাদ করা হয়েছে। সীমানাপ্রাচীরের বিপক্ষে মত দিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার সানোয়ার হোসেন, ফুটবল কোচ মারুফুল হকসহ জাতীয় দলের সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেট এবং ফুটবল তারকারা। তাদের দাবি, সীমানাপ্রাচীর না দিয়ে মাঠের উন্নয়ন, ওয়াকওয়ে, ম্যুরালসহ অন্যান্য উন্নয়ন করা যেতে পারে।
'আমার ইতিহাস, আমার ঐতিহ্য বন্দি হতে পারে না'- স্লোগান সংবলিত ব্যানার নিয়ে এ মানববন্ধনে অংশ নেয় সর্বস্তরের নাগরিকরা। কবি ও সংগঠক স্বাধীন চৌধুরীর সঞ্চালনায় এ মানববন্ধনে বক্তৃতা দেন মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শওকত জাহান মুকুল, ময়মনসিংহ জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ভৌমিক, সুজনের মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ, খেলোয়াড়, কোচসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন।
এ সময় ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ক্রীড়া সংগঠক শওকত জাহান মুকুল বলেন, সার্কিট হাউস মাঠ ময়মনসিংহবাসীর ঐতিহ্যের প্রতীক। এ মাঠ এখন উন্মুক্ত আছে, একে দেয়ালবন্দি করা যাবে না। সে চেষ্টা করলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মাঠের উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধনের বিপক্ষে কথা বলছি না। জাতির পিতার ম্যুরাল নিয়েও দ্বিমত নেই। তবে দেয়াল দিয়ে মাঠকে বন্দি করার পক্ষে আমরা নই।