স্বপ্ন দেখছেন লিতা ও মুন্নী
গারো স্কুলটির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে ৭০ বছরের পুরোনো ছোট গজনী আরসি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জীর্ণ ঘর -সমকাল
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২০ | ১৪:৫০
কোনো সাইনবোর্ড নেই। ভাঙাচোরা টিন আর পাতার ছাউনিঘেরা স্কুলঘর। চারপাশে বেড়াও ছিল না। একটু ঝড়বৃষ্টি হলেই স্কুলের ভেতরে বসাও কষ্টসাধ্য। জরাজীর্ণ এমন পরিবেশেই ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের মধ্যে জ্ঞানের আলো বিলিয়ে আসছেন গারো দুই নারী শিক্ষক। দারিদ্র্যের সঙ্গে অসীম সংগ্রাম করেই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কোনো মতে টিকে আছেন তারা। আর তাদের বেতন; সেটাও নামমাত্র। মাসে মাত্র দুই হাজার টাকা! এই সামান্য সম্মানিও কোনো কোনো মাসে জোটে না। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শিক্ষার প্রতি অনুরাগের কমতি মোটেও নেই। কখনও কখনও চরম দুঃসময়েও হয়তো সাময়িকভাবে ভেঙে পড়েছেন, কিন্তু চূড়ান্তভাবে পরাস্ত হননি। হারাননি মনোবল। গারোদের ছোট গজনী আরসি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তার দুই শিক্ষক লিতা খুবী আর মুন্নীর দুপুরের গল্প এটি। এই যুগে এমন শিক্ষক বিরল বটে। শেরপুরের ঝিনাইগাতীর কাংসা ইউনিয়নের ৭০ বছরের পুরনো এই স্কুলও তাদের দু'জনের কাঁধে।
স্থানীয় গারো সম্প্রদায়রের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী। তবে দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে সত্যি এবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন লিতা ও মুন্নী। তারা এখন বিশ্বাস করছেন, বহু বছরের পুরনো এই স্কুলটিকে তারা ভালোভাবেই চালিয়ে নিতে পারবেন। তাদের পাশে সহমর্মিতা আর ভালোবাসার হাত এখন রয়েছে।
গতকাল যোগাযোগ করা হলে লিতা সমকালকে বলেন, 'দিনমজুর হিসাবে কাজ করলেও দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করা যায়। আমরা দুই শিক্ষক। একজন পেতাম মাসে দুই হাজার টাকা। আরেকজন আড়াই হাজার টাকা। এ দিয়ে কি সংসার চলে! তার ওপর স্কুলের অবকাঠামো বলতে কিছুই ছিল না। সব কিছু ভাঙাচোরা। তবে জানুয়ারিতে পুলিশের একজন স্যার আমাদের এলাকায় আসেন। হঠাৎ তার নজরে আসে আমাদের স্কুলটি। তিনি তখনই আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। আমাদের দুর্দশা নিজের চোখে দেখে স্কুলটি মেরামতের জন্য তাৎক্ষণিক অর্থসহায়তা করেন। দুই শিক্ষকের বেতনের কথা জানতে পেরে মর্মাহত হন। অনেক সময় সেই সামান্য বেতনও পাচ্ছি না, এটা তাকে জানাই। পুলিশের ওই স্যার স্কুলটি ভিজিটের পর থেকেই এখন প্রতি মাসের শুরুতে তার কাছ থেকে একটি সম্মানি আমরা পাচ্ছি। ঢাকা থেকে তিনি এটা পাঠান। স্থানীয় পুলিশ আমাদের হাতে তা প্রতি মাসে দিয়ে যান। তার এমন ভালোবাসা কখনও ভুলব না। তার টাকায় স্কুলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নতুন টিন, কাঠ কিনে মেরামত করা হচ্ছে স্কুলভবন। নতুন স্কুল দেখে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরাও আনন্দিত।'
লিতা জানান, সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে এই স্কুল। মাত্র দু'জন শিক্ষক থাকায় নার্সারি থেকে থ্রি পর্যন্ত পড়ান একজন। আরেকজন ক্লাস থ্রি থেকে পঞ্চম শ্রেণি। এবার ৯টি শিশু স্কুলটি থেকে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে।
লিতা আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে সামান্য বেতন না পাওয়ায় এর আগে অগাস্টিন ও অর্জলী নামে দু'জন শিক্ষক স্কুল ছেড়ে চলে গেছেন। তবে দুই বছর ধরে লিতা একাই সব সামলে নিচ্ছেন।
লিতা জানান, চার ছেলে আর স্বামী নিয়ে তার সংসার। তার স্বামী দিনমজুর। স্কুল থেকে পাওয়া সম্মানি আর স্বামীর রোজগারের টাকায় অভাব-অনটনের মধ্যেই কোনোমতে চার সন্তানকেই লেখাপড়া করাচ্ছেন। তার বড় ছেলে ঢাকার নারিন্দায় একটি মিশনারি স্কুলে পড়ছে। অন্যরা শেরপুরে পড়াশোনা করছে।
লিতার ভাষ্য, করোনার কারণে মার্চের মাঝামাঝি থেকে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কবে নতুন করে তৈরি করা স্কুলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আবার বসতে পারব সেই আশায় রয়েছি। নতুন স্কুলে এসে ওদের মনও ভালো হয়ে যাবে।
১নং কাংসা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনার উল্লাহ আনোয়ার সমকালকে জানান, গারোদের এই স্কুলটি ৭০ বছরের পুরনো। তবে এটার জরাজীর্ণ দশা ছিল। পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ চলতি বছরের শুরুতে শেরপুরে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন। এরপর তিনি ছোট গজনীতে ঘুরতে যান। তার চোখে পড়ে স্কুলটি। এখন তার সহায়তায় স্কুলটি সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে সরকারীকরণ করা জরুরি। সরকারি হলে এখানকার অসচ্ছল গারো পরিবার ও তাদের সন্তানদের নিয়ে পড়াশোনার জন্য পরিচালিত স্কুলটি কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না।
কেন দীর্ঘদিন ধরে স্কুলটি এমন জীর্ণদশায় ছিল, জানতে চাইলে স্থানীয় এ জনপ্রতিনিধি জানান, এটা আদিবাসীদের স্কুল। মিশনারিরা চালাত। সরকারের কোনো অনুদান পৌঁছেনি। আদিবাসী বা মিশন কর্তৃপক্ষও তাদের সমস্যার কথা কাউকে কখনও বলেনি।
স্কুলটি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী চিংবিয়া মানখিনের বাবা ওয়াসিংটন মারাক সমকালকে বলেন, 'স্কুলটি বহুদিন ধরে খুব খারাপ অবস্থায় ছিল। এখন প্রশাসন থেকে ঠিকঠাক করে দেওয়া হচ্ছে।'
শেরপুরের পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, 'শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই পুলিশ মহাপরিদর্শক নিজে স্কুলটির দায়িত্ব নিয়েছেন। শিক্ষকদের প্রতি মাসে অর্থ সহায়তা ছাড়াও শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এলাকার মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিবাবকরা অত্যন্ত খুশি।