চট্টগ্রামে নষ্ট কিটে বিপদ
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২০ | ১৪:৩২
চট্টগ্রামে করোনা পরীক্ষায় নতুন করে বিপদ বাড়াচ্ছে নষ্ট কিট। গত ২ জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ল্যাবে কিট দিয়ে ৮১টি নমুনা পরীক্ষায় সবগুলোর ফলই পজিটিভ আসে। এতে কিটের মান নিয়ে সন্দেহ হয়। এরপর কিটে ত্রুটি আছে উল্লেখ করে এক হাজার কিট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ফেরত পাঠায় চবি কর্তৃপক্ষ। পরদিন নতুন করে আবার ৫০০ কিট আনা হয়। এবারও ৮১টি নমুনা পরীক্ষা করে ৭৮টির ফল পজিটিভ আসে। এতে ওই কিটগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও ফের প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবির মুখে তাই পরের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়েছে। সেই ৮১টি নমুনার মধ্যে পুনঃপরীক্ষার জন্য ২০টি ঢাকার আইইডিসিআর ও ২০টি চট্টগ্রামের বিআইটিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামে হু হু করে রোগী বাড়লেও সেই হারে বাড়ছে না করোনা পরীক্ষার ল্যাব (পরীক্ষাগার)। করোনা উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে আসছেন গড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী। কিন্তু নমুনা নেওয়া যাচ্ছে গড়ে ৪০০ জনের। যেসব নমুনা নেওয়া হচ্ছে সেগুলোর ফল পেতে লেগে যাচ্ছে প্রায় এক সপ্তাহ। গতকাল রোববারও চট্টগ্রামে যে সব রিপোর্ট চূড়ান্ত হয়েছে সেগুলোর কোনো কোনোটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল এক সপ্তাহ আগে।
নষ্ট কিট ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আকতার বলেন, চবি ল্যাবে প্রথমে পাঠানো ১ হাজার কিটে ত্রুটি থাকায় আমরা সেগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ফেরত পাঠিয়েছি। পরে যে ৫০০ কিট এসেছে সেগুলো দিয়ে পরীক্ষার পর ৮১টি নমুনার মধ্যে ৭৮টির ফল পজিটিভ এসেছে। অধিকতর নিশ্চিত হতে এসব নমুনার কিছু পুনঃনিরীক্ষার জন্য আমরা অন্য দুটি ল্যাবে পাঠিয়েছি।
নষ্ট কিট ফেরত নেওয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোস্তফা খালেদ বলেন, চবিতে প্রথমে পাঠানো এক হাজার কিট আমরা ফেরত নিয়েছি। পরে তাদের আবার ৫০০ কিট দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর ফল পুনঃনিরীক্ষা করা হচ্ছে। তাই পরে দেওয়া কিটে, নাকি পরীক্ষায় কোনো সমস্যা আছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
পরীক্ষা করা নমুনার ৯৫ শতাংশ পজিটিভ হওয়ায় বেড়েছে সন্দেহ :জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে যেসব নমুনা পাঠানো হয়েছে তার বেশিরভাগই হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলার। এ দুটি উপজেলায় সংক্রমণ থাকলেও পরীক্ষার ফলে আগে কখনই এত বেশি মাত্রায় পজিটিভ আসেনি। কিন্তু চবি ল্যাবে সংগৃহীত নমুনার প্রথম পরীক্ষায় শতভাগই পজিটিভ এসেছে। দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় পজিটিভ এসেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। এটি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে। কারণ চট্টগ্রামের অন্য যে তিনটি স্থানে প্রতিদিন করোনা পরীক্ষা হচ্ছে সেগুলোতে পজিটিভ আসছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। এ কারণে চবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো কিটের মান নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, চবি ল্যাবে পাঠানো প্রথম এক হাজার কিটের গুণগত মান যে নষ্ট ছিল সেটি প্রমাণিত। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ফেরতও নিয়েছে। কিন্তু পরে যে ৫০০ কিট এলো সেগুলোর পরীক্ষায়ও আসছে অস্বাভাবিক ফল। একটি উপজেলায় সংগৃহীত নমুনার ৯৫ শতাংশ এই মুহূর্তে কোনোভাবেই পজিটিভ হতে পারে না। তাই পরীক্ষার ফল স্থগিত রেখেছে প্রশাসন। পরের চালানে আসা কিটও নষ্ট কিনা তা জানা যাবে পুনঃপরীক্ষার পর।
এক সপ্তাহেও মিলছে না ফল : চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় ৯০ জন। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করা রোগী আছেন শতাধিক। চট্টগ্রাম জেলায় প্রতিদিন গড়ে তিন হাজারেরও বেশি রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে আসছেন করোনা উপসর্গ নিয়ে। কিন্তু গড়ে চারশ'র বেশি নমুনা পরীক্ষা করতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। যেসব নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে সেগুলোর রিপোর্ট দিতে আবার সময় লাগছে প্রায় এক সপ্তাহ। করোনা আক্রান্ত সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী বলেন, 'আমি ও আমার বাবা আবদুল নবী করোনা আক্রান্ত। উপসর্গ থাকায় আমার মা জারিয়া বেগম ও ছোট ভাই লিয়াকত আলীর নমুনা নেওয়া হয় ২ জুন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা নমুনা পরীক্ষার ফল পাননি। কবে নাগাদ পাবেন তাও জানাতে পারছে না প্রশাসন।'
চট্টগ্রামে এখন যে সব নমুনার ফল প্রকাশ করা হচ্ছে সেগুলো পাঁচ থেকে ছয় দিন আগে সংগ্রহ করা। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ কেউ তিন থেকে চার দিনে পরীক্ষার ফল পেলেও সাধারণ মানুষকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে দিনের পর দিন।
নমুনা পরীক্ষায় দেরি হওয়া প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, সংক্রমণের হার যে হারে বাড়ছে সেই হারে ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ করোনা পরীক্ষা করার আগে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়। তিনি জানান, আগামী এক সপ্তাহে নতুন কয়েকটি স্থানে করোনা পরীক্ষা শুরু হবে। তখন রিপোর্ট আরও দ্রুত পাওয়া যাবে।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম
- নষ্ট কিট
- করোনা
- করোনাভাইরাস