একদিকে পলিথিনবিরোধী প্রচার অন্যদিকে কমছে পাট চাষ
সাদুল্লাপুরের কাজীবাড়ি সন্তোলা এলাকার একটি ক্ষেতে পাট কাটছেন কৃষক ফাইল ছবি
শাহজাহান সোহেল, সাদুল্লাপুর (গাইবান্ধা)
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৪ | ২৩:০৭
‘পলিথিনমুক্ত দেশ গড়তে পাট চাষ বাড়াতে হবে। কৃষকদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে চাষে। বিক্রির সময় নিশ্চিত করতে হবে ন্যায্যমূল্য। বন্ধ পাটকলগুলোও চালু করতে হবে। এগুলো করা গেলে সোনালি আঁশের সুদিন ফিরবে। কৃষক লাভবান হলে ফের পাট চাষে ঝুঁকবেন।’ কথাগুলো গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার শ্রেষ্ঠ পাটচাষি প্রদীপ কুমার সরকারের।
উপজেলার হবিবুল্লাপুর গ্রামের এ কৃষকের ভাষ্য, পলিথিনমুক্ত দেশ গড়ার ঘোষণা চাষিদের মধ্যে নতুন স্বপ্ন জাগিয়েছে। এ সিদ্ধান্তে খুশি পাটচাষিরা। যত্রতত্র পলিথিনের ব্যবহার কমলে পাট পণ্যের চাহিদা বাড়বে। তখন ন্যায্যমূল্য পাবেন কৃষক। জমির ধরন ও আবহাওয়া অনুযায়ী এখানকার কিছু এলাকা পাট চাষের জন্য উপযোগী। কিন্তু বিভিন্ন কারণে কৃষক এ ফসলের আবাদ করেন কম।
সরকারের পলিথিনবিরোধী নীতি ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রচারের পরও বিপরীত চিত্র সাদুল্লাপুরে। কৃষি বিভাগ বলছে, প্রতিবছর এখানে সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ সম্ভব। তবে কৃষক অন্য ফসলের আবদ করেন বেশি। তাদের দাবি, পাটের চেয়ে অন্য ফসলে লাভ বেশি। চলতি মৌসুমে এখানে পাটের আবাদ হয়েছে ৫৫০ হেক্টর জমিতে। অথচ ২০১৫-১৬ মৌসুমে ছিল ৯৯০ হেক্টরে। ৯ বছরে কমেছে ৪৪০ হেক্টর। ইসলামপুর গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, পাটচাষিদের প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এ অবস্থা হয়েছে।
উপজেলার অনেক জমিতে পাটসহ বছরে তিন ফসল ফলানো যাবে বলে জানান অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া। তিনি বলেন, বোরো ধানের চারা রোপণ করতে হবে যথাসময়। ধান কাটার পর পাট চাষ করা যায়। আবার এ ফসল কেটে রোপণ করা যাবে আমন ধান। রবি ভুট্টা কাটার পরও পাট চাষ করা যায়। এ জন্য আধুনিক কৃষির বার্ষিক চাষাবাদ সূচি মানতে হবে। তবে অনেক কৃষক এটি করতে চান না। তারা দুই ফসল ফলিয়ে জমি ফেলে রাখেন। এতে লভ্যাংশ কমে।
সাদুল্লাপুরে পর্যাপ্ত পাটবীজ ও পচানোর পানি সংকট রয়েছে। মৌসুমে স্থানীয় খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় সমস্যা দেখা দেয় বলে জানান উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুর রব সরকার। কাজীবাড়ি সন্তোলা গ্রামের কৃষক লাল মিয়া বলেন, চাষিদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত বীজ ও সার সরবরাহ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকের কাছ থেকে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার টাকায় কিনতে হবে। এসব নিশ্চিত করা গেলে কৃষক চাষে আগ্রহী হবেন।
মৌসুমে ছয় থেকে সাত হাজার কেজি বীজের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় তিন হাজার কেজি। বাকি বীজ কেনেন কৃষক। এ তথ্য জানিয়ে পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা মিথুন কুমার সরকার বলেন, এখানে প্রায় ৮ হাজার পাটচাষির মধ্যে প্রকল্পভুক্ত তিন হাজার। মৌসুমে ৭৫ জন বীজ উৎপাদনকারী এবং ১৫০ জন পাটচাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পভুক্ত কৃষকদের দেওয়া হয় বিনামূল্যে ১ কেজি বীজ, ১২ কেজি সার এবং কীটনাশক।
যদিও ২০২৩-২৪ মৌসুমে উপজেলার সেরা পাটবীজ উৎপাদনকারী সামছুল আলমের অভিযোগ, বীজের যথার্থ মূল্য দেয় না সরকার। তাই কৃষক উৎপাদন করতে চান না। সে জন্য পাট চাষ কমছে জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষকের কাছ থেকে সরকার প্রতি কেজি বীজ কেনে ২২০ টাকায়। এতে লোকসান হয়। ক্রয়মূল্য ৫০০ টাকা দিলে তারা লাভবান হবেন। এতে বীজ উৎপাদন ও পাট চাষ বাড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিউল আলম বলেন, অর্থকারী ফসল পাটের রোগবালাই কম। অনেক কৃষক এটি বুঝতে চান না। যে ফসলে বেশি লাভ, কৃষক সেগুলো ফলাতে চান। পলিথিনমুক্ত দেশ গড়তে পাটের বিকল্প নেই। সর্বত্র অধিক হারে পাটপণ্যের ব্যবহারে কমবে পলিথিনের চাহিদা।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জেনেও পলিথিনের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে বলে জানান শহরের কনফেকশনারি ব্যবসায়ী এনায়েতুল মোস্তাফিজ রাসেল। তিনি বলেন, ক্ষতিকর জেনেও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনের যথাযত প্রয়োগ নেই। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ সহজলভ্য করতে হবে। কারণ স্বল্পমূল্যের পলিথিন ব্যাগে পণ্য দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বিক্রেতারা।
উপজেলা কৃষি উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ইউএনও কাওছার হাবিব বলেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে পলিথিনবিরোধী অভিযান শুরু হবে। এ-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে পালন করবেন তারা। সে লক্ষ্যে এখন থেকে প্রচার চালানো হচ্ছে। পলিথিনের ক্ষতিকর দিক জনসমক্ষে তুলে ধরা হচ্ছে। যেভাবেই হোক পলিথিনমুক্ত সমাজ গড়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।
- বিষয় :
- পাট খাত
