ক্ষুদিরামের ছেলে সুমন দেশ ছাড়বেন না
রাজীব নূর, ভোলা থেকে ফিরে
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০৯
পুকুরটি খুব চেনা লাগছিল। তবে ১৮ বছর আগের স্মৃতির ওপর ভরসা করা কঠিন। তা
ছাড়া গ্রামের বাড়ির সর্বত্রই এমন পুকুর থাকে। কাজেই এটাই প্রিয়বালাদের
বাড়ি- এমনটা নিশ্চিত হওয়া কঠিন হলো। পুকুরপাড়ের অদূরবর্তী ঘর থেকে বেরিয়ে
এলেন মধ্যবয়স্ক এক লোক। জানতে চাইলে বললেন, তার নাম আলী আহমদ। চরফ্যাসন
উপজেলার চর মাদ্রাজে ছিল তাদের বাড়ি। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখানে এসে
মনপুরার চৌধুরীদের 'ওরকাইত' হয়েছেন। ওরকাইত মানে আশ্রিত, অনেকটা আগেকার
দিনের জমিদার ও রায়তের মতো। আলী আহমদের সঙ্গে আলাপে ধারণা হলো, ভোলার
চরফ্যাসন উপজেলার এই বাড়িতেই ছেলে সুধীর দাস ও ছেলের বউ আলো রানীকে নিয়ে
থাকতেন প্রিয়বালা দাসী। অবশ্য এত কিছু জানেন না আহমদ। এমনকি তার আশ্রয়দাতার
নামটিও ঠিকঠাক বলতে পারলেন না। তবে শুনেছেন, এই বাড়িতে আগে হিন্দুরা বাস
করত এবং ওই হিন্দুদের একজন মহিলা খুন হয়েছিলেন। অবশ্য পরে পাশের বাড়ির
মাইনুদ্দিনের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল, এটাই প্রিয়বালার বাড়ি। তিনি
জানান, বাড়িটি কিনেছেন মনপুরার হেলাল চৌধুরী। তবে বিক্রি করে দেওয়ার পরও
বছরচারেক এখানেই ছিলেন সুধীররা।
দাসকান্দি নামের এই গ্রামটি ২০০১ সালে ছিল জিন্নাহগড় ইউনিয়নের ৫ নম্বর
ওয়ার্ড। বর্তমানে গ্রামটি চরফ্যাসন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।
পৌরসভা হওয়ার পর রাস্তাটি পাকা হয়েছে। তবে এখনও এখানে প্রকৃতি সেই আগের মতো
সবুজ রয়েছে। পাকা রাস্তার দু'ধারে ধানি জমি। ১৮ বছর আগে যেমন যেতে হতো,
এখনও তেমনই ধানক্ষেতের আল ধরে যেতে হয় প্রিয়বালাদের বাড়িতে। ঝকঝকে নিকানো
ওই বাড়িটার চেহারা আগের মতো নেই; হয়েছে পোড়োবাড়ির মতো।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রকাশ্যে নৌকার পক্ষে ছিলেন সুধীর। তাই
আগে থেকেই হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছিল তাকে। তখনই পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার
প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা। কিন্তু চলে যাওয়ার আগেই খুন হলেন প্রিয়বালা।
নির্বাচনোত্তর ওই সহিংসতার খবর গণমাধ্যমে প্রথম আসে ২৩ অক্টোবর। ওই সময়ের
খবরের কাগজের বর্ণনানুযায়ী, '৫ অক্টোবর রাতে সুধীরকে খুঁজতে আসার নাম করে
দুর্বৃত্তরা তাদের বাড়িতে ঢুকে লুটপাট শুরু করে। সুধীর তখন বাড়িতে ছিলেন
না। প্রিয়বালা সাহায্যের আবেদন জানিয়ে চিৎকার করলে বিছানার চাদর গুঁজে
দেওয়া হয় তার মুখে। সেই যে জ্ঞান হারান, আর জ্ঞান ফেরেনি তার। এর তিন দিন
পর মারা যান তিনি। আলো রানীকে নিয়েও টানাহেঁচড়া শুরু করেছিল ওরা।
দুর্বৃত্তদের হাতে পরনের শাড়ি রেখে দৌড়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন আলো।
প্রিয়বালার মৃত্যুতে চরফ্যাসন থানায় 'অপরাধজনিত নরহত্যা' বলে একটি মামলা
দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি তখন এবং শেষপর্যন্ত এটি
যে একটি নরহত্যা- তাও প্রমাণ করা যায়নি। এ ক্ষেত্রে হত্যাকারীদের দোসরের
ভূমিকা পালন করেছিলেন চরফ্যাসন উপজেলা হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তাররা। এখন ওই
ডাক্তারদের কে কোথায় আছেন জানা গেল না। তবে এতকাল পরও স্পষ্ট মনে পড়ছে, তখন
ডাক্তারদের একজন আমাদের বলছিলেন, 'যেহেতু ঘটনার পরপরই প্রিয়বালার মৃত্যু
হয়নি, তাই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে- এমনটা বলা যাবে না। তবে ওই
ঘটনায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ায় তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে।'
ওই ডাক্তারই ক্ষুদিরাম রায়ের হত্যাকারীদের রক্ষাকবচ হয়েছিলেন। প্রিয়বালাকে
হাসপাতালে ভর্তি করা না হলেও ক্ষুদিরামকে ভর্তি করা হয়েছিল। ডাক্তার তখন
ভাষ্য দিয়েছিলেন, 'হাসপাতালে ক্ষুদিরাম সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কাজেই
মারধরজনিত আঘাতের সঙ্গে তার মৃত্যুকে যুক্ত করে ভাবা ঠিক হবে না।'
প্রমত্তা মেঘনার ভাঙনে পৈতৃক ঘরবাড়ি হারিয়ে ক্ষুদিরামরা তিন ভাই ভোলার
দৌলতখান থেকে চরফ্যাসন এলাকায় এসে ডেরা বেঁধেছিলেন। সেটা ১৯৮৫ সালের ঘটনা।
ক্ষুদিরাম রিকশা-ভ্যান বানানো শিখে চরফ্যাসনে ছোট্ট একটা কারখানা গড়ে
তুলেছিলেন। থাকতেন কাছেই প্রগতিপাড়ায়। ক্ষুদিরাম সরাসরি আওয়ামী লীগের
রাজনীতি করতেন। ১ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে তার গ্যারেজে প্রতিদিনই
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো হতো। নির্বাচনের দু'দিন পর কিছু লোক এসে ২০ হাজার
টাকা চাঁদা দাবি করলে ভীতসন্ত্রস্ত ক্ষুদিরাম কয়েকদিন কারখানা বন্ধ রাখেন।
বাজার কমিটির আশ্বাসে ৯ অক্টোবর কারখানা খোলেন। ওই দিনই সন্ধ্যাবেলা তাকে
প্রচ মারধর করা হয়। চরফ্যাসন হাসপাতালে ১৭ অক্টোবর মারা যান তিনি।
প্রিয়বালার স্বজনদের কাউকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও ক্ষুদিরামের ছেলে সুমন
রায়কে পাওয়া গেল চরফ্যাসন বাজারে। ক্ষুদিরামের মৃত্যুর সময় সুমনের বয়স ছিল
মাত্র ৯ বছর। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সুমন এখন পরিপূর্ণ যুবক। দায়িত্ব
নিয়েছেন সংসারের। কয়েক বছর আগে সুমনের বড় বোন পলি রায়ের বিয়ে হয়েছে। সুমন
জানান, কাকার সহযোগিতায় বিএ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। ২০১৩ সালে
চরফ্যাসন পৌরসভায় বাজার আদায়কারীর পদে চাকরি পেয়েছেন। সুমন বলেন, 'এ জন্য
মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই।' মন্ত্রী মহোদয় বলতে সুমন
স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং সাবেক পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম
জ্যাকবের কথা বুঝিয়েছেন। সুমন জানান, বিভিন্ন সময় তাদের আর্থিক সহায়তাও
করেছেন জ্যাকব। তার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে সাহায্য ও সমর্থন জুগিয়ে যাওয়ায়
কৃতজ্ঞতা জানালেন পৌর মেয়রের কাছেও।
প্রিয়বালার পরিবারের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না- জানাতেই সুমন অত্যন্ত
দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, 'যার যেখানে ইচ্ছে চলে যাক। যত যাই হোক, আমি দেশ ছেড়ে
যাব না। এটাই আমার বাবার ইচ্ছে ছিল। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা বেঁচে থাকতেও
সংসারে অনটন ছিল। সংসার চালাতে কষ্ট হলেও মা-বাবা একটু একটু করে পয়সা জমিয়ে
চরফ্যাসনে এক টুকরো জমি কিনেছিলেন, এখানে স্থায়ী হবেন বলে।'
বাবার রেখে যাওয়া জমিতে বাড়ি করার স্বপ্ন সুমনের। তবে সেই সামর্থ্য অর্জন
পর্যন্ত যদি তার মা বেঁচে না থাকেন। তার মা মঞ্জু রানীর পুরো জীবনই কেটেছে
ভাড়া বাড়িতে। সুমন বলেন, 'চরফ্যাসন পৌরসভার কাছে একটি ঘর করার জন্য
সাহায্যের আবেদন করেছিলাম। কোনো সাহায্য পাব কি-না জানি না!'
সুমনের আবেদন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে চরফ্যাসনের পৌর মেয়র বাদল কৃষ্ণ
দেবনাথ বলেন, 'ক্ষুদিরামের পরিবারকে একটা ঘর করে দিতে পারলে খুব ভালো হতো।'
জমি আছে, ঘর নেই; এমন মানুষদের ঘর করে দেওয়ার মতো কোনো তহবিল পাওয়া গেলে
সবার আগে ক্ষুদিরামের ছেলে সুমনের আবেদনকেই বিবেচনা করবেন বলে জানালেন
মেয়র।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন চরফ্যাসন প্রতিনিধি নোমান সিকদার ও লালমোহন প্রতিনিধি আনোয়ার রাব্বী
- বিষয় :
- অক্টোবরের স্মৃতি