ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিষ্ঠিত তিন সন্তানের সংসারে হয়নি ঠাঁই

বৃদ্ধ বাবার বনবাস

তিন দিন পর উদ্ধার করে পুলিশ

বৃদ্ধ বাবার বনবাস
×

উদ্ধারের পর সাকিব আলী সরদার

 গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০০:৩৮ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০৫:২৯

বয়সের ভারে ন্যুব্জ সাকিব আলী সরদারের শরীরে আগেই বাসা বেঁধেছিল নানা রোগ। বনের ভেতর পড়ে থাকায় রোগাক্রান্ত সেই শরীরে বসতি হয় পোকামাকড়ের। গায়ে ছিল না শীতের কাপড়। রাতে কুয়াশায় ভিজে যেত শরীর। শিয়ালের বিরামহীন হুক্কাহুয়া ডাকের হুমকি আর পোকামাড়কের আক্রমণ নিয়েই অবিশ্বাস্যভাবে তিন দিন টিকে ছিলেন এই বৃদ্ধ। নিজের মেয়ে তাঁকে বনে রেখে গেছেন। তাঁর কষ্টে হয়তো সন্তানদের আনন্দ। তাই মরে গিয়ে তাদের কষ্ট দিতে চান না। গত বুধবার গজারি বন থেকে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে।  

জানা যায়, নিজের যা সম্বল ছিল, সাকিব আলী তার সবটুকুই তিন সন্তানের নামে লিখে দিয়েছেন। তাঁকে গাজীপুরের হোতাপাড়ার মণিপুর এলাকার বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যেতে চেয়েছিলেন ছোট মেয়ে রুবি আক্তার ও তাঁর স্বামী। অসুস্থ থাকায় বৃদ্ধাশ্রম তাঁকে নেয়নি। ফেরার পথে হোতাপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে পশ্চিম দিকে গজারি বনের ভেতর বৃদ্ধ সাকিব আলীকে রেখে যান তাঁর আদারের ছোট মেয়ে। সেখানেই তিনি তিন দিন কাটান। পরে জয়দেবপুর থানা পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। গতকাল শুক্রবার ওই হাসপাতালের অষ্টম তলায় সার্জারি বিভাগের ফ্লোরে চিকিৎসাধীন সাকিব আলীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, এখন বেশ ভালো আছেন।

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার চরডিপুর গ্রামের প্রয়াত আব্দুর রশিদের ছেলে সাকিব আলী সরদার কর্মজীবনে ছিলেন গাড়িচালক। স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। ছেলেমেয়েরাও সংসার পেতেছেন। বয়স বাড়লে সাকিব আলী অক্ষম হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে সন্তানরা জমিজিরাত নিজেদের নামে লিখে নিলে শুরু হয় অবহেলা। রাজধানীর বাড্ডায় ছোট মেয়ের বাসায় ঠাঁই হয় সাকিব আলী ও তাঁর স্ত্রী মর্জিনা বেগমের। সময় যত গড়াচ্ছিল, সাকিব ততই বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। একসময় সন্তানরা তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। ২ ডিসেম্বর সাকিব আলীকে গাজীপুরের মণিপুর এলাকার বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসেন মেয়ে ও তাঁর স্বামী। কিন্তু কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। 

গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার ওসি আব্দুল হালিম বলেন, বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফেরার পথে বাবাকে মেয়ে আর জামাই গজারি বনের ভেতর ফেলে রেখে চলে যান। সেখানেই তাঁর দুর্বিষহ সময় কাটছিল। শরীরের পোকামাকড় বাসা বাঁধে। প্রস্রাবের রাস্তায় ক্যানুলা লাগানো অবস্থায় বনের ভেতর পড়ে থাকা সাকিব আলী সম্পর্কে গত বুধবার সকালে স্থানীয়রা আমাদের জানান। দ্রুত সময়ে তাঁকে আমরা উদ্ধার করে গোসল করিয়ে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরাই। পরে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিই। সাকিব আলী এখন আগের চেয়ে ভালো আছেন।

ওসি বলেন, জঙ্গলে বৃদ্ধের পড়ে থাকার খবর পেয়ে তিনি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোবারক হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জনবল না থাকা এবং তহবিল (বাজেট) না থাকায় তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয় বলেও তাঁকে জানান। কিন্তু পরে তারাই সাকিব আলীর দায়িত্ব নিয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সাকিব আলী সরদারের তিন ছেলেমেয়ের প্রত্যেকেই প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে ববি আক্তার থাকেন কুমিল্লায়। ছেলে মহসিন সরদারও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বাবার সব সম্পত্তি লিখে নিয়ে তারা আর ভরণপোষণ করছিলেন না। ছোট মেয়ে রুবির বাড্ডার বাসায় থাকতেন তিনি। শেষ পর্যন্ত রুবিও আর বাবাকে ঠাঁই দিচ্ছিলেন না; তাঁকে বনে ফেলে গেলেন।

ওসি আব্দুল হালিম বলেন, গজারি বনে বৃদ্ধকে অনেক নোংরা অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর শরীরে মলমূত্র লেগে ছিল; প্রস্রাবের রাস্তায় ক্যানুলা লাগানো ছিল। শুক্রবারও তিনি সাকিব আলী সরদারকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

×