ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ছে প্রাণহানি

চট্টগ্রামে চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ছে প্রাণহানি
×

চট্টগ্রামে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিলছে না চিকিৎসা। সোমবারের ছবি -মো. রাশেদ

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২০ | ১৫:১০

পেটে অনাগত শিশু। সাত দিন পর পৃথিবীর মুখ দেখার কথা তার। এরই মধ্যে প্রসূতির শুরু হয় প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। চিকিৎসা পেতে ওই অবস্থাতেই তাকে ছুটতে হয় একের পর এক বিভিন্ন হাসপাতালে। ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা চেষ্টা করেও চট্টগ্রামের কোনো হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যা পাননি তিনি। এরই মধ্যে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে তার। গভীর রাতে পেটের বাচ্চাকে নিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান মুক্তা (৩০) নামের সেই প্রসূতি!

একইভাবে বুকে ব্যথা নিয়ে কয়েকটি হাসপাতালে গিয়েও চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যু হয় শফিউল আলম ছগীরের (৫৭)। অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যু ঘটে করোনায় আক্রান্ত ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ শাহ আলমের (৪৮)। এমন প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামবাসী কভিড ও নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গতকাল সোমবার হাইকোর্টে রিট করেন দুই সিনিয়র আইনজীবী।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হলেও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে চিকিৎসার অভাবে অনেকেরই মৃত্যু ঘটছে এখন। যদিও এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো দপ্তরে। তবে একের পর এক কঠোর নির্দেশনার পরও বশ মানছে না চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালগুলো। প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য এসব হাসপাতালে গিয়ে কাকুতিমিনতি করেও চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। ভর্তি হতে পারছেন না হাসপাতালে। পাচ্ছেন না আইসিইউ কিংবা অক্সিজেন সাপোর্ট। নানা অজুহাত দেখিয়ে কভিড ও নন-কভিড সব রোগীকেই চিকিৎসা না দিয়েই ফিরিয়ে দিচ্ছে হাসপাতালগুলো।

চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের দেড় হাজারের বেশি শয্যার বেশির ভাগ প্রতিদিন রোগীশূন্য থাকলেও মুমূর্ষু রোগীরাও পারছেন না ভর্তি হতে। সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ৩০টি পর্যন্ত আইসিইউ শয্যার সুবিধা আছে এসব হাসপাতালে। কিন্তু জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ না পেয়ে অনেকে চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে। বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইসিইউ ও সাধারণ শয্যা না দিয়ে নানা অজুহাত দেখিয়ে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার প্রমাণও পেয়েছে প্রশাসন। কিন্তু নেওয়া হচ্ছে না কোনো কঠোর ব্যবস্থা।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কভিড ও নন-কভিড রোগীদের দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশনা চেয়ে গতকাল সোমবার হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী মো. সাইফুল ইসলাম ও মো. আজিজুল হক। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জে বি এম হাসান চট্টগ্রাম নগরের ১২টি বেসরকারি হাসপাতালকে দ্রুত করোনায় আক্রান্ত রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়ার আদেশ দেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও মেডিকেল কলেজগুলোতে কতজন করোনা রোগীকে কী কী চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে, তা জানিয়ে ২২ জুনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনকে। পিটিশনারদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাকির উদ্দিন ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্র নাথ।

যা বললেন সংশ্নিষ্টরা : সার্ভেইল্যান্স টিমের আহ্বায়ক চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, 'বার বার নির্দেশনা দেওয়ার পরও বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে না। এর বেশ কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। এদের এমন আচরণে আমরা বিব্রত। বেসরকারি হাসপাতাল সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করলেও তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাচ্ছি না।'

করোনা মোকাবিলায় গঠিত বিভাগীয় কমিটির সমন্বয়কারী ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান সমকালকে বলেন, 'চট্টগ্রামে প্রতিদিনই চিকিৎসা না পেয়ে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। করোনায় আক্রান্তের চেয়ে চিকিৎসাবিহীন মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। ব্যবসা হারানোর ভয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো আইসিইউসহ সাধারণ শয্যা খালি থাকলেও রোগীদের ভর্তি করছে না। নির্দেশনার পরও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা রোগী ভর্তিতে এখনও অনীহা দেখাচ্ছে।'

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র ডেপুটি গভর্নর আমিনুল হক বাবু বলেন, 'চিকিৎসা না দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।' ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এসএম নাজের হোসাইন বলেন, 'করোনার এমন বিপদের সময়েও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর নেতিবাচক ভূমিকায় আমরা হতবাক।'

স্বজনহারাদের আর্তনাদ : করুণভাবে মৃত প্রসূতি মুক্তার ভাই সোলাইমান বলেন, '১০ মাসের অন্তঃসত্ত্বা জেনেও কোনো হাসপাতাল আমার বোনকে ভর্তি নেয়নি। কেউ দেননি আইসিইউ সেবা। চোখের সামনে বোনের অবস্থার অবনতি হতে থাকলে হাসপাতাল সংশ্নিষ্টদের এক ঘণ্টার জন্য হলেও তাকে একটা আইসিইউতে রাখার কাকুতিমিনতি করি। সিজারের মাধ্যমে বাচ্চা ডেলিভারি করিয়ে মুক্তার শ্বাসকষ্ট কমানোর চেষ্টাও করতে বলি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।'

শাহ আলমের ভাইয়ের ছেলে আশরাফ শোভন বলেন, 'শ্বাসকষ্ট তীব্র হওয়ায় চাচার আইসিইউ জরুরি হয়ে পড়ে। চারদিন ধরে বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটি করেও কোথাও আইসিইউ মেলেনি। অনেক কষ্টে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করলেও সেখানে কোনো অক্সিজেন পাইনি।'

ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহেদ ইকবাল বলেন, 'আওয়ামী লীগ নেতা শফিউল আলম ছগীর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন। ছিল না কোনো উপসর্গও। চারটি হাসপাতালে গিয়েও তাকে ভর্তি করানো যায়নি। একসময় গাড়িতেই মারা যান তিনি।'

আরও পড়ুন

×