বিপর্যস্ত কর্ণফুলী
প্রজনন স্থানেই হুমকিতে গাঙ্গেয় ডলফিন
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০০
'চট্টগ্রামের প্রাণ'খ্যাত কর্ণফুলী নানামুখী দূষণে বিপর্যস্ত। চট্টগ্রাম
বন্দরে আসা জাহাজ থেকে প্রতিনিয়ত তেল পড়া, কর্ণফুলীকে ঘিরে নেওয়া একের পর
এক উন্নয়ন প্রকল্প, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিভিন্ন কলকারখানার
রাসায়নিক দূষণ ও নগরীর পাঁচ হাজার টন বর্জ্য প্রতিদিন নষ্ট করছে এ নদীর
জীববৈচিত্র্য। সবচেয়ে বেশি হুমকিতে আছে 'গ্যাঞ্জেস ডলফিন' বা গাঙ্গেয়
ডলফিন। কর্ণফুলীতেই আছে এ ডলফিনের প্রজনন ক্ষেত্র। এখানে প্রজনন শেষে এ
ডলফিন বিচরণ করে হালদা ও সাঙ্গু নদীতে। কিন্তু নদী দূষণের কারণে এখন
বিপন্নের পথে এ প্রাণী।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এরই মধ্যে গাঙ্গেয়
ডলফিনকে রেখেছে লাল তালিকায়। নদী রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি
মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করলেও সেটির কাজ শুরু হয়নি এখনও। আবার নদীর নাব্য
বাড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প শুরু করলেও মাঝপথে বন্ধ
হয়ে গেছে তাও।
পরিবেশ অধিদপ্তরও তাদের জরিপে কর্ণফুলী দূষণের ভয়াবহ চিত্র পেয়েছে। ইটিপি
বাস্তবায়ন না করে ১১টি প্রতিষ্ঠান কীভাবে আটটি পয়েন্ট দিয়ে কর্ণফুলীকে দূষণ
করছে তা আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের এ প্রতিবেদনে। আবার চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা বলছে, কর্ণফুলীকে ঘিরে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্প
বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ডলফিনের প্রজনন স্থান। এসব প্রকল্প
বাস্তবায়নের আগে তাই আটটি বিষয়ে নজর রাখতে বলছেন তারা। অন্যথায় চট্টগ্রামের
প্রধান এ নদী তার জীববৈচিত্র্য হারাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। এ
গবেষক দলে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ
বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম, পরিবেশ ও বনবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমিন এবং মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের
অধ্যাপক আয়েশা আক্তার।
গবেষকরা বলছেন, একটি পুরুষ গাঙ্গেয় ডলফিন দুই দশমিক ১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা
হয়। পুরুষের চেয়ে নারী ডলফিন কিছুটা বড় হয়। দেখতে ধূসর রঙের। নাসিকাসহ
মুখটি লম্বাটে ধরনের। পেটের দিকটি গোলাকৃতির। এই প্রজাতির ডলফিন ২৫ থেকে ৩০
বছর পর্যন্ত বাঁচে। তবে এদের জন্মহার কম।
কর্ণফুলীর মোহনা থেকে ৪৩ কিলোমিটারকে চারটি জোনে ভাগ করে গবেষণাটি পরিচালনা
করা হয়। জোন চারটি হলো মোহনা থেকে নেভি এরিয়া, চট্টগ্রাম বন্দরের
নিম্নসীমা থেকে উচ্চসীমা অর্থাৎ বাংলাবাজার এলাকা, বাংলাবাজার থেকে শাহ
আমানত ব্রিজ ও শিকলবাহা খাল এবং শিকলবাহা খাল থেকে কালুর ঘাট ব্রিজ
পর্যন্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মোহনা থেকে শাহ আমানত ব্রিজ
পর্যন্ত এলাকায়। নদীর নিম্নাংশে বালুতট, বিভিন্ন উপনদী, খাল এবং অন্য নদীর
সঙ্গে সঙ্গমস্থল থাকার কারণে চারটি জোনেই বিচরণ দেখা গেছে ডলফিনের।
জোন ১-এ সর্বোচ্চ ৪০১ বার এবং জোন চার-এ সর্বনিম্ন ২৬ বার ডলফিন দেখে গবেষক
দল। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়।
এ সময় মোট ৯২০ বার ডলফিন দেখার রেকর্ড লিপিবদ্ধ করেন তারা। নতুন
নির্মিতব্য কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল জেটি নির্মাণে প্রকল্প এলাকায়
জেনেটিক রিভার ডলফিন, পানিতে থাকা বিভিন্ন প্রাণী এবং মাছের ওপর কোনো ধরনের
প্রভাব পড়বে কি-না তা যাচাইয়ের জন্য গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
কর্ণফুলীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আটটি সুপারিশ করেছিলেন গবেষকরা। এসব
সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন করা যায়নি চূড়ান্তভাবে। উল্টো চট্টগ্রাম বন্দরে
আসা জাহাজ একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দূষিত তেল নিঃসরণ করছে কর্ণফুলীতে।
সর্বশেষ গত শুক্রবারও বন্দরে আসা দুই জাহাজের সংঘর্ষে কর্ণফুলীতে পড়ে গেছে
আট টনেরও বেশি তেল। অথচ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের করা আট
সুপারিশের মধ্যে সর্বপ্রথম ছিল নদীতে বিভিন্ন আবর্জনা, রাসায়নিক পদার্থ,
তেল ইত্যাদি নিঃসরণে কঠিন নিষেধজ্ঞা আরোপ করা। এছাড়া নদীতে বন্দরের অপারেশন
কাজের সময় সৃষ্ট শব্দদূষণ এবং নদীতে চলতে থাকা নৌযানের শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ
করা। নদীর পাড়ে থাকা বিভিন্ন কলকারখানার দূষিত বর্জ্য নদীতে আসতে না
দেওয়া। ডলফিনগুলোর জন্য একটি এলাকা নিয়ে জোন করা। ওই জোনে মাছ ধরা বন্ধ
করা। শুস্ক মৌসুমে নদীর উপরের শাখা নদী এবং অন্যান্য খালের বাঁধ অপসারণ করে
পানির প্রবাহ ঠিক রাখা। অভয়ারণ্য এবং ওয়াচ টাওয়ারের দর্শনার্থীদের আনন্দ
দেওয়া। সংরক্ষণের জন্য সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গঠন করতে হবে
মনিটরিং সেলও।
কর্ণফুলী নদী নিয়ে গবেষণা করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও
বনবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, ডলফিনের জন্য
স্বতন্ত্র একটি জোন করাসহ কর্ণফুলীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কিছু সুপারিশ
করেছি আমরা। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দখল, দূষণ ও উন্নয়নের মাঝেও কিছুটা নিরাপদ
থাকবে চট্টগ্রামের প্রধান এই নদী।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সংযুক্তা
দাশগুপ্ত বলেন, বন্দরে আসা বিভিন্ন জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ে দূষণ বাড়াচ্ছে
নদীর। গত শুক্রবারও দুটি জাহাজের সংঘর্ষে আট টনেরও বেশি তেল ছড়িয়ে পড়ে
কর্ণফুলীতে। এজন্য সংশ্নিষ্ট জাহাজকে তিন কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
টাকা পেলেও নদীর যা ক্ষতি হওয়ার তাতো হয়েই গেছে।
- বিষয় :
- বিপর্যস্ত কর্ণফুলী