ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সেই অক্টোবরের স্মৃতি (৪)

হীরালালের শেষ ইচ্ছে

হীরালালের শেষ ইচ্ছে
×

রাজীব নূর, ভোলা থেকে ফিরে

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০১

পড়াতেন ভূগোল। কিন্তু ভূ-পর্যটনের সুযোগ হয়নি তার। তবে ছেড়ে যাওয়ার আগে এবার দেশটা ভালো করে ঘুরে দেখতে চান হীরালাল ভৌমিক। ভোলার লালমোহন উপজেলার পিয়ারীমোহন গ্রামের সম্পন্ন গৃহস্থ এই মানুষটি শিক্ষকতা করেছেন তার বাপ-কাকাদের প্রতিষ্ঠিত রায়চাঁদ উদয়চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।

পিয়ারীমোহন থেকে রাজনারায়ণের দূরত্ব আধা কিলোমিটারেরও কম হবে। রাজনারায়ণ গ্রামটি পড়েছে রমাগঞ্জ ইউনিয়নে। পিয়ারীমোহন লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের একটি গ্রাম। এলাকাবাসীর সুবিধা হবে বলে কেবলকৃষ্ণ, রামেশ্বর, গৌরহরি ও রাজনারায়ণ- এই চার ভাই মিলে তাদের বাবা উদয়চন্দ্রের নামে গড়া স্কুলটি বাড়ি থেকে একটু দূরে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটা গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের কথা। হীরালাল এই চার ভাইয়ের একজন রামেশ্বর ভৌমিকের ছেলে। তিনি জানান, এলাকার প্রায় সবটুকু জুড়েই ছিল উদয়চন্দ্রদের জায়গাজমি।

প্রায় ২০০ বছর আগে লর্ডহার্ডিঞ্জে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন উদয়চন্দ্রের পূর্বপুরুষরা। এর আগে তাদের বাস ছিল নোয়াখালীর কোনো এক এলাকায়। তবে নোয়াখালীর কোথায় ছিল তাদের আদি নিবাস সে সম্পর্কে জানা নেই হীরালালের। তিনি বলেন, 'আমার ঠাকুরদা (পিতামহ) উদয়চন্দ্রের বাপ-ঠাকুরদারা এসে এখানে আবাদ করেছিলেন। তখন মেঘনার এই তীরে জেগে ওঠা চর ছিল জঙ্গলাকীর্ণ।'

অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভায় শোভিত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাচীন গাঙ্গেয় দ্বীপ ভোলা জেলার মাঝামাঝি এলাকায় লালমোহনের অবস্থান। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবিধৌত এ অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে পলি জমে জমে জেগে ওঠে দ্বীপটি। ভোলা জেলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯১৯ সালে লালমোহন থানা গঠিত হয়। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৩ সালে লালমোহন থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। লালমোহন উপজেলায় একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়ন রয়েছে। এই নয়টির একটি লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে সত্তরের নির্বাচনের সময় হিন্দু ভোটারের সংখ্যা ৬০ শতাংশের বেশি ছিল বলে জানান হীরালাল ভৌমিক। তিনি বলেন, '১৯৭১ সালে লর্ডহার্ডিঞ্জ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল নিরাপদ আশ্রয়। দুর্গমতার কারণে এখানে পাকিস্তানি বাহিনী আসতে সাহস পায়নি। স্বাধীনতার পর কয়েক বছর খুব ভালো ছিলাম আমরা। ৬০ শতাংশ থেকে কমে হিন্দুর সংখ্যা হয়েছে ছয় থেকে সাত শতাংশ।'

১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো বড় দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছিল। হীরালাল বলেন, তখনও ভয় পাননি তিনি। ততদিনে এলাকাজুড়ে তার অনেক ছাত্রছাত্রী। বাপ-কাকাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রায়চাঁদ উদয়চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৯৭৫ সালে শিক্ষকতা শুরু করেন হীরালাল। শুরুতে কোনো বেতন নিতেন না। পরে সরকারি বরাদ্দ থেকে পাওয়া বেতনের অংশটুকুই নিতেন শুধু। বললেন, 'অবসর নেওয়ার আগে আমার সর্বশেষ বেতন ছিল ৯ হাজার ২০০ টাকা।'

দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে ২০০৭ সালে অবসর নিয়েছেন। তিনি বলেন, 'স্কুলশিক্ষকদের তো সব বিষয়ই পড়াতে হয়। আমি মূলত ভূগোল পড়িয়েছি। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব আমার প্রিয় বিষয়। ঐতিহাসিক নিদর্শন ঘুরে দেখতে ভালোবাসি। যতবার ঢাকায় গিয়েছি, ততবারই লালবাগ কেল্লায় ঘুরে এসেছি।'

'বাংলাদেশটাই ঘুরে দেখা হলো না'- এ আক্ষেপ হীরালালের। বয়স হয়েছে ৭৮। তবু একবার কক্সবাজার যেতে চান। পার্বত্য চট্টগ্রামে যাওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। দেশ থেকে মন উঠে যেতে শুরু করেছে ১৯৯২ সাল থেকে। ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত বাবরি মসজিদে হামলা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভোলাজুড়ে হিন্দুরা ব্যাপক তাণ্ডবের মধ্যে পড়ে। লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে অনেক বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল, সে বারের ওই সহিংসতা লর্ডহার্ডিঞ্জের মানুষের কাছে 'ঘরপোড়া দাঙ্গা' নামে পরিচিত।

হীরালাল ভৌমিক জানান, তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তার স্ত্রী এখানে-ওখানে পালিয়ে ছিলেন তখন। সবার বড় মেয়ে তখন ক্লাস টেনে পড়ত, সবার ছোটটা সেভেনে। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে দেশ ছেড়ে যায় ওরা। তিনি বলেন, 'আমি একাই রয়ে গেছি সেই থেকে। বিরানব্বইয়ে যদি ওরা চলে না যেত ২০০১ সালে তো আরও বেশি সমস্যায় পড়তাম। বিরানব্বইয়ে ঘরে আগুন দিয়েছিল, এক সালে তো ঘরের ভেতরে ঢুকে বউ-বেটি নিয়ে টানাহেঁচড়া করেছে। চরম বেইজ্জতি হয়েছে আমাদের মেয়েরা।'

সেই থেকে একাই এই বাড়িতে থাকেন হীরালাল ভৌমিক। বাড়িটা আক্ষরিক অর্থেই ছায়াঘেরা, পাখিঢাকা। বিশাল পুকুর, সুপারি বাগান মনে কেড়ে নেয়। বেচাকেনার পরও হীরালাল ভৌমিকের ১১ একরের মতো জমি রয়েছে বলে জানালেন তিনি। অবশ্য ওই জমি নিয়ে বিরোধে নিজেও এবার দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। হীরালাল জানান, অনেকদিন আগে দেশ ছেড়ে যাওয়া তার এক কাকা রাজনারায়ণের অর্পিত হয়ে যাওয়া কিছু জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করতেন তিনি। রমাগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোসলেহউদ্দিন লিটন এতকাল পরে রাজনারায়ণের এক নাতিকে এনে হাজির করেছেন। জমি নিয়ে দুই শরিকে বিরোধ বাধিয়ে ঢুকে পড়েছেন যুবলীগ নেতা লিটন। ফলে হীরালালের দখলে থাকা ওই জমি লিটন বিরান ফেলে রাখতে বাধ্য করেছেন। অবশ্য লিটনের দাবি, রাজনারায়ণের উত্তরাধিকারী প্রবীর দাস তাকে ওই জমির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছেন। টেলিফোনে কথা বলার একপর্যায়ে হীরালালের আত্মীয় প্রবীর দাসের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। লিটনের দেওয়া ওই নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে প্রবীর দাসের পরিচয়দানকারী ব্যক্তি জানান, তিনি মোসলেহউদ্দিন লিটনকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের উচ্চারণে কথা বলা ব্যক্তিটির দাবি, দুই দশক ধরে তিনি পূর্বপুরুষের জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন। স্বজনরা কেউ তাকে কোনো সহযোগিতা করেনি। লিটনই তার সহায় হয়েছেন।

লিটন ও প্রবীরের সঙ্গে কথা বলার আগেই হীরালাল ভৌমিক বলছিলেন, বাংলাদেশে হিন্দুর সম্পত্তি টিকিয়ে রাখা দুরূহ। তিনি হাত তুলে দেখালেন পাশের বাড়ির ভূপাল মহাজনরা চলে গেছেন বছর চারেক আগে। জলপাইগুঁড়ির কোথাও আছেন তারা। শুধু ওই মহাজন বাড়ি নয়, হীরালাল ভৌমিকের বাড়ি চেনার জন্য প্রথম যেখানে দাঁড়াতে হয়েছিল, সেটি জনৈক ফারুকের বাড়ি। বাড়ির সামনে পাকা রাস্তার ধারে তার মুদি দোকান। ফেরার পথে দোকানেই দেখা হলো ফারুকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, লালমোহনেরই সৈয়দপুর বলে একটি এলাকায় ছিল তাদের বাড়ি। নদীভাঙনে ওই বাড়ি বিলীন হয়ে গেলে ২০০২ সালে তারা এখানে এসে বাড়ি করেন। বাড়ির জমি কিনেছেন গোপাল ডাক্তারের কাছ থেকে। 'পিয়ারীমোহন গ্রামের বেশির ভাগ মুসলমানই এখানে এসেছে ২০০১ সালের পর'- সরল স্বীকারোক্তি দিলেন ফারুক। তার স্বীকারোক্তিতে মনে করিয়ে দিল আলাপের শুরুতেই হীরালাল বলেছিলেন, 'হিন্দুরা একসময় আপনাদের গল্পের বিষয় হবে। আপনার সন্তানেরা হয়তো পাঠ্যবইয়ে পড়বে একদা এই দেশে হিন্দুধর্ম সম্প্রদায়ের লোকজনও বাস করত।' (শেষ)

আরও পড়ুন

×