করোনাযোদ্ধা
চট্টগ্রামের মানবিক ১২ তরুণ
চট্টগ্রামে করোনা আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন বৃদ্ধা রওশন জাহান। তাকে বিদায় জানাচ্ছেন উদ্যোক্তারা-সমকাল
নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২০ | ১৫:৩৩
হাটহাজারীর মেখল গ্রামের বাসিন্দা রওশন জাহান। সত্তরোর্ধ্ব এই নারী দীর্ঘদিন ধরে লড়ছেন ক্যান্সারের সঙ্গে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি যখন চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি হন, তখন তার অক্সিজেন সেসুরেশন ছিল মাত্র ৭০। টানা ১৪ দিনের চিকিৎসায় পরপর দু'বার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর ১ জুলাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, এই রোগী ছিলেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু রওশন জাহান নন, গত এক মাসে করোনায় আক্রান্ত ২০০ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টার থেকে। মারা যাননি একজনও।
জুনের মাঝামাঝি সময়ে করোনা চিকিৎসায় অনেকটা বেসামাল অবস্থা ছিল চট্টগ্রামে। একদিকে সরকারি কভিড হাসপাতালে 'ঠাঁই নেই' অবস্থা। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো নানা কৌশলে করোনা তো বটেই, সাধারণ রোগীও ভর্তি করছিল না। একের পর এক হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছিলেন করোনা রোগীরা। এই করুণ অবস্থায় এগিয়ে এসেছিলেন চট্টগ্রামের ১২ তরুণ-তরুণী। মাত্র ১০ দিনের প্রচেষ্টায় নগরীর হালিশহরের পোর্ট কানেকটিং সড়কে প্রিন্স অব চিটাগাং নামের একটি কমিউনিটি সেন্টারে গড়ে তুললেন ১০০ শয্যার করোনা আইসোলেশন সেন্টার। সরকারি অনুদান বা সরকারি চিকিৎসক ও সেবিকা ছাড়াই সমাজের মানবিক মানুষের সহায়তায় এই হাসপাতাল গত ১৪ জুন যাত্রা শুরু করে।
উদ্যোক্তাদের সততা ও পরিশ্রম, চিকিৎসকদের মানবিকতা এবং সেবিকা ও স্বেচ্ছাসেবীদের আন্তরিকতার কারণে চট্টগ্রামে করোনা চিকিৎসায় বড় ভরসা হয়ে উঠেছে ১২ তরুণের করোনা আইসোলেশন সেন্টার। এখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ১২ জন চিকিৎসক, ৫ জন সেবিকা ও ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী। গত রোববার চট্টগ্রামের করোনা হাসপাতালগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৭ জন রোগী ভর্তি ছিল এই করোনা আইসোলেশন সেন্টারে। একই সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫৬ জন ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১০৮ জন রোগী ভর্তি ছিল।
প্রসঙ্গত, গত রোববার এই করোনা আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসাধীন রোগীর জন্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের স্ত্রী রাশেদা খানম উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছেন। উপহার সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির আম, আপেল ও মাল্টা। শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান নওফেল বলেন, 'চট্টগ্রামের একদল তরুণ-তরুণী করোনার কঠিন সময়ে দ্রুততার সঙ্গে করোনা আইসোলেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। তারা শুধু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেই দায় সারেননি, নিজেরা সার্বক্ষণিক সম্পৃক্ত থেকে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করছেন। এটা মানবতার উজ্জ্বল উদাহারণ।'
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া গৃহিণী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, 'করোনা পজিটিভ হওয়ার পর খুব ভয় পেয়েছিলাম। দ্রুত হালিশহর করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি হই। এখানকার ডাক্তার-নার্স ও ভলান্টিয়ারদের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। সবাই আমাকে যেভাবে ভালো রাখার চেষ্টা করেছেন, তা অতুলনীয়। ডাক্তার-নার্সরা প্রাণপণ সেবা করেছেন। ভলান্টিয়াররা সবসময় আমাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করেছেন। তারা যখন যা লেগেছে, তা এনে দিয়েছেন। এমনকি আমার ওষুধগুলোও তাদের টাকায় কিনে দিয়েছেন।'
চাকরিজীবী ওসমান গণি বলেন, 'করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর মৃত্যুভয়ে কাতর ছিলাম। অথচ তখন চট্টগ্রামের কোনো হাসপাতালেই ভর্তির সুযোগ পাচ্ছিলাম না, ওই কঠিন সময়ে করোনা আইসোলেশন সেন্টার আমাকে দ্রুত ভর্তি করেছে, চিকিৎসা দিয়েছে, এ কারণে আজ আমি সুস্থ। হাসপাতালের চারদিক পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। রোগীদের প্রতি সবাই খুব যত্নশীল। '
করোনা আইসোলেশন সেন্টারের প্রধান উদ্যোক্তা মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, 'আমাদের করোনা আইসোলেশন সেন্টারটি চলছে মানবিক মানুষদের সহায়তায়। শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান নওফেল ৩ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছেন। প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল দিয়েছে ৪ লাখ টাকা দামের এক্সরে মেশিন। ইস্পাহানি গ্রুপ সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম করে দিচ্ছে। অনেকে রোগীদের জন্য খাবার পাঠাচ্ছেন। আর যে কমিউিনিটি সেন্টারে হাসাপাতালের কার্যক্রম চলছে, সেটিও আমরা বিনা ভাড়ায় পেয়েছি।'
উদ্যোক্তা ও স্বেচ্ছাসেবীদের একজন আইনজীবী জিনাত সোহানা চৌধুরী। তিনি বলেন, 'নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকি আছে জেনেও এই হাসপাতালে রোগীদের নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত বিনা খরচে ১০৫ জন করোনা পজিটিভ রোগী এখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। ৯৫ জন করোনা উপসর্গের রোগীও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। একেকজন রোগী যখন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান, তখন ভীষণ আনন্দ হয়।'
চট্টগ্রাম করোনা হাসপাতালের চিকিৎসক খন্দকার এনামুল নাঈম বলেন, 'আমাদের এই হাসপাতালে করোনা রোগীদের সুস্থতার হার অনেক বেশি। এখানকার সেবিকা, স্বেচ্ছাসেবী সবাই সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে রোগীকে সেবা দিচ্ছেন।'
- বিষয় :
- করোনাযোদ্ধা
- চট্টগ্রাম
- মানবিক ১২ তরুণ
- ১২ তরুণ
- মানবিক