বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
১৬ বছরেও ছাত্র সংসদ পাননি শিক্ষার্থীরা, তবুও গুনছেন ফি
.
সাজ্জাদুর রহমান, বেরোবি
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৩২
উত্তরবঙ্গে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এর পর পার হয়েছে ১৬ বছর। কিন্তু আজও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা না থাকায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। অথচ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ছাত্র সংসদের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়েছে। সে টাকারও যথাযথ হিসাব নেই কর্তৃপক্ষের কাছে।
প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, আইনে না থাকলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ হিসেবে এটি অনুমোদিত হলে নির্বাচন আয়োজনের পথে এগোতে পারবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু এ বিষয়ে বাস্তবে তেমন অগ্রগতি চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এরই মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও নির্বাচনের দাবি জোরালো হচ্ছে।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আলী আকরাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা হোক। যত দ্রুত সম্ভব একটা ছাত্র সংসদ গঠন করা হোক, যেখান থেকে নেতারা শিক্ষার্থীদের ন্যায় দাবি-দাওয়া তুলে ধরবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে ছাত্র সংসদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট তুলে ধরে সেগুলো নিরসনেও কাজ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে প্রণীত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ধারা নেই। ফলে প্রতিষ্ঠার পর একবারও নির্বাচন হয়নি। চলতি বছর অনুষ্ঠিত ১১০তম সিন্ডিকেট সভায় প্রথমবারের মতো খসড়া নীতিমালা উপস্থাপন করা হয়। এ সংক্রান্ত কমিটিতে প্রক্টরকে আহ্বায়ক ও ছাত্র উপদেষ্টাকে সদস্য সচিব করা হয়।
খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে বয়সসীমা এবং অনার্স ও মাস্টার্সের কারা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ বিষয়ে আহ্বায়ক জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির অনুমতি পাওয়ার পর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে। সব অংশীদারের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছাত্র সংসদ বাবদ জনপ্রতি আদায় করা হয়েছে ২০০ টাকা। দ্বিতীয় দফায় স্নাতকোত্তরে ভর্তির সময় আদায় করা হয় জনপ্রতি ১০০ টাকা। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্নাতক পর্যায়ে রেজিস্ট্রেশনকৃত শিক্ষার্থী প্রায় ২০ হাজার। স্নাতকোত্তরে ১৬ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এভাবে ছাত্র সংসদের নামে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ ইতোমধ্যে অর্ধকোটি ছাড়িয়েছে। সে টাকার যথাযথ হিসাব পাওয়া যায়নি। যদিও নতুন প্রশাসন ছাত্র সংসদের নামে অ্যাকাউন্ট খুলেছে। শিক্ষার্থীদের টাকা সে ফান্ডে জমা রাখা হচ্ছে।
এরই মধ্যে গত বছরের ২৮ অক্টোবর ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। গত ১৫ এপ্রিল এক অফিস আদেশে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, আবাসিক হলের সিট বাণিজ্য, সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণিত হলে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি আজীবন বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল’ হবে। প্রয়োজনে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তি বিধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর পরও ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন রাজনীতিতে সক্রিয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হওয়া এবং চূড়ান্ত অনুমোদন বিলম্বিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংগঠনগুলোর নেতারা। তারা দ্রুত নির্বাচনের রূপরেখা প্রকাশ ও প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আল আমিন ইসলাম বলেন, ‘অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন আমরা চাই। এতে ছাত্র সংগঠনের নেতারা চাপে থাকেন। আমাদের ছাত্র সংসদের জন্য সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। যেহেতু আমাদের নীতিমালা নেই; ছাত্রলীগ ব্যাতীত অন্য সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রশাসনকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সমন্বয়ক নামে ৮-১০ জন এটি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। সবাইকে নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছাত্র সংসদ আলোর মুখ দেখবে।’
শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, গুণগত মান, নেতৃত্ব তৈরি, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সময়ের দাবি বলে মনে করেন শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক রাকিব মুরাদ। তাঁর ভাষ্য, দেশের পট পরিবর্তনের পর ছাত্র সংসদ প্রধান দাবিতে পরিণত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে বলে প্রত্যাশা তাঁর।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রশাসনেরই চাওয়া জানিয়ে প্রক্টর ও ছাত্র সংসদবিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘যখন নতুন উপাচার্য আসেন, তখন ছাত্ররা এটা চায়নি। তিনি এটি উত্থাপন করে কমিটি করে দিয়েছেন। কিছু বড় বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করছে। আমাদের প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু আইনি জটিলতা আছে। সমসাময়িক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নির্বাচন হবে।’
ছাত্র সংসদ নির্বাচন কবে হতে পারে– জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকত আলী বলেন, ‘এটা আমার হাতে নেই। এ বিষয়ে আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি প্রতিনিধিসহ অনেকে থাকবেন। তারা আলোচনা করবেন। এটা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হলে তারপর আমরা পেয়ে যাব। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যদি আমরা পার্থক্য করি, তাদের তো প্রতিষ্ঠিত সংবিধি আছে। তারা তো সময় দেবেই।’
- বিষয় :
- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
