ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

তালাবদ্ধ থাকে দরজা, ওষুধ আসে কালেভদ্রে

তালাবদ্ধ থাকে দরজা, ওষুধ আসে কালেভদ্রে
×

বাগমারার কাঁঠালবাড়ি পূর্বপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দরজায় বুধবার বেলা ১১টায় ঝুলছে তালা (বায়ে)। রায়নগর কমিউনিটি ক্লিনিকের দরজা বন্ধ থাকায় জানালা দিয়ে সেবা নিচ্ছেন রোগী সমকাল

এম আনোয়ার হোসেন, বাগমারা (রাজশাহী)

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৩২

রাজশাহীর বাগমারায় বামনকয়া গ্রামের কৃষক মুনছুর মণ্ডলের বয়স ৭০ বছর ছুঁই ছুঁই। ক্লিনিকের পাশ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করলেও কখনও ভেতরে ঢোকেননি। তাঁর ভাষ্য, ‘ক্লিনিক তো রাস্তার সঙ্গেই। হাটে-বাজারে যাওয়ার সময় তো বন্ধই দেখি। শুনি, যারা যান তারা বন্ধ থাকায় অথবা ওষুধ না পেয়ে ঘুরে আসেন।’ তিনি বলছিলেন মারিয়া ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়ি কমিউনিটি ক্লিনিকের কথা। গত বুধবার বেলা ১১টায়ও তালা ঝুলছিল কেন্দ্রের দরজায়।
ক্লিনকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মোছা. জিন্নাতুন খাতুনের অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। খোঁজ নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার দায়িত্বে থাকা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে কল দিলে প্রথমে তিনি বলেন, বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নেবেন। কিছুক্ষণ পর কল দিয়ে বলেন, ‘সিএইচসিপি পাশের ক্লিনিকে আছেন।’ নিজেরটি তালাবদ্ধ রেখে পাশেরটিতে থাকার ব্যাখ্যায় কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি নিয়মে আছে’।
প্রায় পাঁচ মাস এসব ক্লিনিকে ওষুধের সরবরাহ ছিল না। গত শনিবার কিছু ওষুধ এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। নিয়মিত না খোলায় ভবনগুলোও জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। সিএইচসিপি বা স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত আসেন না। তদারকির অভাবে বাড়ছে সমস্যাও। দায়িত্ব এড়াতে তত্ত্বাবধানে থাকা কর্মকর্তারা দিচ্ছেন নানান অজুহাত। কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিকে ঘুরে পাওয়া গেছে এমন চিত্র। অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এবং প্রত্যেকের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এসব স্থাপনা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সরবরাহ করা ওষুধ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়। এ তথ্য জানিয়ে স্টোর কিপার রফিকুল ইসলাম জানান, পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর শনিবার ৩৮ কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ৩৫টিতে ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ১০টিতে চার প্যাকেট ও ২৫টিতে তিন প্যাকেট করে দেওয়া হয়। তিনটির সিএইচসিপি না আসায় স্টোরে রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে এক প্যাকেট করে ধরে সরবরাহ করা হয়। সিএইচসিপিরা বলছেন, এটি চাহিদার তুলনায় সামান্য।
বাগমারা উপজেলার দায়িত্বে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শক (এইচআই) জাহাঙ্গীর আলম মোবাইল ফোনে জানান, তিনি রাজশাহীতে থাকেন। সেখান থেকে বাগমারায় এসে ক্লিনিকগুলো পরিদর্শন করেন। বাসুপাড়ার নন্দনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে পরিদর্শন বুকে দেখা যায়, গত ২ জুলাই তিনি পরিবর্দশন করেছিলেন। এর আগে আসেন ১৩ এপ্রিল। অর্থাৎ দুই তারিখের মধ্যে ব্যবধান প্রায় তিন মাস।
১৯৯৯ সালে সারাদেশে স্থাপন করা হয় এসব কমিউনিটি ক্লিনিক (সিসি)। এর মাধ্যমে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি, স্বাস্থ্যশিক্ষা, পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু ওষুধ সরবরাহ না থাকার অজুহাতে ঠিকমতো খোলা থাকছে না ক্লিনিকগুলো। কয়েকটি ক্লিনিক ঘুরে প্রায় প্রতিটিতে একই চিত্র পাওয়া গেছে।
সিভিল সার্জনের দপ্তর ও উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগমারায় ৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। একটি ছাড়া অন্য ৩৭টিতে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) আছেন। তাদের সহযোগিতার জন্য ১১ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেলথ ইন্সপেক্টর (এইচআই) ও ২৪ জন হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট (এইচএ) রয়েছেন। এ ছাড়া বাঘায় ২০টি, চারঘাটে ২৩, গোদাগাড়ীতে ৩৪, পুঠিয়ায় ২৮, দুর্গাপুরে ১৯, তানোর ২০, পবায় ৩৩, মোহনপুরে ২০টিসহ জেলায় ২৩৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে।
গত ১২ জুলাই রায়নগর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, দরজা বন্ধ করে জানালা দিয়ে রোগীর সঙ্গে কথা বলছেলেন দায়িত্বরত সিএইচসিপি রেখা খাতুন। এ বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, রোগীরা ভেতরে এসে বিরক্ত করেন। তাই জানালা দিয়ে কথা বলে ওষুধ দেন। এখন থেকে তিনি আর এমন করবেন না। নিয়ম মেনে দরজা খোলা রেখে রোগী প্রবেশ করতে দেবেন বলে জানান।
ক্লিনিকের বাইরে জানালার সামনে লাইন দিয়ে সেবা নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন কুদাপাড়া গ্রামের ইমতিয়াজ ও বাবলু সরদার এবং রায়বগরের বৃদ্ধা জায়েদা বিবিকে (৭৮)। তাদের ভাষ্য, তারা এভাবে এখান থেকে সেবা নেন। ঠিকমতো ওষুধ না পাওয়ারও অভিযোগ করেন তারা।
ঝিকরা ইউনিয়নের পাইকপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে রয়েছেন মোছা. কারমিনা তিনি বলেন, ‘আমরা তো নিয়মিত অফিস করতে চাই। কিন্তু ক্লিনিকে পাঁচ-ছয় মাস ধরে ওষুধের সরবরাহ নেই। রোগীর এসব বোঝাতে সমস্যা হয়। অনেক সময় তারা ওষুধের জন্য খারাপ আচরণ করেন।’
সম্প্রতি গনিপুর ইউনিয়নের পোড়াকয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্বে থাকা সিএইচসিপি শেফালী খাতুন জানান, রোগীকে দেওয়ার মতো ক্লিনিকে ওষুধ নেই। এ খবর জেনে রোগী আসেন না। পরামর্শ নয়, তারা মূলত ওষুধ নিতে আসেন। যখন ছিল, তখন দিনে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী আসতেন।
সিএইচসিপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২ ধরনের পণ্যের একটি প্যাকেট ছয় মাসে দু-তিনটি পাওয়া যায়। প্রতিটিতে খাবার স্যালাইন ৪৪০টি, প্যারাসিটামল তিন হাজার, অ্যান্টাসিড দুই হাজার, অ্যান্টিহিস্টামিন দেড় হাজার, সেলভিটামন ৫০০, আইরন (বি কমপ্লেক্স) দুই হাজার, ফলিক অ্যাসিড তিন হাজার ও জিংক ৫০০টি থাকে, যা পর্যাপ্ত নয়। আগে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলেও এখন আর দেয় না।
দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত ব্যবহার এবং সংস্কার না করায় বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে অনেক ক্লিনিকের ভবনে। প্লাস্টারও খসে পড়ছে। দরজা-জানালাগুলো ভাঙাচোরা পাওয়া গেছে। অনেক টিউবওয়েল নষ্ট পড়ে আছে। শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। অনেক ক্লিনিকে রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নানান সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না বলে জানিয়েছেন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. শফিউল্লাহ নেওয়াজ। তিনি বলেন, সে অজুহাতে কেউ অফিস বন্ধ রাখলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্লিনিকগুলো শুধু ওষুধ সরবরাহের জন্য নয়, বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পরামর্শের জন্য। প্রান্তিক পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সার্বিক তত্ত্বাবধনের জন্য কেন্দ্রগুলো চালু রাখতে হবে।
একই ধরনের কথা বলেন, সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম। তিনি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক মূলত পরামর্শ কেন্দ্র। ওষুধ ছাড়াও এখানে রোগীর বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়ার কথা। কেউ যদি অনিয়ম করে, তাঁর বিরুদ্ধে অইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×