মোবারকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
শিক্ষকের উপস্থিতিতে নিয়ম ভেঙে হলে উত্তর সরবরাহ
কুলাউড়ার মোবারকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন প্রশ্নের উত্তর বলে দিচ্ছেন কয়েক অভিভাবক। ছবি: সমকাল
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ০২:৩৭
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদর্শ ও নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের একাংশের কর্মকাণ্ডে রীতিমতো ক্ষুব্ধ সেখানকার সচেতন মানুষ।
উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নে অবস্থিত মোবারকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বেশ কিছু অভিযোগের কথা জানা গেছে। এর মাঝে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষক ও অভিভাবকদের আচরণ নিয়ে। এ বিষয়ে মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সচেতন অভিভাবক রুনেল আহমদ, মাসুক মিয়া, মুহিদ আহমদ, সাহেদা আক্তার ও পলি বেগম। যার অনুলিপি দেওয়া হয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। এদিকে উপজেলার বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকরা সময়মতো স্কুলে উপস্থিত না থাকার ব্যাপারে দফায় দফায় অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন সচেতন মহল।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মোবারকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক রয়েছেন সাতজন। বিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। তবে তার চেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে উঠেছে কয়েকজন শিক্ষকের অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা। প্রধান শিক্ষক এ ব্যাপারে অবগত থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেন না বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সময় মতো প্রতিষ্ঠানে না আসার বিষয়টি। সাম্প্রতিক একটি ঘটনা ছাপিয়ে গেছে বাকি সব বিষয়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছে। একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, পরীক্ষার সময় কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা মানা হচ্ছে না। অনেক অভিভাবক হলের জানালা দিয়ে আবার কেউ কেউ ভেতরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর বলে দিচ্ছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে রোববার গণিত পরীক্ষার দিন সেখানে যান সমকাল প্রতিনিধি। একটি পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখা যায়, এক শিক্ষক পরীক্ষা চলাকাকালীন চেয়ারে বসে আছেন আর ঠিক তাঁর সামনে হলের ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর বলে দিচ্ছেন কয়েকজন অভিভাবক।
পাশের একাধিক পরীক্ষার হলে দেখা যায়, কয়েক অভিভাবক জানালায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর সরবরাহ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকদের সঙ্গে সখ্য রয়েছে– এমন অভিভাবকদের এই অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জোরেশোরে উঠে এসেছে তিন শিক্ষকের নাম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে যে উদাহরণ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা চরম আপত্তিকর। শিক্ষকরা এভাবে প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি ভঙ্গ করতে পারেন না।
এলাকার স্থানীয়রা জানান, সচেতন অভিভাবকরা বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবাদ করলে আমলে না নিয়ে দুর্ব্যবহার করা হয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম চলাকালীন প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করান। ক্লাস চলাকালীন কিছু শিক্ষক মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক মোহাম্মদ মুজির উদ্দিন ও রেহানা আক্তার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন বলেও জানা গেছে।
ভুক্তভোগী অভিভাবক রুনেল আহমদ ও মাসুক মিয়া বলেন, স্কুলে অনেক অনিয়ম হচ্ছে। এসব দেখার কেউ নেই। সময়মতো অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে আসেন না। শিক্ষকরা স্থানীয় হওয়ায় নিজের ইচ্ছেমতো বিদ্যালয়ে আসেন।
পরীক্ষা চলাকালে অভিভাকদের হলে ঢুকে শিক্ষার্থীদের উত্তর বলে দেওয়ার প্রসঙ্গে বিদ্যালয়ের শিক্ষক লায়লা বেগম, মুজির উদ্দিন ও রেহানা আক্তারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা এড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে শিক্ষক মুজির উদ্দিন বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সঠিক নয়। নিয়ম মেনে ক্লাসে পাঠদান করান তিনি। অনৈতিক কোনো কাজে জড়িত নন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রজেস কান্তি দেবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করে এবং খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। এক পর্যায় তাঁর ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের দায়িত্বপাপ্ত কর্মকর্তা মো. এখলাছ মিয়া বলেন, বিষয়টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ঘটতে পারে। খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন বলেন, লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্ত করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- কুলাউড়া
