ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইলিশিয়া গ্রামের প্রধান অর্থকরী পণ্য দুধ-দই

মহিষের দুধের দইয়ের খ্যাতি বিদেশেও

ইলিশিয়া গ্রামের প্রধান অর্থকরী পণ্য দুধ-দই
×

হাসান স্টোরের মালিক আবদুল বাসেত প্রতিদিন গড়ে ১২০ হাঁড়ি দই বিক্রি করেন -সমকাল

 নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম, মাহমুদুর রহমান মাহমুদ, চকরিয়া (কক্সবাজার)

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫ | ০১:১৫ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৫ | ১০:৩৮

ইলিশিয়া লাল ব্রিজ। কক্সবাজারের চকরিয়ার দুই ইউনিয়ন– পূর্ব বড়ভেওলা ও পশ্চিম বড়ভেওলার মাঝামাঝি এ বাজারে মাত্র ১৫টি দোকান। প্রতিটির সামনে টেবিলে সাজানো মাটির হাঁড়ি। হাসান স্টোরে এক মনে হাঁড়িতে দুধ ঢালছে কিশোর নুরশাদ। পূর্ণ হাঁড়িগুলো যত্ন করে শোকেসে রাখছে। পাশেই ক্রেতা সামলাতে ব্যস্ত নুরশাদের মামা আবদুল বাসেত।
ভাগনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ বাসেত জানালেন, তিনি শুধু দই বিক্রি করেন। ছোট্ট হাতে দই তৈরির পাকা কারিগর নুরশাদ।

উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার পশ্চিমে বদরখালী সড়ক ধরে লাল ব্রিজ বাজার। বাস চলে, সিএনজিচালিত অটোরিকশায়ও সহজে যাতায়াত করা যায়। বাজারটি বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ‘ইলিশিয়ার  মহিষের দই’-এর জন্য। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে তৈরি এই টক দইয়ের খ্যাতি পৌঁছে গেছে বিদেশেও। প্রবাসীদের মাধ্যমে ভারত, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে নিয়মিত যাচ্ছে। চিংড়ি ও লবণকে পেছনে ফেলে ইলিশিয়া ও আশপাশের এলাকার প্রধান অর্থকরী পণ্য হয়ে উঠেছে দুধ-দই। 

হান্নান স্টোরের মালিক আবদুল বাতেন বলেন, ‘বর্তমানে ইলিশিয়া লাল ব্রিজ বাজারে অনলাইন-অফলাইনে দিনে গড়ে দুই হাজার হাঁড়ি দই বিক্রি হয়। মাটির হাঁড়িসহ এক কেজি দইয়ের দাম ১৮০-২০০ টাকা। এ হিসাবে দিনে প্রায় চার লাখ; মাসে সোয়া এক কোটি টাকার দই বিক্রি হয়। শীতে ইলিশিয়ার দইয়ের চাহিদা বাড়লেও বেশি বিক্রি হয় রমজানে।’
আগে ইলিশিয়া গ্রামের প্রধান ফসল ছিল চিংড়ি ও লবণ। ক্রমাগত লোকসানের কারণে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেন। বিপরীতে লাভজনক হওয়ায় মহিষ পালন ও দই ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েন। দুধ-দইয়ের মাধ্যমে ইলিশিয়া এখন কক্সবাজারের গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বড় অবদান রাখছে।

পশ্চিম বড়ভেওলা (ইলিশিয়া) ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাবলা বলেন, ‘চকরিয়া সুন্দরবনের প্রায় দুই হাজার একর চিংড়ি ঘের ইলিশিয়া গ্রামে। বর্গা নিয়ে গ্রামবাসী বর্ষা মৌসুমে চিংড়ি এবং শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষ করেন। গ্রামে বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকার চিংড়ি ও ৯০ কোটি টাকার লবণ উৎপাদন হয়। কিন্তু তাতে চাষির লাভ সামান্য। অনেক সময় লোকসানও হয়, তাই তারা লাভজনক মহিষ পালন, দুধ ও দই তৈরিতে আগ্রহী হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘গ্রামের ১২ হাজার বাসিন্দার এক-তৃতীয়াংশ মহিষ পালন, দুধ ও দইয়ের সঙ্গে জড়িত। গ্রামে দুধ দেয়– এমন মহিষ রয়েছে দেড় হাজারের বেশি। পরিবারের পুরুষরা দই তৈরি ও বাজারজাতে জড়িত। তবে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন মহিষ লালনপালনে।’

সাহিত্যিক ও শিক্ষক ইবরাহীম মুহম্মদ বলেন, ‘চার দশক ধরে ইলিশিয়া ও মানিকপুরের মহিষের দইয়ের সুনাম। এখন অবশ্য মানিকপুরের দই তেমন পাওয়া যায় না। সরকার খামারি ও ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিলে ইলিশিয়ার দইয়ের বাজার আরও বিস্তৃত হবে।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফ উদ্দিন বলেন, ‘ইলিশিয়া ও পশ্চিম বড়ভেওলায় মহিষ পালন বাড়ছে। মহিষের রোগবালাই দমনে আমরা সবসময় গৃহস্থ ও খামারিদের সহযোগিতা করি। ইলিশিয়ার মহিষের দই নির্ভেজাল, খুবই সুস্বাদু।’

গ্রামের লক্ষ্মী চিংড়ি, লবণ ও মহিষ
চকরিয়ার উপকূলীয় এলাকার মানুষ হালচাষের জন্য মহিষ পালত। প্রায় ৪৫ হাজার একর আয়তনের চকরিয়া সুন্দরবন ছিল এসব মহিষের চারণভূমি। আশির দশকে বিস্তীর্ণ সুন্দরবন কেটে গড়ে ওঠে ৪৯৪ চিংড়ি ঘের। স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে চকরিয়ায় ২০ হাজার হেক্টর ঘেরে বছরে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার চিংড়ি এবং এক হাজার ৯০০ কোটি টাকার লবণ উৎপাদন হচ্ছে। রামপুর, চরণদ্বীপ, রিংভং, বহলতলী ও ইলিশিয়ার বেশির ভাগ মানুষ আগে চিংড়ি ও লবণ চাষে জড়িত ছিল। পাশাপাশি তারা স্থানীয় বাজারে মহিষের দুধ ও দই বিক্রি করে বাড়তি আয় করত।
পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোজাম্মেল হক বলেন, ‘১৯৭৯ সালে সুন্দরবনের গাছ কেটে সরকারিভাবে ঘের লিজ দেওয়া শুরু হয়। উচ্চবিত্তের মানুষ ঘেরগুলো লিজ পাওয়ায় চিংড়ি ও লবণ স্থানীয়দের হাতছাড়া হয়ে যায়। স্থানীয় বর্গাচাষিরা বিনিয়োগের তুলনায় লাভ তুলতে না পেরে মহিষ পালনে ঝুঁকছেন।’

তিনি জানান, ইলিশিয়া গ্রামে দিনে গড়ে এক হাজার কেজি দুধ উৎপাদন হয়। পাইকারি দর ১৬০ টাকা হিসাবে মাসে ৪৮ লাখ এবং বছরে প্রায় ছয় কোটি টাকার দুধ বিক্রি হয়। দুধের প্রায় পুরোটাই ব্যবহার হয় দইয়ের কাজে।

মোহাম্মদ রুবেল জানান, তাঁর খামারে আছে ১৫টি মহিষ। একটি মহিষ বছরে ছয় মাস দুধ দেয়। প্রতিদিন ৮-১০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। প্রতি লিটার দুধের পাইকারি দর ১৬০-১৮০ টাকা।
ডেবডেবি এলাকার বিধবা মরিয়ম বেগম জানান, আট বছর আগে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৮০ হাজার টাকায় তিনি একটি বাচ্চা মহিষ কেনেন। সেই বাচ্চা থেকে এখন পাঁচটি মহিষ হয়েছে। সবগুলোর দাম প্রায় আট লাখ টাকা। দুটি মহিষ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লিটার দুধ মিলছে। খরচ বাদে দিনে ৮০০ টাকার মতো থাকছে। সংসারের খরচ চালিয়ে তা থেকে কিস্তিও দিচ্ছেন বলে জানান মরিয়ম।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য রেজওয়ানুল হকের বাড়ি ইলিশিয়ার পার্শ্ববর্তী বদরখালীতে। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখেছি, ইলিশিয়া ও বদরখালী বাজারে মানুষ সাপ্তাহিক বাজারে দুদিন মহিষের দই বিক্রি করত। লাল ব্রিজ বাজারে পরিকল্পিত দোকান হওয়ার পর এ দইয়ের কাটতি বেড়ে যায়। অনলাইন-অফলাইনে যে কোনো সময় মানুষ কিনতে পারছেন। দুধ-দইয়ের ব্যবসায় গ্রামের মানুষের মধ্যে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরেছে।’

লাল ব্রিজ বাজারে নতুন অধ্যায়
২০১০ সালে লাল ব্রিজ এলাকায় প্রথম দইয়ের দোকান দেন ওয়াহিদুল ইসলাম ইমন। গ্রাম থেকে দুধ কিনে দই বসাতেন তিনি। প্রথম দিকে দিনে ২০-৩০টি দই বিক্রি হতো, লাভ থাকত ৩০০-৪০০ টাকা। ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়ে; তার দেখাদেখি বাজারেও বাড়তে থাকে দোকান। ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এক লাখ ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগে দইয়ের দোকান দিয়েছিলাম। এখন পুঁজি বেড়ে হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। দুই বছর আগে লাভের পাঁচ লাখ টাকায় চারটি মহিষ কিনেছি। এখন আর আমাকে বাইরে থেকে দুধ কিনতে হয় না। নিজের মহিষের দুধ দিয়েই দই তৈরি করি, লাভও বাড়ছে।’
মানিক স্টোরের কর্ণধার মোহাম্মদ নোমান জানান, টাটকা দুধ প্রথমে কয়েক ঘণ্টা ঠান্ডা করা হয়। হাঁড়িতে ১০-১২ ঘণ্টা দুধ গাজনের পর সেটি দই হয়। বাড়তি কোনো উপাদান যোগ করতে হয় না। গরমে ১২ ঘণ্টার মধ্যে দই বসলেও, শীতে প্রায় তিন দিন লেগে যায়। লাল ব্রিজের ২০০ টাকার দই শহরে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

ইলিশিয়ার দই কেন সেরা
ইলিশিয়ার টক দই খাওয়ার পর হাতে ও মুখে ননি লেগে থাকে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের নামি হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের মেন্যুতে এ দই থাকবেই। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় বিয়েসহ নানা অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে এর আলাদা কদর রয়েছে।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) ডেইরি ও পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এ কে এম এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দই এক ধরনের গাজানো দুগ্ধজাত খাদ্য। দুধে বিশেষ উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রমে দই প্রস্তুত হয়। দইয়ে প্রচুর প্রোবায়োটিক থাকে। ফলে স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী। ইলিশিয়ার মহিষের দুধের গুণাগুণ চমৎকার। খুব ঘন বলে উপুড় করলেও পড়ে না।’

অনলাইনে বিক্রি বাড়ছে, বিদেশেও যাচ্ছে
সাত বছর আগে অনলাইনে ইলিশিয়ার দই বিক্রি শুরু করেন শফিউল হক আজিজ। ‘গ্রাম্যপণ্য’ নামে ফেসবুক পেজে এখন প্রতিদিন ১০০-১২০টি দই বিক্রি হচ্ছে। শফিউল বলেন, ‘ইলিশিয়ার দই সরাসরি রপ্তানি হচ্ছে না। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রবাসীরা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ ব্যবস্থায় এ দই ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে রপ্তানির জন্য সরকারি সহায়তা দরকার।’

 

আরও পড়ুন

×