কনস্টেবল আতিক বাঁচালেন ৩ শিশুর প্রাণ
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২০ | ০৮:৩৭
রাজশাহীতে তিন শিশুকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়েছেন এক পুলিশ কনস্টেবল। ওই পুলিশ সদস্যর নাম আতিকুর রহমান। প্রশংসনীয় এই কাজের জন্য তাকে পুরস্কৃত করেছে জেলা পুলিশ সুপার।
বুধবার দুপুরে রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহ সমকালকে বলেন, ‘আতিকুর রহমান অসাধারণ মানবিক এই কাজটি করে পুলিশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। ’ আতিকের বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলায়।
পুলিশ সুপার জানান, রাজশাহীর দুর্গাপুর থানায় পুলিশের গাড়ি চালক হিসেবে কর্মরত কনস্টেবল আতিক। হোজা নদীতে ভাসতে থাকা তিন শিশুকে উদ্ধার করেছেন তিন। তিন শিশুর একজন মেহেদী হাসান (১১) তারই সহকর্মী জাকির হোসেনের ছেলে। অন্য দুজন স্থানীয় কৃষক ইউনুস আলীর ছেলে রুবেল (১০) ও কলেজ শিক্ষক আয়নাল হকের ছেলে স্বচ্ছ (১০)।
তিন শিশুকে উদ্ধারের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে পুলিশ কনস্টেবল আতিক বলেন, ‘রোববার দিবাগত রাতে দায়িত্ব পালন শেষে সোমবার সকালে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। আতঙ্কিত হয়ে তার স্ত্রী শারমিন তাকে ডেকে তুলে জানান, তিনটি শিশু নদীতে ডুবে যাচ্ছে। পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীর মাঝখানে দুটি সেতু ডুবে গেছে। সেতুর উপরে হাঁটু পানি। স্থানীয় শিশুরা সেখানে গিয়ে খেলাধুলা করে। কিন্তু এখন নদীতে তীব্র স্রোত। সোমবার তিন শিশু খেলার সময় ডুবে যেতে থাকে। নদীর পাড়ে তখন শত শত মানুষ জড়ো হয়ে ছেলেগুলোর ডুবে যাওয়া দেখছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। কেউ বাঁচানোর চেষ্টা পর্যন্ত করছেন না। এদিকে দুটি বাচ্চা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। বাড়ির আঙিনায় বাঁশের ওপরে আমরা কাপড় শুকাতে দিই। শারমিন সেই বাঁশ খুলে আনে। নদীতে বাঁশ ফেলে আমি দুই শিশুকে ধরে থাকতে বলি। গ্রামের একজনকে বলি বাঁশ ধরে থাকতে, তারপর সাঁতরে রুবেল ও স্বচ্ছকে তুলে আনি। স্রোতের মধ্যে থাকতে থাকতে ওরা এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে বাঁশটা ঠিক মতো ধরে থাকতে পারছিল না। হাত ফসকে গেলে চোখের পলকে তলিয়ে যেত।
তিনি আরও বলেন, ‘মেহেদীকে উদ্ধার করা তুলনামূলক সহজ ছিল। সে সেতুর একটি পিলার ধরে ছিল। নদীর পাড়ে তোলার পর তাদের পেট থেকে পানি বের করা হয়। এখন তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে নিরাপদে সুস্থ আছে।’
আতিক বলেন, ‘নদীর পাড়ে জড়ো হওয়া শত শত মানুষ দেখে আমার ভাইয়ের দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ছিল। কয়েক বছর আগে আমার ভাই পানিতে ডুবে মারা যায়। সেদিন আমি আমার ভাইকে বাঁচাতে পারিনি। তিন শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে ওদের মধ্যে আমি আমার ছোট ভাইয়ের চেহারা দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার মনে হলো, আমি যদি স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতাম তাহলে হয়তো আমিও ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে যেতাম। ডিজিটাল পদ্ধতির জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে আমরা বিবেক হারিয়ে ফেলছি।’
পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ঢাকার মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাসে স্নাতক শেষ করে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে আতিক পুলিশে যোগ দেন। প্রায় সাড়ে তিন বছর হলো তিনি দুর্গাপুর থানায় কর্মরত। পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আনিসা রহমান ও স্ত্রী শারমিন আক্তারকে নিয়ে থানার পাশেই একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। বাসার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে হোজা নদী।
তিনি বলেন, ‘আতিকুর রহমানের কাজে আমরা গর্বিত। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রত্যেক পুলিশ সদস্য এ রকম স্বেচ্ছাসেবায় নিজেদের নিয়জিত করবেন। বুধবার সকালে জেলা পুলিশ সদর দপ্তরে আতিকুর রহমানের হাতে পুরস্কার হিসেবে ৩০ হাজার টাকার চেক ও সম্মাননা সনদ তুলে দেওয়া হয়ে। এই প্রশংসনীয় কাজের জন্য আতিকুর রহমান যেন জাতীয় পুরস্কার পান পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে সেই সুপারিশ করা হবে।’
- বিষয় :
- রাজশাহী
- পুলিশ কনস্টেবল