ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বালুমহালের ইজারা নিয়ে মুখোমুখি ইজারাদার ও এলাকাবাসী

বালুমহালের ইজারা নিয়ে মুখোমুখি ইজারাদার ও এলাকাবাসী
×

যাদুকাটা নদীর বালুমহাল-১ এর সীমানা নির্ধারণের কাজে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তারা। রোববারের ছবি -সমকাল

 সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪৭ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

একের পর এক ইস্যুতে বিতর্ক-সমালোচনা চলছেই সুনামগঞ্জের যাদুকাটা বালুমহাল ঘিরে। মহালের ইজারা প্রদান, ইজারাদার, তাদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামীপন্থি প্রভাবশালী নেতাদের সম্পৃক্ততা, প্রশাসনের কার্যক্রম, চাঁদাবাজি, রয়্যালটি বৃদ্ধি, আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বালু উত্তোলনের মতো নানা বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ বাড়ছে প্রতিদিন।

এবার জেলার সবচেয়ে বড় বালুমহাল যাদুকাটা-১ এর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে লাউড়েরগড়বাসীর ভোগান্তির চিত্র সামনে এসেছে। এতদিন রাজনৈতিক নেতাদের ভয়ে নীরব থাকলেও এখন প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।

সোমবার বিকেলে লাউড়েরগড় এলাকার বাসিন্দারা জেলা প্রশাসককে পুনরায় যাদুকাটা-১ বালুমহালের সীমানা মেপে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার আবেদন জানান। এই বালুমহালের ইজারা নিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা কামরুজ্জামান ও আনিসুলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত নাসির মিয়া। তবে সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক বা একাধিক নেতার সম্পৃক্ততার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে।

আবেদনে উল্লিখিত তথ্য থেকে জানা যায়, যাদুকাটা-১ এর সীমানা পুনর্নির্ধারণ না করা হলে এ নিয়ে ইজারাদারের সঙ্গে এলাকাবাসীর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
লাউড়েরগড়ের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান তারেক, শাহিন আলম ও মাসুদ জাহান পিন্টু জানান, যাদুকাটা নদী ও লাউড়েরগড় গ্রাম দেশের উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিত। যাদুকাটা নদী সম্প্রতি ইজারা দেওয়া হয়েছে। রোববার তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা নদীর ইজারাকৃত সীমানা বুঝিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তবে তারা কাজ সমাপ্ত না করেই সেখান থেকে চলে আসেন। এ ঘটনায় লাউড়েরগড়ের নদীতীরবর্তী খাসজমি হুমকিতে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় এলাকাবাসীর স্বাক্ষরসহ জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে সমস্যা সমাধানে।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, সীমানা নির্ধারণের সময় হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে প্রথমে খনিজ এলাকার সীমানা চিহ্নিত করা হয়। পরে খাস ভূমির সীমানা চিহ্নিত করে দুটি লাল নিশান টাঙানো হয়। সেই নিশানগুলো থেকে ৫০০ এবং ৮০০ ফুট পশ্চিমে ইজারার জায়গা শুরু বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু ওই সীমানায় কোনো নিশান টাঙিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়নি। এ কারণে ইজারাকৃত সীমানা সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। যার পরিপ্রেক্ষিতে বালু উত্তোলনে আসা নৌকা ও বাল্কহেড মালিকদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে স্থানীয়দের। আবেদনকারীরা নদীতীর থেকে ৫০০ এবং ৮০০ ফুট পশ্চিমের ভেতর থেকে বালু উত্তোলন না করার অনুরোধ জানান।

যাদুকাটা পাড়ের ঘাগটিয়ার বাসিন্দা পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, সীমানা নির্ধারণ কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই রোববার প্রশাসনের লোকজন ফিরে যান। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় তরুণরাই সামাজিক মাধ্যমে এসব তথ্য তুলে ধরে সবাইকে এ বিষয়ে অবহিত করেছে। অন্যদিকে সীমানার বিষয়টি অমীমাংসিত থাকলেও সেখান থেকে পাড় কেটে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
যাদুকাটা-১ এর ইজারাদার নাছির মিয়া বলেন, প্রশাসনের লোকজন তিন-চারবার ওখানে গেছেন। গ্রামের কিছু মানুষ বলেছেন তরুণদের খেলাধুলা করার অংশটুকু রক্ষা করে ইজারাদারকে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ সৃষ্টি হয়। জটিলতা বাধে। পরে প্রশাসনের লোকজন চলে আসেন। চার-পাঁচ দিন বন্ধ ছিল বালু উত্তোলন। রোববার অতিরিক্ত পুলিশ ও সার্ভেয়ারকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের অনেকের উপস্থিতিতে সীমানা নির্ধারণ করে দেন। একদিকে পানি থাকায় বলা হয়েছে, ওইদিকে এখন বালু না তোলার জন্য। নির্দেশ মেনেই চলছে বালু উত্তোলন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, গ্রামবাসী-ইজারাদার সবার উপস্থিতিতে ইজারার সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক পাশে পানির জন্য সীমানা দেওয়া যায়নি। ওখানে সীমানা খুঁটি দেওয়ার আগে বালু না তোলার জন্য ইজারাদারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে সব বালু শ্রমিক ও ব্যবসায়ীকে।

সুনামগঞ্জের বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা-১ ও ২ নিয়ে আদালতে মামলা ছিল। সর্বশেষ পাড় না কেটে ড্রেজার, বোমা মেশিন ও সেভ মেশিন ব্যবহার না করার শর্ত সাপেক্ষে শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় 
নিয়ে মহাল ইজারা দেওয়ার পক্ষে আদালত মত দেন। শেষে প্রায় ১০৭ কোটি টাকায় বালুমহাল দুটি ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। এর পর থেকে এ নিয়ে নানা জটিলতা চলছেই।
 

আরও পড়ুন

×