ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭: সাদা কফিনে ফিরল সচ্ছলতার স্বপ্ন

ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭: সাদা কফিনে ফিরল সচ্ছলতার স্বপ্ন
×

নিহত প্রবাসীরা। ছবি: সংগৃহীত

সাজিদ মোহন, সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ২২:৪৫ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ২২:৪৭

ঘাটে একই ভিড়, অপেক্ষায় স্বজন। কিন্তু দৃশ্যটা ভিন্ন। কারও মুখে হাসি নেই। প্রিয়জনের লাগেজ কিংবা ব্যাগ ধরার তাড়াও নেই। অদূরে জেটিতে দাঁড়িতে কেউ নাড়ছে না হাত; ছোট্ট মুখ থেকেও বের হচ্ছে না হাঁক, বাবা...। সবার চোখে জল, কণ্ঠে বাষ্পরুদ্ধ আর্তনাদ।

রোববার সকাল ৭টার দিকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটের এ দৃশ্য কেউ আশা করেনি। লাশবাহী স্পিডবোট ঘাটে ভিড়লে শোক বুকে চেপে স্বজনরা গ্রহণ করেন একে একে সাতটি কফিন, যার মধ্যে রয়েছেন সম্প্রতি ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সন্দ্বীপের সাত প্রবাসী। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রত্যেকে গিয়েছিলেন প্রবাসে।

এখান থেকে লাশগুলো পূর্ব সন্দ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নেওয়া হয়। এরপর জানাজা শেষে নিজ নিজ গ্রামে দাফন করা হয় মোহাম্মদ আমীন মাঝি (৫০), মো. সাহাবুদ্দিন (২৮), মো. বাবলু (২৮), মো. রকি (২৭), মো. আরজু (২৬), মো. জুয়েল (২৮) ও মোশারফ হোসেন রনিকে (২৬)। ওমানে আমীনের অধীনে অন্যরা কাজ করতেন।

প্রবাসী আমীন সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কব্বর সেরাংয়ের ছেলে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর এক দিন আগে ফেসবুকে ‘সন্দ্বীপে লাশবাহী স্পিডবোট চালু হচ্ছে’ পোস্ট দিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। গতকাল তাঁর লাশ বহনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো সন্দ্বীপের সেই লাশবাহী স্পিডবোট।

দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে আমীনের। এর মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ের কথা চূড়ান্ত হয়েছিল। কব্বর সেরাং জানান, কিছুদিন পর দেশে এসে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করার কথা ছিল আমীনের।

সরেজমিন উপজেলার সারিকাইত ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে নিহত বাবলু ও শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে কফিন ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মাতম করতে দেখা যায়। কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও উঠোনে নির্বিকার খেলছে বাবলুর চার বছর বয়সী মেয়ে ও পাঁচ বছর বয়সী ছেলে। রাস্তার পশ্চিমে শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে কফিন ঘিরে নির্বাক স্বজনরা। শাহাবুদ্দিনের বাবা সিদ্দিকের কোলে তাঁর চার মাস বয়সী কন্যাসন্তান। কান্নারত সিদ্দিক বললেন, বাবলু ও শাহাবুদ্দিন একসঙ্গে বড় হয়েছে। ওমানে একসঙ্গেই থাকত। একসঙ্গে যাত্রা, লাশ হয়ে ফিরলও একইভাবে। এটি আমরা মেনে নিতে পারছি না।

বাবলু ও শাহাবুদ্দিনের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দক্ষিণে নিহত রকির বাড়ি। রকির বাবা মো. ইব্রাহিম বলেন, সাত বছর ওমানে রকি। সর্বশেষ বাড়ি এসেছিল ১০ মাস আগে। একমাত্র কন্যাসন্তানের বয়স এখন চার মাস। সন্তানকে স্পর্শ করার আগেই আমার ছেলেটাকে আল্লাহ নিয়ে গেলেন।

নিহত আরজুর একমাত্র মেয়ে আনিসার বয়স তিন বছর। তাঁর বাবা শহিদুল্লাহ  ছেলের মৃত্যুর সংবাদ কীভাবে জানতে পারেন, তা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে দেন। নাতনিকে কোলে নিয়ে বলেন, এতিম শিশু এখন কাকে বাবা ডাকবে? ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছি না।

সারিকাইত ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নে বাড়ি নিহত জুয়েলের। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। জুয়েলের বাবা মো. জামান বলেন, আট মাস আগে দেশে এসেছিল। আবার আসার কথা চলছিল, সবাই অধীর অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু কফিনবন্দি হয়ে এসে সবাইকে সে শোকের সাগরে ভাসাল। এমন ফেরা তো আমরা চাইনি!

সারিকাইত ও মাইটভাঙ্গা ইউনিয়ন থেকে সন্দ্বীপ পৌরসভার দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। নিহত রনি পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লেমু হোসেনের বাড়ির সন্তান। সাঁওতাল খালের পাশে রনির বাড়িতে দেখা যায়, উঠোনে খেলছে তাঁর আট মাস বয়সী ছেলে ওসমান গণি। এক কোণে বসে আছেন রনির বাবা আবুল হোসেন। তিনি বললেন, পাঁচ সন্তানের মধ্যে একমাত্র রনি প্রবাসে থাকত। নদীভাঙনে পাঁচবার বসত বদলে থাকেন খালপাড়ে। ভালো কোনো জায়গায় ঘরবাড়ি করার স্বপ্ন ছিল রনির, তা আর পূরণ হলো না।

গত ৮ অক্টোবর ওমানের ধুকুম প্রদেশের সিদরা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আট বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে সাতজনের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। দুর্ঘটনার ৯ দিন পর শনিবার রাতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে আটজনের লাশ। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্দ্বীপের সাতজনের কফিন গতকাল সকালে পৌঁছে গুপ্তছড়া ঘাটে। সেখান থেকে কফিনগুলো নেওয়া হয় নিজ নিজ গ্রামে।

আরও পড়ুন

×