ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি চসিকের ছয় প্রকল্প, কার্যক্রমে ভাটা

ভিত্তিপ্রস্তরে আটকা আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্প

মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি চসিকের  ছয় প্রকল্প, কার্যক্রমে ভাটা
×

আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২০ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক নগর ভবন নির্মাণে ২০১৯ সালের মার্চে একটি প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। সাড়ে ৬ বছর পরও প্রকল্পটির অনুমোদন মেলেনি। ফলে বস্তিবাসীর জন্য নির্মিত ভবনে অস্থায়ী কার্যালয় খুলেছে চসিক। 
শুধু এই প্রকল্প নয়, ছয়টি প্রকল্প ও দুটি আবেদন বছরের পর বছর মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে ঘুরছে। জরুরি প্রকল্পের অনুমোদন না মেলায় চসিকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন নাগরিকরা। গুরুত্ব বিবেচনায় প্রকল্পগুলো দ্রুত অনুমোদনের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে আধুনিক যান ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব স্যানিটারি ল্যান্ডফিল বাস্তবায়ন, বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিবাস নির্মাণ সংশোধিত প্রকল্প। এ ছাড়া ল্যান্ডফিলের জন্য ভূমি ক্রয় এবং দৈনিক ভিত্তিতে ৬০০ অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের অনুমোদনও চাওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, ১৮ বছরের পুরোনো যানবাহন ও যন্ত্রপাতি দিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পুরোনো এসব যন্ত্রপাতি মেরামতে প্রতি মাসে খরচ হয় ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টাকেও জানানো হয়েছে। তবু অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না।

নামফলকে আটকে আছে নগর ভবন
২০১০ সালের ১১ মার্চ আন্দরকিল্লা মোড়ে নগর ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর যারা মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তারা সবাই নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। তবে কেউ ভবনটি নির্মাণ করতে পারেননি। আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ করতে ২০১৯ সালে ২০২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। গত ৮ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সাতটি শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সম্মতি দেয়।
মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আছিয়া খাতুন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের জিওবি (সরকারি অনুদান) অংশের ১৬১ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে ৬০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। এর পরিমাণ ৯৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। বাকি ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৬৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। ৫ শতাংশ সুদে এই ঋণ ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা সিটি করপোরেশনের নেই। তারা প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অনুদানে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন। 

চার বছর ধরে ঝুলছে যান-যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্প
২০২১ সালের জুলাইয়ে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আধুনিক যান-যন্ত্রপাতি সংগ্রহ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রকল্পটির আওতায় ৪১০টি যান-যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যয় ধরা হয় ৩৯৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। পরে প্রকল্প পুনর্গঠন করে খরচ ধরা হয় ২৬৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সর্বশেষ গত ৫ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। 

মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আছিয়া খাতুন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, প্রস্তাবিত প্রকল্পের জিওবি (সরকারি অনুদান) অংশের ২৬৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকার মধ্যে ৬০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। এর পরিমাণ ১৬১ কোটি ৯ লাখ টাকা। বাকি ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ১০৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। প্রকল্পটিও সাতটি শর্তে অনুমোদনের সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, সিটি করপোরেশন একটি সেবা সংস্থা। প্রকল্পগুলো থেকে কোনো আয় করার সুযোগ নেই। তাহলে ঋণ নিলে শোধ করবো কীভাবে? তাছাড়া প্রতি মাসে বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হয় ৩২ কোটি টাকা। এগুলো জোগাড়েই হিমশিম খেতে হয় সিটি করপোরেশনকে। এর বাইরে দেনা আছে ৪০০ কোটি টাকার বেশি। 

আরও যেসব প্রকল্পের অপেক্ষায় চসিক
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জন্য ২৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭টি ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৩ জুন সংশোধিত প্রকল্পটি ৭৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে পাঠানো হয়। সেটির অনুমোদন এখনও মেলেনি। 
এছাড়া যুক্তরাজ্যের ডিপি ক্লিন টেক ইউকে লিমিটেড ও ইমপেক্ট এনার্জি গ্লোবাল লিমিটেড যৌথ উদ্যোগে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চসিককে প্রস্তাব দেয়। যে প্রকল্পের অধীনে ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা রয়েছে। গত ২২ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। প্রকল্পটি এখনও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়নি বলে জানিয়েছেন চসিক কর্মকর্তারা। 

এছাড়া ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব স্যানিটারি ল্যান্ডফিল স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। ২২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রকল্পের পিডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনের পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। গত ১৮ মে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রকল্পটিও ঝুলে আছে।

২০২৩ সালের ২১ মার্চ ল্যান্ডফিল স্থাপনের লক্ষ্যে ভূমি কেনার অনুমতি দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তখন ১০ একর ভূমি কেনা হয়। গত নভেম্বরে বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও ৪০ একর ভূমি কেনার অনুমতি চাওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে দৈনিক মজুরিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে ৬০০ শ্রমিক নিয়োগের অনুমোদন চাওয়া হয়। বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারে চাওয়া হয় ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ। এগুলোর কোনোটির অনুমোদন মেলেনি। 
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এভাবে দীর্ঘদিন প্রকল্পগুলো মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকা দুর্ভাগ্যজনক। প্রকল্পগুলো ফাইলবন্দি থাকায় চট্টগ্রামবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×