প্রথম শ্রেণির কর দিয়েও মেলে না তৃতীয় শ্রেণির পৌরসেবা
ইকবাল হোসেন, মতলব (চাঁদপুর)
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রথম শ্রেণির কর পরিশোধ করেও পৌরসভা কি বোঝেন না রহিম বেপারী। তিনি বলেন, ‘ছেংগারচরে কি একটা ওইছে, এইডার বেশি বেশি ট্যাক্স দিতে হয়। জমির দাম ১০ হাজার টাহা শতাংশ। কর দিতে হয় ১০ হাজার টাহা। রেজিস্ট্রি খরচ আরও পাঁচ হাজার টাহা। মাইনসেরে হইর (ফকির) করণের ওউগ্গা (একটি) কল (যন্ত্র) বোয়াইছে (বসিয়েছে)।’ তাঁর মতো এমন অনেকেই জানেন না পৌরসভার পরিসেবার কথা। নামে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক সুবিধাও পাচ্ছেন না বাসিন্দরা।
বিশাল এলাকা নিয়ে গঠিত ছেংগারচর পৌরসভাটিতে তৃতীয় শ্রেণির সুবিধা না থাকলেও শুধু রাজস্ব আদায়ের শর্ত দিয়ে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নতি করা হয়েছে। অবকাঠামো বা নাগরিক সেবার দিক থেকে ৯০ শতাংশ সুবিধা থেকে বঞ্চিত এখানকার মানুষ। তাই অনেকে এটিকে ভোটের পৌরসভা বা রাজনৈতিক পৌরসভা মনে করে থাকেন। ১৫৫ জন স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১৫ জন দিয়ে খুঁড়িয়ে খঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম। ১৪০টি পদই শূন্য।
‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা হতে শর্তানুযায়ী বার্ষিক এক কোটি টাকা রাজস্ব আদায় থাকতে হয়। জমি রেজিস্ট্রি থেকে ২ শতাংশ হারে এক কোটি টাকা অর্জিত হওয়ার কারণেই একটি পৌরসভা ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। অবকাঠামোগত দিক থেকে এটি ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা হওয়ার যোগ্য নয়। অথচ ‘ক’ শ্রেণি হিসেবে কর দিয়েও তৃতীয় শ্রেণির সেবা পাচ্ছেন না নাগরিকরা।
স্থানীয় সরকার বিভাগের শর্ত অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, নালা-নর্দমা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকার কথা। তবে প্রথম শ্রেণির মর্যাদাপূর্ণ ছেংগারচর পৌরসভায় এখনও এসব শর্ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ দূরের কথা ৪০ ভাগও পূরণ হয়নি। পৌর বাসিন্দারা প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেলেও সেবার ক্ষেত্রে যেন ভোগান্তির শেষ নেই।
ছেংগারচর পৌরসভার তথ্যমতে, ১৯৯৮ সালের ৫ এপ্রিল পৌরসভাটি ‘গ’ শ্রেণিতে প্রতিষ্ঠা হয়। ২০১১ সালের ৭ আগস্ট ‘খ’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ২০১৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়।
‘ক’ শ্রেণির পৌরসভার নিয়োগ কাঠামো অনুযায়ী এই পৌরসভায় স্থায়ী ১৫৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু ১৪০টি পদই ফাঁকা পড়ে আছে। বর্তমানে কর্মরত আছেন একজন নির্বাহী প্রকৌশলী, একজন সহকারী প্রকৌশলী, একজন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, একজন কর নির্ধারক, অফিস সহায়ক, নলকূপ মিস্ত্রি, রোলার চালক, মিক্সার মেশিন অপারেটর, গাড়িচালকসহ ১৫ জন।
জানা গেছে, ছেংগারচর পৌরসভার ৫০ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি কাঁচা। পাকা রাস্তার বেশির ভাগই বেহাল। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদায় পরিণত হয়।
সুবিধার কথা বললে প্রায় ১১ হাজার পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩২৯ পরিবার বিশুদ্ধ সাপ্লাইর পানি পাচ্ছে। এমনকি, পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখনও বিশুদ্ধ খাবার পানির সরবরাহ করতে পারেনি। পৌরসভার ৫০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে সড়কবাতি আছে মাত্র ৫২টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ময়লা ফেলার জন্য ডাম্পিং স্টেশন নেই। ফলে যত্রতত্রই দেখা যাচ্ছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভঙ্গুর। বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় নাকাল হয় পৌরবাসী।
পৌরসভার সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দারা জানান, নাগরিক সুবিধা নেই, শুধু কর আদায় হলেই কি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হয়ে গেল? তাদের অভিযোগ, ২৬ বছরের এই পৌরসভায় যে কয়জন মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা পৌরবাসীকে নাগরিক সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ছেংগারচর বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম ফকির বলেন, ‘বেহাল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, সড়কে ময়লা-আবর্জনায় সয়লাব। পৌরসভা হিসেবে যে সুবিধা থাকার কথা, তার কিছুই পাচ্ছি না আমরা।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাসিন্দা বলেন, ‘শুধু ট্যাক্স আদায় ছাড়া পৌরসভার আর কোনো দায়িত্বই দেখছি না।’
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনির ভাষ্য, জনবল সংকটই বড় সমস্যা। পানি শোধনাগার আছে, কারিগরি সহায়তা দেওয়ার মতো লোক নেই। এসব নিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- পৌরসভা
