ডুমরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ
চেয়ারম্যান ছুটিতে, সাড়ে ৮ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিলেন বাকিরা
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
গোপালগঞ্জের ডুমরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছুটিতে ছিলেন তিন মাস। এই সুযোগে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পরিষদের সাড়ে আট লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করেছেন।
ডুমরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আলী আহমেদ শেখ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে গত ৩ জুলাই থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসের ছুটিতে যান। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রশাসন ওই ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য নিজাম শেখকে ৩ জুলাই থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। এদিকে তিন মাসের ছুটি শেষ হওয়ার পরও আলী আহমেদ শেখ দপ্তরে ফেরেননি। সব মিলিয়ে বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলছে ৩৫ হাজার অধিবাসী অধ্যুষিত ডুমরিয়ার ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম।
ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি বলেন, নির্বাচিত চেয়ারম্যান আলী আহম্মেদ শেখ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে ইউনিয়ন পরিষদে কম আসতেন। তিনি অজ্ঞাত স্থানে থেকে ইউনিয়ন পরিষদের কাজ করতেন। এতে পরিষদের সার্বিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা দেখা দেয়। অচলাবস্থা কাটাতে চেয়ারম্যান তিন মাসের ছুটিতে যান। কিন্তু তাতে আরও ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজাম শেখ দায়িত্ব নেওয়ার ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, নাগরিকত্ব, চারিত্রিক ও ওয়ারিশান সনদ, প্রত্যয়নপত্র, হজ নিবন্ধন সেবা ও গ্রাম আদালত কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এসব সেবা নিতে আসাদের ভোগান্তির শেষ নেই। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়মিত অফিস করেন না। এ ছাড়া পরিষদের সচিবের বিরুদ্ধে রয়েছে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ।
এসব অভিযোগের খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসে ইউনিয়ন পরিষদের টাকা আত্মসাতের তথ্য। একটি সূত্র জানায়, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিন মাসে বিভিন্ন উৎস থেকে আদায় করা হয় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। বকেয়া ট্যাক্স, জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন খাত থেকে ওই সময়ে এ পরিমাণ টাকা আসে। এই অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, এই অর্থ পরে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বেতনভাতা এবং উন্নয়ন– এই দুই খাতে ব্যয় করার কথা। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পুরো টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাবে এটি দেখানো হয়নি। এমনকি ছুটিতে থাকা নির্বাচিত চেয়ারম্যানের তিন মাসের বকেয়া বেতনের প্রায় ৫৮ হাজার টাকাও পরিশোধ করা হয়নি। পরিষদের টাকা আত্মসাৎ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত তিন মাসের ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনেও অসংগতি রয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকরা জানিয়েছেন।
একাধিক ইউপি সদস্য জানিয়েছেন, তাদের একেকজনকে ৩৬ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। ইউপি সদস্যরা সব মিলিয়ে পাঁচ লাখ টাকার মতো পেয়েছেন। বাকি তিন লাখ টাকা নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এ কারণে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডুমরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তারের বক্তব্য জানতে গতকাল শনিবার অন্তত ছয়বার ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। এ কারণে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি
লেবুতলা কালি খোলা গ্রামের আসিফ শেখ বলেন, ছেলেকে আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করব। সেজন্য জন্মনিবন্ধন দরকার। দুই মাস আগে আবেদন করে বসে আছি। কিন্তু সচিব কাজ করেন না। চেয়ারম্যান অফিসে আসেন না, তাই জন্মনিবন্ধন পাচ্ছি না। বাঁশবাড়িয়া গ্রামের তাফসীর তালুকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার জমি প্রতিবেশী জোর করে দখলে নিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমি গত ১০ অক্টোবর ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। ইউএনও ইউপি চেয়ারম্যানকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েকবার পরিষদে এসেও চেয়ারম্যানকে পাইনি। ফলে আমার সমস্যটি ঝুলে রয়েছে।
একই গ্রামের শারমিন আক্তার বলেন, আমরা গরিব মানুষ, সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া আমাদের চলে না। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা পেতে, এমনকি এসব ভাতার নামের তালিকায় যুক্ত হতেও সচিবকে টাকা দিতে হয়। এখানে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না।
ইউনিয়ন পরিষদের সচিব বিশ্বাস মো. ফেরদাউস ইসলামের কাছে পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব জানতে চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এক পর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, সাংবাদিকদের কেন হিসাব দেখাব? সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি মিডিয়ার সামনে কথা বলবেন না বলে জানান।
- বিষয় :
- চেয়ারম্যান
