যশোরের মনিরামপুর
সমাজে শান্তি ফেরাচ্ছেন গ্রাম আদালত, মামলা কমছে
গ্রাম আদালতে মামলা নিষ্পত্তির পর খুশিতে বাদী-বিবাদীর কোলাকুলি। ছবি: সমকাল
এস এম মজনুর রহমান, মনিরামপুর (যশোর)
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:০২ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:০২
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাকোশপোল গ্রামের কৃষক আবদুল হকের স্ত্রী জোসনা খাতুন। দুই বছর আগে স্থানীয় রকিব সরদারের কাছ থেকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ১০ কাঠা জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করছিলেন। পরে ওই টাকা ফেরত না দিয়ে রকিব সরদার জমিটি জোরপূর্বক নিয়ে নেন। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েন জোসনা খাতুন।
থানা পুলিশ বা আদালতে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারছিলেন না সাধারণ এ গৃহিণী। এক পর্যায়ে তিনি সদর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে ১০ টাকা ফিস দিয়ে মামলা করেন। মাত্র ১৫ কর্মদিবসের মধ্যেই দুই দফা শুনানি শেষে আসামির কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায় করে ভুক্তভোগী জোসনা খাতুনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তিনি ওই টাকা নিয়ে আবারও এক বিঘা জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেছেন।
শুধু জোসনা খাতুন নন, হাজরাকাঠি গ্রামের হুমায়ুন কবিরের মেয়ে আফরিন সুলতানা রিয়ার বিয়ের ২০ মাস পর স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আট মাস বয়সী সন্তানসহ তিনি বাবার বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। কাবিনের টাকা পরিশোধ করা হলেও খোরপোশ বাবদ টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে রিয়া গ্রাম আদালতে মামলা করেন। দুই দফা শুনানি শেষে খোরপোশ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা আদায় করে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
বাকোশপোল গ্রামের ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেন জানান, তিনি প্রতিবেশী ফজলুর রহমানের কাছে ব্যবসা-সংক্রান্ত দেড় লাখ টাকা পেতেন। আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে গ্রাম আদালতে মামলা করে টাকা আদায় করেছেন।
গ্রামের এমন অনেক ভুক্তভোগী এখন আদালত অথবা থানায় মামলা না করে গ্রাম আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সহজেই সুফল পাচ্ছেন। এলাকায় এখন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অহেতুক হানাহানিসহ বিশৃঙ্খলা কমতে শুরু করেছে। ফলে গ্রাম আদালত এখন মানুষের কাছে ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে।
গ্রাম আদালতের উপজেলা সমন্বয়কারী অনুপম ঘোষ জানান, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নেই গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব আদালতে নির্দিষ্ট ফৌজদারি এবং দেওয়ানি মামলা করা যায়। তা সফলভাবে নিষ্পত্তিও হচ্ছে। ফৌজদারি মামলা করতে বাদীর ফিস জমা দিতে হয় মাত্র ১০ টাকা। দেওয়ানি মামলা করতে ফিস লাগে ২০ টাকা।
গ্রাম আদালতের আরেক সমন্বয়কারী রোকেয়া খাতুন জানান, গ্রাম আদালতে দেওয়ানি মামলার সংখ্যা বেশি। গত জুন মাসে ১৭ ইউনিয়নে মোট মামলা হয় ৪৮টি, জুলাইয়ে ৪৯, আগস্টে ৫৬, সেপ্টেম্বরে ৭২, অক্টোবরে ৭২টি। অক্টোবরের ৭২টি মামলার মধ্যে ৫৯টির নিষ্পত্তি হয়। অপেক্ষমাণ রয়েছে ১৩টি। এছাড়া ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩০ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করে মামলার বাদীদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
গ্রাম আদালত পারিচালনা করে যশোর জেলার মধ্যে মনিরামপুর উপজেলা প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে সদর ইউনিয়নের গ্রাম আদালত। এই আদালত পরিচালনা করে উপজেলায় শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সদর ইউপি চেয়ারম্যান নিস্তার ফারুক। তিনি জানান, গত মাসে তাঁর ইউনিয়নের গ্রাম আদালতে জমিজমা, পাওনা আদায়, খোরপোশ আদায়সহ ১০টি মামলা হয়। এর মধ্যে দুই দফা শুনানি শেষে আটটি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিপূরণ বাবদ ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করে পাওনাদারদের
বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
উপজেলা সমন্বয়কারী অনুপম ঘোষ জানান, গ্রাম আদালতে ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বিচারক টিম বিচারকার্য সম্পন্ন করে থাকে। এর মধ্যে বাদী পক্ষে থাকেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ও একজন গণ্যমান্য বক্তি। বিবাদী পক্ষেও অনুরূপ প্রতিনিধি থাকেন। এই পাঁচজনের মধ্যে তিন বা চারজন যে রায় দিয়ে থাকেন সেটিই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। অন্যদিকে বিচারক বোর্ডের চারজন অথবা সবাই যদি কোনো রায় দেন আর সেটি যদি বাদী-বিবাদী পছন্দ না করেন তাহলে এর বিরুদ্ধে তারা আপিল করতে পারবেন না। তিনজনের রায় এক হলে এর বিরুদ্ধে আপিল করা যায়।
অনুপম ঘোষ আরও জানান, মনিরামপুর উপজেলায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। তবে প্রথম দিকে মানুষের তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায়নি। এর গুরুত্ব নিয়ে সভা, কর্মশালাসহ বিভিন্ন প্রচারণার মধ্য দিয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো হয়। এরপর চলতি বছরের জুন থেকে গ্রাম আদালতের কার্যক্রমে গতি বাড়তে থাকে।
মনিরামপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বদরুজ্জামান জানান, গ্রাম আদালতের কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় থানায় মামলা দায়েরের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে মামলা হয় ৩০টি। অক্টোবর মাসে ২৮টি। চলতি মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১৩টি।
উপজেলা গ্রাম আদালতের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত তামান্না বলেন, গ্রাম আদালত পরিচালনায় সেপ্টেম্বর মাসে যশোর জেলার মধ্যে মনিরামপুর উপজেলা প্রথম স্থান অধিকার করে। তিনি বলেন, সদর ইউনিয়নের মতো অন্য সব ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে গ্রাম আদালতের সক্রিয় ভূমিকায় হানাহানি, বিশৃঙ্খলাসহ ছোটখাটো অপরাধ কমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
- বিষয় :
- যশোর
- গ্রাম আদালত
