খুনের বিচারের দাবিও ছেড়ে দিয়েছে পরিবারগুলো
খুলনায় সন্ত্রাসীদের হাতে নিহতরা। ছবি-সংগৃহীত
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৬ | আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত ২ নভেম্বর রাতে ওয়াজ মাহফিলের অনুদান সংগ্রহের জন্য স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে ইউপি সদস্য মামুন শেখের কার্যালয়ে যান এমদাদুল হক। ওই রাতেই আড়ংঘাটা থানার খানাবাড়িতে অবস্থিত কার্যালয়টিতে গুলি ও বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। মামুন শেখকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এমদাদুল হকের শরীরে বিদ্ধ হলে তিনি নিহত হন। হত্যার পর আতঙ্কিত নিহতের পরিবার কোনো মামলা করেনি। হত্যাকাণ্ডের মাস পার হলেও জড়িত একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলা না করার কারণ জানতে চাইলে এমদাদুল হকের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা শুধু বলেছেন, ‘আমরা তো বিচার দাবি করিনি। মামলা করব কেন? করলেই বা কী হতো? কেউ ধরা পড়েছে?’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, ‘সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’
রাজিয়া সুলতানার মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলছে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত আরও চারটি পরিবার। অব্যাহত হুমকি, পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় তারা বিচার চাইতেও ভয় পাচ্ছেন। হত্যায় প্রধান অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশও তাদের মাঝে আশা সঞ্চার করতে পারছে না।
খানাবাড়ির স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই এলাকার আরেক ইউপি সদস্য আরিফ হোসেন হত্যা মামলায় মামুনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরে তিনি জামিন পান। আরিফ ছিলেন সন্ত্রাসী মুন্না ভূঁইয়ার অনুসারী। প্রতিশোধ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মুন্নার সহযোগীরাই মামুন শেখকে হত্যার চেষ্টা করে। মহেশ্বরপাশায় আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে মুন্না ভূঁইয়ার অনুসারীদের নাম এসেছে। কিন্তু তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমদাদুল হকের এক স্বজন বলেন, ‘আগের খুনের আসামিরা ধরা না পড়া এবং মামলা করলে আরও খুন হবে– এমন হুমকিতে পরিবারের সদস্যরা সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। আমরা তাদের বুঝিয়েও মামলা করাতে পারিনি।’
পরিবার মামলা না করায় এমদাদুল হক হত্যাকাণ্ডের ১৭ দিন পর পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে আড়ংঘাটা থানায় মামলা করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওই থানার এসআই মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘এখনও ক্লু পাওয়া যায়নি। কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি।’
খুলনা মহানগর পুলিশের তথ্য বলছে, গত বছর অভ্যুত্থানের পর থেকে গত ১৬ মাসে নগরীতে ৪৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে আধিপত্য নিয়ে বিরোধে সন্ত্রাসীরা গুলি করে ও কুপিয়ে ১৫ জনকে হত্যা করে। সন্ত্রাসীদের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মারা গেছেন একজন। মহানগরীতে দ্বন্দ্বের জেরে পার্শ্ববর্তী রূপসা উপজেলায় গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে আরও চারজনকে।
বিচারের দাবি নেই আরও তিন পরিবারের
দীর্ঘ ২৩ বছর কারাগারে থাকার পর গত ৮ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান নগরীর শেখপাড়া এলাকার বাসিন্দা শেখ শাহাদাত হোসেন। একসময় চরমপন্থি সংগঠনের সদস্য হলেও মুক্তির পর তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। গত ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় নগরীর সংগীতা সিনেমা হলের সামনে অসংখ্য মানুষের সামনে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে।
স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টারত শাহাদাত হত্যার পর আতঙ্কিত পরিবারটিও কোনো মামলা করেনি। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ, সাংবাদিক কারও সঙ্গে কথা বলতে চাননি তাঁর স্বজন। হত্যাকাণ্ডের আট দিন পর সোনাডাঙ্গা থানার এসআই সোহেল রানা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন।
মামলাটি তদন্ত করছেন থানার ওসি (তদন্ত) মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানির লোক জড়িত। ইতোমধ্যে নাসিমসহ তিন সন্দিগ্ধ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত ৩০ নভেম্বর দুপুরে খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ফজলে রাব্বি রাজন ও হাসিব হাওলাদারকে। এ জোড়া খুনের ঘটনায় গতকাল বুধবার রাতে সদর থানা পুলিশের এসআই আমিনুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন।
রাজনের বাবা ইজাজ শেখ বলেন, ‘মামলা করে কী করব? গত চার দিনে কেউ ধরা পড়ছে? আগের খুনের কেউ ধরা পড়ছে? আমি বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিছি।’
হাসিবের এক স্বজন বলেন, ‘পরশু রাতে কাউয়া মিরাজের লোকজন মোটরসাইকেলে এসে হুমকি দিয়ে গেছে– মামলা হলে আরেকটি লাশ পড়বে। আমরা আর কাউকে হারাতে চাই না।’
খুলনা সদর থানা ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, এই জোড়া হত্যাকাণ্ডে গ্রেনেড বাবুর লোকজন জড়িত। ইতোমধ্যে সন্দিগ্ধ এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।
শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম বাদ দিতে চান স্বজন
গত বছরের ২৯ নভেম্বর রাতে নগরীর টুটপাড়া এলাকায় গুলি ছুড়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আমিন মোল্লা বোয়িংকে গুরুতর আহত করে সন্ত্রাসীরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আশিক বাহিনীর প্রধান আশিক, তাঁর ভাই সজীবসহ ৯ জনের নামে খুলনা সদর থানায় মামলা করেন নিহতের ছোট ভাই আবদুল্লাহ মোল্লা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই সেলিম হোসেন বলেন, আশিক বাদে অন্য আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা কারাগারেই রয়েছে। আশিককে গ্রেপ্তার করতে পারলে দ্রুত চার্জশিট দিয়ে দেব। মামলাটির এই পর্যায়ে এসে মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সজীবের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেছেন বাদী। কারাগারে থাকা সজীবের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে।
কারণ জানতে চাইলে আবদুল্লাহ মোল্লা বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবতে হচ্ছে। এদের সঙ্গে আমরা পেরে উঠছি না। এ ছাড়া সজীবের দুটি কিডনি নষ্ট; হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল না নিশ্চিত হয়েই এফিডেভিট করেছি। এখন হয়তো সে জামিন পাবে।’
খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, ‘কেউ খুন হলেই পুলিশ সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসীর সহযোগী, এত এত মামলা ছিল– কার্ড সামনে নিয়ে আসে। যেন সন্ত্রাসী হলে বা মামলার আসামি হলেই খুন করা বৈধ। এই যে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টার কারণেই খুন বন্ধ হচ্ছে না। এক পর্যায়ে নিরীহ মানুষ ভুক্তভোগী হচ্ছে।’
তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই মানুষ এখন বিচার চাচ্ছে না। তারা অনুভব করছে, আসামিরা গ্রেপ্তার হবে না, পুলিশও তাদের নিরাপত্তা দেবে না, পরিবারের ক্ষতির দায় কেউ নেবে না। এই ভয় পুলিশকেই ভাঙতে হবে। মানুষ যদি ভয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, পুলিশ একা একা কখনোই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারবে না।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার সমকালকে বলেন, অধিকাংশ খুনের কারণ উদ্ঘাটন হয়েছে। ১৯টি মামলার আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ৯ শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ ৭২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্যরাও দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।
