দিঘি ও কৃত্রিম হ্রদ বিলীন, কালের আবর্তে হারাতে বসেছে আলেক্সান্ডার ক্যাসল
ময়মনসিংহ শহরে আলেকজান্ডার ক্যাসলে দর্শনার্থীরা। সম্প্রতি তোলা সমকাল
তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্রিটিশ ভারতীয় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে আলেক্সান্ডার ক্যাসল। এটি স্থানীয়দের কাছে ‘লোহার কুঠি’ নামেই পরিচিত। দেড়শ বছরের পুরোনো স্থাপনাটি এককালের রাজকীয় আতিথেয়তার প্রতীক; যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুস হারিয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তাগাছার প্রভাবশালী জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী প্রায় ৯ একর জমির ওপর গড়ে তোলেন দ্বিতল প্রাসাদটি। নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। প্রাসাদটি নির্মাণে কাঠ ও লোহার ব্যাপক ব্যবহারের কারণেই ‘লোহার কুঠি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এটির অবস্থান ময়মনসিংহ শহরের সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (পুরুষ) ক্যাম্পাসের ভেতরে।
ভবনটি নির্মাণের পেছনে নান্দনিক রুচির পরিচয় মেলে। এর ছাদ শীতল রাখার জন্য ফ্রান্স থেকে আনা দুর্লভ ‘আব’ জাতীয় বস্তু এবং চুমকি (এক ধরনের উজ্জ্বল ধাতব পাত) ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় কেউ কেউ বলেন, তৎকালীন জেলা কালেক্টর এন এস আলেকজান্ডারের নামানুসারে প্রাসাদটির নামকরণ হয় ‘আলেকজান্ডার ক্যাসল’। অনেকের মতে, ব্রিটিশ শাসক সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রার নামে প্রাসাদটির নামকরণ করা হয়। একসময় প্রাসাদ চত্বরে ছিল দিঘি, ফুলের বাগান এবং কৃত্রিম হ্রদ, যা বর্তমানে বিলীন।
আলেকজান্ডার ক্যাসলটি মহারাজা সূর্যকান্তের অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বহু বরেণ্য ও গুণীজনের পদধূলি পড়েছে এই প্রাসাদে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯২৬ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ সফরে এসে এখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। একই বছর আসেন মহাত্মা গান্ধী। এ ছাড়া লর্ড কার্জন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বরা এখানে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। তাদের পদচারণায় একসময় এই লোহার কুঠি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল।
দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে এই বাগানবাড়িটিকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (পুরুষ)। প্রথমদিকে ক্যাসলের কক্ষগুলো শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এটি কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর নিচতলার আটটি কক্ষে প্রায় ২০ হাজার বই রাখা আছে।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ক্যাসলটি। প্রায় ১৪৫ বছরের পুরোনো স্থাপনাটির অনেক অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, ভেঙে যাচ্ছে লোহা ও কাঠ। অযত্ন আর অবহেলার ছাপ স্পষ্ট প্রতিটি ইটে। সামনে থাকা গ্রিক দেবী ভেনাসের শ্বেতপাথরের ভাস্কর্যটিও অযত্নে ভেঙে গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা
এসে প্রাসাদটির দুরবস্থা দেখে হতাশ হচ্ছেন। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত ক্যাসলটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।
সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই লোহার কুঠিকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এটিকে দ্রুত সংস্কার করে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত, নতুবা অচিরেই এটি ধ্বংস হয়ে কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রাসাদটি সংস্কারের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে এবং অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে।
কয়েকজন দর্শনার্থীর দাবি, অতীতের গৌরব আর বর্তমান করুণ দশার দোলাচলে দাঁড়িয়ে থাকা আলেক্সান্ডার ক্যাসল শুধু একটি ভবন নয়, এটি ময়মনসিংহের সমৃদ্ধ ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল। এটি টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছেন তারা।
স্থানীয় শিক্ষক রোমন সরকারের ভাষ্য, প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই ক্যাসলটি ময়মনসিংহের গর্ব। ছোটবেলা থেকে এর গল্প শুনেছি, কিন্তু এখন এসে যা দেখছি, তাতে মন খারাপ হয়ে যায়। ঐতিহ্য এভাবে অযত্নে ধসে পড়লে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী দেখাবে? দ্রুত সংস্কার করে এটিকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী মোখলেসুর রহমান বৃহস্পতিবার সমকালকে বলেন, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধীর মতো ব্যক্তিত্বরা এখানে এসেছেন জেনে দেখতে এলাম। কিন্তু ক্যাসলের অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ। এর কারুকার্য, স্থাপত্যশৈলী অনবদ্য, কিন্তু পলেস্তারা খসে পড়ছে, লোহার বিমগুলো মরিচা ধরেছে। সরকারের উচিত এটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে রক্ষা করা। এমন একটি স্থাপনা অরক্ষিত থাকা দুঃখজনক।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, আলেকজান্ডার ক্যাসল ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর নির্মাণে যে বিশেষ ধরনের ধাতু ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, তা এটিকে ‘লোহার কুঠি’ পরিচিতি দিয়েছে। এর জরাজীর্ণ অবস্থা সত্যি উদ্বেগজনক। যে কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কারের সময় এর মূল স্থাপত্য অক্ষুণ্ণ রাখাটা সবচেয়ে জরুরি। দ্রুত বিশেষায়িত টিম দিয়ে সংস্কার কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ময়মনসিংহের মাঠ কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা আলেকজান্ডার ক্যাসলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। ক্যাসলটি সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য একটি বিশদ প্রস্তাবনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। অনুমোদন পেলেই বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সংস্কার কাজ শুরু করব।’
- বিষয় :
- স্মৃতি
