ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চিঠি চালাচালিতেই আটকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ

চিঠি চালাচালিতেই আটকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ
×

তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদীন পার্কের পাশেই একটি বধ্যভূমি। একাত্তরের গণহত্যার নীরব সাক্ষী হিসেবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার চিহ্নটি সংরক্ষণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতিভূমিকে দৃশ্যমান করার প্রক্রিয়া।

বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের দাবিতে ২০২০ সালের মহান বিজয় দিবস থেকে সোচ্চার ‘সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। মানববন্ধন, জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিবসের মাধ্যমে এই দাবিকে জনসম্মুখে এনেছে সংগঠনটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের দাবির মুখে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন। একই বছর ৯ ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদন দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এতে বধ্যভূমি হিসেবে সংস্কার ও সংরক্ষণের পক্ষে মতামত দেওয়া হয়। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর মতামতটি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক বধ্যভূমি সংরক্ষণের প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। একই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চলমান ‘বধ্যভূমিসমূহ সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পে এটি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২০ মার্চ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় বিবরণী ও নকশা চান। এর পর ২০২২ সালের মে মাস থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাক্কলন ও নকশা আদান-প্রদান চলতে থাকে এবং একাধিকবার স্কেচম্যাপ ও সংশোধিত প্রাক্কলন পাঠানোর জন্য জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠির জবাবে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল জেলা প্রশাসক সংশোধিত প্রাক্কলন স্কেচম্যাপসহ প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠান। এতে ব্যয় ধরা হয় ৯৯ লাখ পাঁচ হাজার ৭৭ টাকা।

দীর্ঘদিন কাজের অগ্রগতি না থাকায় ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি দেয় সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘ। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি স্মারকলিপিটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক।
একই বছরের ২৯ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য বধ্যভূমিটি প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ আজও অরক্ষিত বধ্যভূমিটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেবল ফাইল চালাচালি আর দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রিতায় আজও এই বধ্যভূমিতে একটি ইটও বসানো সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, ময়মনসিংহ অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বর্বরতা এবং মুক্তিকামী জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে দৃশ্যমান করা জরুরি। ২০২০ সালের বিজয় দিবস থেকে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন তারা। বিভিন্ন দপ্তরে ছোটাছুটি করেছেন। কিন্তু দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে আজও এই অরক্ষিত বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। একটি অবহেলিত বধ্যভূমি সংরক্ষণে এই দীর্ঘসূত্রিতা কখনও কাম্য হতে পারে না।
ময়মনসিংহ মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আব্দুল খালেক সিকদার সমকালকে বলেন, এই বধ্যভূমি কোনো সাধারণ স্থান নয়, এটি জাতীয় ইতিহাসের এক রক্তাক্ত দলিল। স্বাধীনতার ৫৪ বছর ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা গণহত্যার স্থানটি সংরক্ষণে সরকারের উদাসীনতা হতাশাজনক এবং শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি অসম্মান। বধ্যভূমিটি অবিলম্বে সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানান, এখানে নতুন যোগদান করেছেন তিনি। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×