ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অসময়ের স্রোতে ভাঙছে গড়াই

অসময়ের স্রোতে ভাঙছে গড়াই
×

কুমারখালী পৌরসভার আগ্রাকুণ্ডা এলাকায় গড়াই নদীর ভাঙন। শুক্রবারের ছবি সমকাল

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘এহেনে ৩০ বছর ধরে বাস করছি। তয় আগে কোনোদিন এম্বা (এভাবে) ভাঙা দেখিনি। কিছুক্ষণ পরপরই পার ভাঙে ধপ্পাস করে পড়ছে। কখন জানি ঘরখানায় ভাঙে যায়– এই ভয়ে আছি।’ উদ্বেগের স্বরে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভায় তেবাড়িয়া এলাকার মদিনা খাতুন (৬২)। অসময়ে গড়াই নদীর আকস্মিক ভাঙনে বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় তাঁর মতো আরও অনেকে। 
স্থানীয়রা জানান, শীতে নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। এ বছর নদীর মাঝে চর জেগেছে। ফলে কিনারা দিয়ে স্রোত বইছে। এতে পারে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত চার-পাঁচ বছর নদী শাসনের কাজ না করায় চর জেগেছে। এতে স্রোত কিনার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভাঙনের খবর পেয়ে প্রশাসন এলাকা পরিদর্শন করলেও নিচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। 

গড়াই নদীর কূল ঘেঁষে কুমারখালী পৌরসভা ও উপজেলা শহর অবস্থিত। ১৮৬৯ সালে গঠিত প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেবাড়িয়ার শহীদ গোলাম কিবরিয়া সেতু থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আগ্রাকুণ্ডা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় নেই বাঁধ। এরই মধ্যে সেখানে ভাঙন শুরু হয়েছে। গত এক সপ্তাহে প্রায় ৩০ বিঘা ফসলসহ কৃষিজমি ও পার ভেঙে চলে গেছে নদীতে। এর পরও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এতে হুমকিতে পড়েছে প্রায় ৫০ বিঘা কৃষিজমি ও অন্তত ৩০০টি পরিবারের বসতভিটা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে প্রতি বছরই পাউবো নদী শাসন করত। তবে গত চার-পাঁচ বছরে তেবাড়িয়া-আগ্রাকুণ্ডা এলাকায় কোনো কাজ হয়নি। ফলে নদীর মাঝে চর জেগেছে। আর পানির স্রোত বইছে কিনারা দিয়ে। এতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ৩০ বছরেও এভাবে ভাঙেনি।

গত শুক্রবার বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, তেবাড়িয়া শহীদ গোলাম কিবরিয়া সেতু থেকে আগ্রাকুণ্ডা এলাকার কৃষক ছেইমান শেখের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা গড়াই নদীর পার। নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূর দিয়ে চলে গেছে সিসি ঢালাই সড়ক। সড়ক ঘেঁষে কয়েকশ কাঁচা-পাকা বাড়ি। বাড়ির পেছনে নদীপারে সরিষা, ভুট্টা, তিল, পেঁয়াজসহ হরেক চাষাবাদ করা হয়েছে। শুকনো নদীর মাঝখানে জেগেছে চর। কিনারা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে ভেঙে পড়ছে নদীর পার।
আগ্রাকুণ্ডা গ্রামের কৃষক ছেইমান শেখ বলেন, বহু বছর পর নদীতে ভাঙন লেগেছে। ফসলসহ অন্তত ৩০ বিঘা জমি গত সাত দিনে নদীতে চলে গেছে। এখন বসতবাড়ি নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছি। সরকারি লোকজন এসে ঘুরে গেছেন। কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

তেবাড়িয়া গ্রামের চা বিক্রেতা সমীর চাকী বলেন, নদী শুকিয়ে এবার মাঝে চর পড়েছে। ফলে পারের কাছ দিয়ে পানির স্রোত যাচ্ছে আর ভাঙছে। এতে কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, সড়ক, মসজিদ-মন্দির, ছোট-বড় নানা স্থাপনা ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, নদীর খেলা বোঝা বড় দায়। পানি কমলেও ভাঙে, বাড়লেও ভাঙে। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
তেবাড়িয়া শেরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি মোশারফ হোসেন বলেন, নদীপারে ২২ শতাংশ জমিতে হাইব্রিড ঘাসের চাষ রয়েছে। নদী ভাঙতে ভাঙতে প্রায় ঘাসের কাছে চলে এসেছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুত বাঁধ নির্মাণ করা দরকার।

নদীভাঙন এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে বলে জানান কুষ্টিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বাঁধ নির্মাণ বা ভাঙন রোধের কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, ভাঙনের বিষয়টি জানতে পেরেছি। পাউবোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন

×