ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রচারে প্রযুক্তির ছোঁয়া, স্থবির পুরোনো ছাপাখানা

পোস্টার না ছাপানোয় কমেছে কোটি টাকার ব্যবসা

প্রচারে প্রযুক্তির ছোঁয়া, স্থবির পুরোনো ছাপাখানা
×

 চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম নির্বাচন কমিশন অফিস থেকে দেড় কিলোমিটার এগোলে সামনে পড়ে আন্দরকিল্লার ছাপাখানা পাড়া। প্রতি বছর প্রতীক বরাদ্দের আগে-পরে প্রার্থীদের আনাগোনায় মুখর থাকত এই এলাকা। সর্বশেষ নির্বাচনেও প্রার্থীদের অন্তত পাঁচ লক্ষাধিক রঙিন ব্যানার ও পোস্টার ছাপানো হয়েছে। এবার ভিন্ন চিত্র।

ঘুরছে না যন্ত্র, নেই পোস্টার ছাপানোর ব্যস্ততা। ছাপাখানা পাড়ায় জনবলও নেমে এসেছে অর্ধেকে। স্থবিরতা বিরাজ করছে আইস ফ্যাক্টরি রোডের মাইক পাড়ায়ও। তবে ডিজিটাল প্রিন্টিং ও বিলবোর্ডের দোকানে গিয়ে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় একজন প্রার্থী তাঁর আসনের প্রতিটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে একটি এবং নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি ডিজিটাল বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। তাই এসব দোকানে অর্ডারের পাশাপাশি ব্যস্ততা বেড়েছে।

চট্টগ্রাম প্রেস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অনি প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের মালিক আবদুল্লাহ আল হারুন বলেন, ‘নির্বাচনের কারণে আন্দরকিল্লা এলাকার কিছু প্রেসে ব্যস্ততা আছে, তবে সেটি আগের তুলনায় ১০ ভাগের এক ভাগও নয়। পোস্টারে বিধিনিষেধ থাকায় প্রার্থীরা ডিজিটাল বিলবোর্ডের দিকে ঝুঁকছেন।’
তিন কারণে এবার ছাপাখানা পাড়া স্থবির থাকবে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম প্রেস মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এবার পোস্টার নিয়ে বিধিনিষেধ আছে। লিফলেটেও প্রার্থীদের কঠোর হিসাব রাখতে হচ্ছে।’

আন্দরকিল্লার রাজাপুকুর লেনে টিএস ভবনে আছে ডিএস প্রিন্টার্স। এর পরিচালক সুকুমার বলেন, ‘গত নির্বাচনে এই সময়ে আমার ১৫ জন স্টাফ ছিল, এখন অর্ধেকও নেই। গতবার যে ব্যবসা করেছি, এবার তার সিকি ভাগও নেই।’
আইস ফ্যাক্টরি রোডে মাইকের ব্যবসা করা হেদায়েত হোসেন বলেন, ‘প্রতীক পাওয়ার পরপরই আগে পাড়াভিত্তিক মাইক নামাতেন প্রার্থীরা। কিন্তু এবার মাইক ও স্পিকার ব্যবহারে বিধিনিষেধ আছে, তাই ব্যবসা অর্ধেকে নেমেছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীরা কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। লিফলেট ও ব্যানারে প্রার্থী ও দলীয়প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি দেওয়া যাবে না। ভোটের প্রচারে ড্রোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জনসভায় একসঙ্গে তিনটির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করা যাবে না। তবে প্রথমবারের মতো সামাজিক মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কেউ পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না।’
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম-১০ আসনের জামায়াত প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালীর হাতে দেখা যায় লিফলেট এবং সমর্থকদের হাতে ফেস্টুন। সংশোধিত আচরণবিধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী আবহ তৈরিতে পোস্টার ও মাইক আগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এবার ব্যতিক্রম হচ্ছে। আমরা একে সাধুবাদ জানাই।’ একই আসনের বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘এই বিধিনিষেধকে আমি স্বাগত জানাই।’

কিশোরগঞ্জে সংকটে ছাপাখানা
আচরণবিধিতে কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ করায় কিশোরগঞ্জের ছাপাখানা মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম জানান, প্রার্থীরা এখন চট বা কাপড়ের ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহার করতে পারবেন। তবে ছাপাখানা মালিকরা বলছেন, অধিকাংশ প্রেসে কাপড়ের ব্যানার ছাপানোর যন্ত্র নেই।
রিটন প্রিন্টার্সের মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, কাপড়ের ব্যানার করার মেশিন না থাকায় তিনি কাজ পাচ্ছেন না। কিশোরগঞ্জ শহরের প্রায় ২০টি ছাপাখানার শতাধিক কর্মচারী ও মালিক এই ক্ষতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

তাড়াশে অলস অর্ধশত ছাপাখানা
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জসহ এই অঞ্চলের অর্ধশত ছাপাখানা স্তব্ধ। পোস্টার নিষিদ্ধ করায় ব্যবসায় ধস নেমেছে। তাড়াশের ‘কম্পিউটার গ্রাফিক্স’-এর মালিক আব্দুল হাকিম হিরো জানান, গত নির্বাচনে তিনি ১০ লাখ টাকা আয় 
করলেও এবার কাজ নেই। আগে রাত জেগে পোস্টার ও হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ চললেও এবার ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা বাড়ায় ছাপাখানায় ভিড় নেই।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি ও তাড়াশ প্রতিনিধি)

আরও পড়ুন

×