শুধু ভোট এলেই আলোচনায় আসে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’
পানির অভাবে বদলে যাচ্ছে পুরো উত্তরাঞ্চলের জীবনচক্র
তিস্তার বুকজুড়ে চর। রংপুরের গঙ্গাচড়ার ছোটরুপাই এলাকা থেকে সম্প্রতি তোলা
জাহিদুর রহমান ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর থেকে
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষায় যে তিস্তা গর্জে ওঠে, শুষ্ক মৌসুমে সেই নদীকে চেনাই দায়। বিস্তীর্ণ বালুচর, ফেটে যাওয়া মাটি– দূর থেকে দেখলে মনে হয় মরুভূমি! পানির অভাবে বদলে যাচ্ছে পুরো উত্তরাঞ্চলের জীবনচক্র। লালমনিরহাট থেকে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী হয়ে রংপুর কিংবা গাইবান্ধা– তিস্তার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষ এখন অনিশ্চয়তায়। জীববৈচিত্র্য প্রায় বিলীন, জেলে-মাঝিদের নৌকা ঘাটেই পড়ে থাকে, কৃষকের চোখ থাকে আকাশপানে। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে অনেক পরিবারের জীবন কাটছে দুর্বিষহ।
উত্তরের মানুষের কাছে তিস্তা সাধারণ নদী নয়; এটি একই সঙ্গে জীবনরেখা আর দুর্ভাগ্যের নাম। জাতীয় উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যানের আড়ালে তিস্তাপারের মানুষের দীর্ঘশ্বাস আজও বায়বীয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আবারও রাজনৈতিক মঞ্চে তিস্তা। প্রায় সব দলের প্রার্থী ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ প্রতিশ্রুতির তালিকার চূড়ায় রেখেছে। বাস্তবতা হলো, দশকের পর দশক শোনা এই মহাপরিকল্পনার কাজ এখনও কাগুজে।
রংপুরের কাউনিয়ার টেপামধুপুর ইউনিয়নের চরগনাই এলাকার স্কুলশিক্ষক আজগর হোসেন বলেন, ‘সবাই তিস্তা নিয়ে রাজনীতি করেছে, তবে তিস্তাপারের মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চাই।’
নব্বই দশক থেকে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, পানি শাসনের কথা শুনেছেন স্থানীয়রা। ক্ষমতা বদলেছে, সরকার বদলেছে– তবে বদলায়নি তিস্তার ভাগ্য। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা আর অগ্রাধিকার সংকটে মহাপরিকল্পনা বারবার কাগজেই আটকে আছে।
ভারতের সিকিম থেকে নেমে আসা তিস্তা বাংলাদেশে ঢোকার আগেই গজলডোবা বাঁধে নিয়ন্ত্রিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, উজানে পানি আটকে একতরফা ব্যবহার করছে ভারত। ফলে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে বন্যা, আর শুষ্ক মৌসুমে সেচের সময় পানি মেলে না। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, যেখানে অন্তত ১০ হাজার কিউসেক পানি থাকার কথা, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে অনেক সময় ২০০ কিউসেকও পাওয়া যায় না। যৌথ নদী কমিশনের মতে, ১৯৮৭ সাল থেকেই পানি প্রত্যাহারের সংকট বাড়তে শুরু করে, আর ২০০০ সালের পর তা ভয়াবহ আকার নেয়।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি হলেও পানি পাওয়া নিশ্চিত নয়, কারণ সীমান্ত এলাকায় প্রবাহই কমে গেছে। তবু চুক্তি জরুরি– অন্তত চাপ তৈরি হবে।
প্রতিবছর তিস্তা প্রায় দুই কোটি টন পলি বহন করে আনে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে, স্বল্প পানিতেই উপচে পড়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। বর্ষায় অতি ভারী বৃষ্টিতে বন্যা, আর শুষ্ক মৌসুমে মৃতপ্রায় নদী– এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দুলছে তিস্তাপার।
নদীর পানি সরে গেলে জেগে ওঠা চরে এখন কৃষকদের ব্যস্ততা। পাঁচ জেলার ৭৩৪টি চরে প্রায় ৮১ হাজার হেক্টর জমিতে রবিশস্য। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উৎপাদনের আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়ার কৃষকরা জানান, নদীতে পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সেনিক, হারিয়ে যাচ্ছে মাছের ভান্ডার।
আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, নদীর শুষ্কতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বামজোট নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উত্তরাঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে যাচ্ছে।’
লালমনিরহাটের আদিতমারীর দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামে দাঁড়ালে বোঝা যায় নদীর নির্মমতা। ফসলসহ জমি ভেঙে পড়ছে পানিতে, কানে আসে ঝপঝপ শব্দ। কৃষক জামাল উদ্দিন ১২ বিঘা জমি আর বসতভিটা হারিয়েছেন নদীতে। জীবনে দুবার নতুন বাড়ি তুলতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর প্রশ্ন, সরকার এলেই বলে এটা করবে, সেটা করবে। কিন্তু করে না কিছু।
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানীর দাবি, নদীভাঙনে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাড়ছে জলবায়ু শরণার্থী।
নির্বাচন এলেই তিস্তা নিয়ে আন্দোলন, সমাবেশ, প্রতিশ্রুতি– সবই বাড়ে। গত বছরও পানির ন্যায্য হিস্যা ও মহাপরিকল্পনার দাবিতে রংপুর অঞ্চলে বেশ কর্মসূচি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে উত্তরবঙ্গে প্রথম কোদাল পড়বে তিস্তায়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও জানিয়েছেন, সরকার গঠন করতে পারলে দ্রুত মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করবেন।
সরকারের ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’, যা তিস্তা মহাপরিকল্পনা নামে পরিচিত। এর আওতায় রয়েছে নদী খনন, ভূমি উদ্ধার, বাঁধ নির্মাণ, চর উন্নয়ন, কৃষিজমি পুনরুদ্ধার, এমনকি নদীপারে স্যাটেলাইট শহর গড়ার পরিকল্পনাও।
গত ১৯ জানুয়ারি রংপুরে সফরে এসে কাউনিয়ার টেপামধুপুর তালুক শাহবাজপুরে তিস্তা নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশ ও চীন সরকার উভয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে তাদের ইশতেহারে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তাই তাড়াহুড়ো করে কাজটি শুরু হবে তা নয়, আমরা একটু সময় দিই যেন কাজটি আরও ভালোভাবে হয়।’ তিনি বলেন, ‘পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ ছাড়া এটি একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু। তাই আমরা মনে করি, নির্বাচিত সরকার এসে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কাজ করবে। নির্বাচিত সরকার এসে যেন তাদের অপেক্ষা করতে না হয়, সেই প্রস্তুতিটা আমরা গঙ্গা ও তিস্তার ক্ষেত্রে করে দিয়েছি।’
লালমনিরহাট জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানা বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের বিষয়। সব পক্ষকে একমত হতে হবে।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘এখন দেশের সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ তিস্তা মহাপরিকল্পনা। দেশে অতীতে তিন লাখ কোটি টাকায় অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও সরকার মাত্র সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেনি। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এবার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মহাপরিকল্পনার কথা বলেছে। আশা করি, এবার আর তিস্তা তীরের মানুষকে হতাশ করবে না নতুন সরকার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হলে পাঁচটি জেলার তিস্তা অববাহিকায় কোটি মানুষ উপকৃত হবে।’
